যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের লক্ষ্যে মহাসড়কে আধুনিক ইন্টেলিজেন্ট সিস্টেম (আইটিএস) বসাতে যাচ্ছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। এরই মধ্যে ঢাকা-পটুয়াখালী মহাসড়কের ৪০ কিলোমিটারে পরীক্ষামূলকভাবে বসানো হচ্ছে এ প্রযুক্তি। ব্যয় ধরা হয়েছে ১২২ কোটি টাকা, প্রকল্পটি একেনেকেও পাস হয়েছে। যান চলাচল ব্যবস্থাপনায় উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ, কিন্তু ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ব্যতিরেকে প্রযুক্তি ব্যবহারের অতীত অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর না হওয়ায় শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। ঢাকার কয়েকটি স্থানে আইটিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোনো সুফল মেলেনি, অর্থের অপচয়ই হয়েছে শুধু। যে ব্যবস্থা ঢাকার সড়কে কাজ করেনি, সেটি কীভাবে মহাসড়কের মতো বিপুল এলাকা নিয়ে কাজ করবে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। যেসব কারণে আইটিএস প্রযুক্তি কাজ করেনি সেগুলো দূর না করে মহাসড়কের মতো বিস্তৃত পরিসরে এর প্রয়োগ সুফল বয়ে আনবে না। বাংলাদেশের সড়ক অবকাঠামো ও বিদ্যমান যানবাহন ব্যবস্থাপনায় আইটিএসের মতো প্রযুক্তি খুব একটা কাজে আসবে না। এ ধরনের প্রযুক্তি থেকে সুফল পেতে চালকদের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নত হতে হবে। আর এক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুর্বলতা সবচেয়ে বেশি। শৃঙ্খলা মেনে গাড়ি চালনা, অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন বন্ধ করতে হবে। ব্যবস্থাপনাগত উন্নয়ন ব্যতিরেকে প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগে অর্থের অপচয় এবং মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা বেড়ে উঠবে, যা কাম্য নয়।
আইটিএস খুবই অত্যাধুনিক একটি প্রযুক্তি। তবে এ প্রযুক্তি সড়কের মাত্র ৫ শতাংশ সক্ষমতা বাড়াতে পারে। তার আগে সে সড়কের সক্ষমতা অবশ্যই ৯৫ শতাংশে পৌঁছতে হবে, কিন্তু বাংলাদেশের সড়ক অবকাঠামো এখনো সে পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি। বাংলাদেশের পরিবহন চালকদের একটা বড় অংশ শিক্ষিত নয়। তাদের মধ্যে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। নসিমন, করিমন, ইজিবাইকের মতো অসংখ্য অবৈধ যানবাহন মহাসড়কে চলে। অসংখ্য গাড়ির ফিটনেস নেই, রুট পারমিট নেই। সড়ক অবকাঠামোতেও অনেক ব্যাকরণগত সমস্যা রয়েছে। এগুলো ঠিক না করলে আইটিএস প্রযুক্তি কোনো কাজেই আসবে না। বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে আইটিএস দিয়ে কোথাও যানজট হলে কিংবা দুর্ঘটনা ঘটলে সেটা সিসিটিভিতে দেখতে পাব, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। এ ধরনের প্রযুক্তি তখনই কাজ করবে যখন চালকরা সঠিক নিয়ম মেনে পরিবহান চালাবেন এবং আধুনিক সব ট্রাফিক ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা থাকবে। সড়ক অবকাঠামোও হতে হবে উন্নত মানের। চালকদের মধ্যে শৃঙ্খলা মেনে গাড়ি চালানোর প্রবণতা থাকতে হবে। কয়েক কোটি টাকা খরচ করে সিগন্যাল বাতি নিয়ন্ত্রণে কেনা হয় রিমোর্ট কন্ট্রোল সিস্টেম। ২০১৫ সালে বনানী থেকে মত্স্য ভবন পর্যন্ত ১১টি পয়েন্টে আলাদা করে বসানো হয় স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতি। আসাদ এভিনিউয়ে পথচারী পারাপারের জন্য বেশ ঘটা করে পুশ বাটন উদ্বোধন করেন উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র। দুই দশকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরও সিগন্যাল