হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ একদা বলেছিলেন, এ দেশের সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার আদলে প্রাদেশিক সরকারের অধীনে যাবতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া দরকার। তার এ কথাকে মানুষ সে সময়ে পাত্তা দেয়নি। কারণ, রাজনৈতিক লোকদের কথা মানুষ সবসময় সিরিয়াসলি নেয় না। তাছাড়া যিনি নিজে গণতন্ত্রের সর্বনাশ করে ‘স্বৈরাচার’ উপাধি বাগিয়েছেন, তার কথা আমলে নেয়ার তো খুব একটা কারণ ছিল না। তবে বর্তমানে রাষ্ট্রের যাবতীয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আমলাতান্ত্রিক কাঠামো ও দুর্বল স্থানীয় সরকারের অবস্থা লক্ষ করলে দেখা যায়, প্রাদেশিক সরকারের কোনো বিকল্প এখন আর এ দেশে নেই।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সরকারের যে দায়িত্ব, আর সাধারণ মানুষের যে মৌলিক অধিকার রয়েছে, তাতে এত জনবহুল দেশে কোনো কিছুই আর ঠিকমতো চলছে না। একসময় ধারণা ছিল, প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা বোধ হয়, শুধু আয়তনে বড় রাষ্ট্রের জন্য দরকার। কিন্তু এ ভুল ধারণা থেকেই অনেক রাষ্ট্র নিজেদের মুক্ত করেছে, যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় এসে। আমাদের পাশের ছোট রাষ্ট্র নেপালও আজ যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। আসলে এই যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার সূচনা সাংবিধানিকভাবে আমেরিকায় করা হয়েছিল, মূলত রাজ্যগুলোকে তাদের দরকার মতো পরিচালিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়ার জন্য। এ কেন্দ্রিক রাষ্ট্রে যেটা সম্ভব না। নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চল বড় বড় নদী দ্বারা পৃথক এবং স্বতন্ত্র। যেমন চট্টগ্রামের প্রয়োজন আর রংপুরের প্রয়োজন কখনোই এক রকম নয়। তাই অঞ্চলভেদে শাসন ব্যবস্থার সুষম বণ্টন ও উন্নয়ন দরকার। কিন্তু কোনো সরকারই আজ পর্যন্ত জনস্বার্থে অথবা সুশাসনের জন্য এ দেশকে সাংবিধানিকভাবে প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থায় নেয়নি। কত প্রয়োজনে, অপ্রয়োজনে, বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধিত হয়েছে; কিন্তু প্রাদেশিক সরকার প্রতিষ্ঠায় কোনো সরকার উদ্যোগ নেয়নি। তবে স্বৈরাচারী তকমা থাকলেও এরশাদ সরকারকে কিছুটা ক্রেডিট দিতে হয়, কারণ অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের বিকেন্দ্রীকরণের ব্যবস্থা করেছিলেন; কিন্তু তাও বাতিল হয়েছে। আসলে এ দেশ চলে এলিটদের দ্বারা, এলিটদের স্বার্থে। সাধারণের স্বার্থ বা রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় বিনির্মাণ এখানে বরাবরই উপেক্ষিত।
আজও দেখি রাষ্ট্রের যাবতীয় সরকারি আর বেসরকারি অফিস ঢাকায়। ছোট্ট ঢাকার একটা বড় অংশই সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর আয়ত্তাধীন। অন্যান্য অংশে গাদাগাদি করে তৈরি করা হয়েছে বেসামরিক আমলাবহুল এক ঢাকা। এলিট আমলারা সবাই ঢাকাতেই থাকতে চান, কারণ যাবতীয় সুযোগসুবিধা ঢাকাকেন্দ্রিক। কেউ ঢাকা ছাড়তে চান না। এদের দেখাদেখি মাল্টিন্যাশনাল করপোরেট অফিসগুলোও ঢাকায় তাদের অফিস খুলে বসে। আসলে এটা যে এক ধরনের হেডকোয়ার্টার কালচার, তা এ দেশে ভিনদেশীরাও সহজে বুঝে ফেলে। কিন্তু ঢাকার বাইরেও যে বিশাল এক বাংলাদেশ, বিশাল এক জনগোষ্ঠী তা যেন কোনো রাজনৈতিক সরকারেরই চোখে পড়ে না। এমনকি এখন যে শুধু বিভাগ বানানোর হিড়িক পড়েছে, তাতে জনস্বার্থের বা জনসেবার কতটা প্রতিফলন হবে, তা বলা না গেলেও, কিছু লোকের যে আখেরে লাভ হবে, তা বলাই বাহুল্য। অবশ্য ঢাকার বাইরে, চট্টগ্রাম ছাড়া, দুটো জেলা যেমন বগুড়া ও গোপালগঞ্জ রাজনৈতিক বিবেচনায় সুবিধা পেয়ে খানিকটা