বাতিতে নয়, ঢাকার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে পুলিশের হাতের ইশারায়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে ঢাকার চারটি ইন্টারসেকশনে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিস্টেম বসানো হয়। কিন্তু তাতে যানজট কমার বদলে আরো বেড়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত সেটিও বাতিল হয়ে যায়। কোটি কোটি টাকার সম্পদ হয় চুরি হয়েছে, নয় ধুলাবালি আর বৃষ্টিতে ভিজে রোদে পুড়ে নষ্ট হচ্ছে। এদিকে নসিমন, করিমন, ইজিবাইকের মতো অসংখ্য অবৈধ যানবাহন সড়কে চলে। অসংখ্য গাড়ির ফিটনেস নেই, রুট পারমিট নেই। সড়ক অবকাঠামোতেও অনেক ব্যাকরণগত সমস্যা রয়েছে। এগুলো ঠিক না করলে আইটিএস প্রযুক্তি কোনো কাজেই আসবে না। বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে আইটিএস দিয়ে কোথাও যানজট হলে কিংবা দুর্ঘটনা ঘটলে সেটা সিসিটিভিতে দেখা যাবে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোয় আজকাল আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। এমনকি ভারতও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই, কিন্তু বাংলাদেশে এখনো সনাতনী কায়দায় চলছে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশেই এ প্রযুক্তি চালু আছে। তবে রাজধানীর সড়ক মোড়ে যেখানে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতি কার্যকর করাই সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে উন্নত বিশ্বের এ সর্বাধুনিক ব্যবস্থা কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন নগরবিদরা। বিদেশের অভিজ্ঞতাগুলো আমলে নিয়ে দুর্ঘটনা কমাতে প্রযুক্তিভিত্তিক নানা উদ্ভাবনী সমাধানের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। একই সঙ্গে সড়ক-মহাসড়কে বাড়াতে হবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি। অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ বাড়ানো হলেও দেশে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিনিয়োগ এখনো অনুল্লেখযোগ্য। বিশ্বব্যাংক এক্ষেত্রে নৈপুণ্য বাড়াতে বিনিয়োগের ওপর জোরারোপ করেছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) অর্থায়ন নিশ্চিত করা যেতে পারে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর বলছে, নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও উন্নত সড়ক পরিবহন অবকাঠামো ও অপারেশন ব্যবস্থা নিশ্চিতের লক্ষ্যে আইটিএস মাস্টারপ্ল্যান করা হয়েছে। দেশের সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সঙ্গে সড়কে যানবাহনের পরিমাণ এবং গতি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনাও বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান যানবাহনকে নজরদারির আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। পাশাপাশি সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য আইটিএস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে সড়ক নেটওয়ার্ককে একটি একক নজরদারি ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা হবে। এর মাধ্যমে সময় ও জ্বালানি সাশ্রয়ী, যানজট ও দূষণমুক্ত এবং সর্বোপরি দুর্ঘটনামুক্ত একটি দক্ষ সড়ক নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে, কিন্তু এক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। বর্তমানে মহাসড়কের যে বিশৃঙ্খল অবস্থা, তাতে এ প্রকল্প দিয়ে সুফল পাওয়া যাবে না। যেখানে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতিই চালু করা যায়নি, সেখানে আইটিএস কীভাবে চালু হবে?