উন্নত হয়েছে বটে, কিন্তু অন্য জেলা শহরগুলোর ভাগ্য ততটা সুপ্রসন্ন হয়নি। এমনকি স্থানীয় সরকারের কাঠামোগুলোও আজ খানিকটা রাজনৈতিকভাবে একপেশে আর দুর্বল। যেমন স্থানীয় সরকারের একটা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হতে পারত জেলা পরিষদ। কিন্তু সেটা হয়নি রাজনৈতিক ইচ্ছার অভাবে। তারই ধারাবাহিকতায়, জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় বা হচ্ছে বটে, কিন্তু তাতে শাসক দল ব্যতীত অন্যদের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। শুধু জেলা পরিষদ নির্বাচন নয়, অন্য নির্বাচনগুলোও আজ একপেশে আর বিতর্কিত হচ্ছে, কারণ স্থানীয় সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই সেখানে। সব নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের হাতে।
বিচারিক প্রতিকার পেতে মানুষকে ঢাকার উচ্চ আদালতে আসতে হয়। আইনজীবীর ফি, যাতায়াত খরচ, থাকার জায়গার ব্যবস্থা, এগুলো করতে করতে একজন গ্রামের নিম্ন আয়ের মানুষ, কতটা বিপর্যস্ত আর বিধ্বস্ত হয়, তা আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা ভেবে দেখেন না। করোনার সময় টের পাওয়া গেছে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার কী দুরবস্থা, আর ঢাকার বাইরের অবস্থা আরো কতটা প্রকট। নামকাওয়াস্তে ঢাকার বাইরে কিছু আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছে বটে, কিন্তু সেগুলোর অবস্থা কতটা সঙ্গিন, তাও আজ স্পষ্ট। সবকিছুর জন্য মানুষকে ঢাকা মুখাপেক্ষী হতে হয়। এ ভোগান্তির যেন শেষ নেই।
প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা চালু হলে, স্বাভাবিকভাবেই অনেক পরিবর্তন সম্ভব হতো। রাজনীতিতেও গুণগত পরিবর্তন আসত। কেন্দ্রীয় দলগুলোর পাশাপাশি, প্রদেশভিত্তিক স্থানীয় দল তৈরি হতো। কেন্দ্রীয় দলগুলোর একচেটিয়া বাজার খর্ব হতো। মার্কার পলিটিক্স পিছিয়ে পড়ত, আর নেতৃত্বের মূল্যায়ন হওয়া সহজ হতো। রাজনীতি চলত এক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে। রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতা বাড়ত। প্রদেশে এবং কেন্দ্রে আমলাদের ওপর ডাবল-লেয়ারড মনিটরিং করা যেত। নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনদের আর ঢাকায় বসে হা-হুতাশ করতে হতো না। ডিসিদের দিয়ে নির্বাচন না করে, নির্বাচন কমিশন তখন নিজেদের জনবল দিয়েই নির্বাচন পরিচালনা করতে পারত। প্রদেশভিত্তিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে নির্বাচন কমিশনেরও একবারে অনেক কাজের চাপ কমত।
প্রাদেশিক সরকারের বড় সুবিধা হচ্ছে, এখানে সাধারণ মানুষ সহজে তার সরকারের কাছে পৌঁছাতে পারবে। প্রদেশভিত্তিক স্থানীয় সরকার থাকলে, স্থানীয় সম্পদের সুষম আর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। প্রদেশগুলোর মধ্যেও অর্থনৈতিকভাবে এক ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। তারা নিজেদের মতো করে স্বতন্ত্রভাবে তাদের উন্নত করার সুযোগ পাবে। কোনো প্রদেশ বন্দরভিত্তিক, কেউ কৃষিভিত্তিক, আবার কেউ আইটিভিত্তিক অথবা শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক বলয় গড়ে তুলবে। অতএব আঞ্চলিকভাবে এবং সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্র স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে। স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। কেন্দ্রীয় সরকার এবং প্রাদেশিক সরকার সবসময়ই এক ধরনের জবাবদিহিতার চাপ অনুভব করবে। ফলে এ দেশের সবচেয়ে বড় যে রোগ দুর্নীতি, তা হ্রাস পাবে। তাই সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশও তখন সারথি হবে।
এমআর ইসলাম: শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়