গত দুই দশকে বিপুল রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে সড়ক অবকাঠামো আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। পুরনো মহাসড়কগুলো সংস্কার-সম্প্রসারণের পাশাপাশি জেলা-উপজেলায় নির্মিত হয়েছে নতুন নতুন সড়ক। এতে সড়কভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় এসেছে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি, কিন্তু সড়কনিরাপত্তায় হতাশাজনক নৈপুণ্যে এ সাফল্য ক্রমেই নিষ্প্রভ হচ্ছে। বাস্তবতা হলো, দেশে সড়ক নিরাপত্তা দিন দিন অবনতিশীল। এ অবস্থায় সড়কে দুর্ঘটনা বেড়েই চলছে। সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো সংশ্লিষ্টদের অজানা নয়। এক্ষেত্রে অদক্ষ ও ভুয়া লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জনগণের অসচেতনতা, অনিয়ন্ত্রিত গতি, অপরিকল্পিত গতিরোধক, সড়ক নির্মাণজনিত ত্রুটি এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়াই প্রধানত দায়ী। অথচ দুর্ঘটনা-পরবর্তী আশু কিছু পদক্ষেপ ছাড়া চিহ্নিত কারণগুলো নিরসনে পরিকল্পিত ও ফলপ্রসূ তেমন উদ্যোগ নেই। দেশে সড়কনিরাপত্তা নিয়ে কাজ করার প্রতিষ্ঠান অনেক। বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর ও সংস্থা এক্ষেত্রে নিয়োজিত। অথচ পারস্পরিক সমন্বয়হীনতার কারণে এক্ষেত্রে সুফল মিলছে না। এ ধরনের সমন্বয়হীনতা দ্রুত দূর করা দরকার। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে দেশে নতুন সড়ক পরিবহন আইন প্রণীত হয়েছে, কিন্তু আইনটির বেশির ভাগ ধারার প্রয়োগ এখনো শুরু হয়নি। বলতে গেলে আইন প্রয়োগের শিথিলতা, সড়ক-মহাসড়কে যানবাহন চলাচলে বিশৃঙ্খলা, চালক-মালিকদের বেপরোয়া মনোভাব পুরো সড়ক ব্যবস্থাকে দিন দিন অনিরাপদ করে তুলছে বৈকি। এর সুষ্ঠু বিহিত এখন সময়ের দাবি। সত্য যে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সরকারের সদিচ্ছার ঘাটতি নেই। খোদ প্রধানমন্ত্রীও সড়ক দুর্ঘটনা রোধে নানা নির্দেশনা দিয়েছেন। এছাড়া বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সময়ে সুপারিশমালা দিয়েছেন, কিন্তু সেগুলো যথাযথ বাস্তবায়ন হয়নি। দেশে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে এসব সুপারিশ ও নির্দেশনা বাস্তবায়নের সময় এসেছে। শুধু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নয়, সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রেও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভেবে দেখা উচিত। নিরাপদ সড়ক তৈরির জন্য সুপরিকল্পিত নকশা এবং এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে কাজ করাটা জরুরি। মহাসড়কগুলোয় ফিডার রোড দিয়ে কম গতির গাড়ি, মোটরবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ করা দরকার, যাতে দুর্ঘটনা হ্রাস পায়। আর মহাসড়কের পাশে থাকা বাজার, মানুষজন রাস্তা পারাপার হয়—এমন স্থানগুলোয় বিশেষ ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।
আইটিএস প্রযুক্তি থেকে সুফল পেতে দেশের পরিবহন ব্যবস্থাপনা ও সড়ক ব্যবস্থা আরো উন্নত করতে হবে। মহাসড়কে দ্রুত গতির গাড়ির সঙ্গে ধীরগতির গাড়ি চলাচল করে। মানুষ, পশুও সড়কে থাকে। শুধু তাই নয়, স্কুল-কলেজ, এমনকি হাটবাজার ও বাড়িঘরও মহাসড়কের পাশে গড়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে সুফল মিলবে না। সরকারের কাছে তাই প্রত্যাশা থাকবে, প্রযুক্তির ব্যবহারের আগে আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করা হবে।










