‘নিরাপদ মাছে ভরব দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’—প্রতিপাদ্যে দেশব্যাপী জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ পালিত হচ্ছে। নিরাপদ মাছ উৎপাদন বৃদ্ধিতে দেশের মানুষকে সচেতন ও সম্পৃক্ত করাই এবারের লক্ষ্য। মৎস্য চাষে বাংলাদেশের সাফল্য উল্লেখ করার মতো। বিশ্বের যেসব দেশে মৎস্য উৎপাদনের হার বাড়ছে, সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। নতুন জাত উদ্ভাবন ও মৎস্য চাষে বাংলাদেশে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে বলা যায়। এক্ষেত্রে সরকারের প্রচেষ্টা ও উদ্যোগের প্রশংসা করতেই হয়। একই সঙ্গে মৎস্য গবেষক ও মাছ চাষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অসামান্য ভূমিকা এখানে কাজ করেছে। তবে শঙ্কার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় মাছে দূষণ ও বিষক্রিয়া। পানি ও পরিবেশ দূষণের কারণে মাছে সিসাসহ মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি মিলছে। শুধু তা-ই নয়, মাছ চাষে মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে এসেও মাছ অনিরাপদ হয়ে উঠছে ভেজাল ও কেমিক্যাল ব্যবহার করায়। এক্ষেত্রে পানি ও পরিবেশ দূষণ রোধ এবং বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া অনুসরণপূর্বক মাছের খাবার ও বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে হবে। মাছ থেকে শুরু করে বাজারজাত ও ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করতে হবে, যা বিশ্ব খাদ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা যৌথভাবে প্রণয়ন করেছে। সারা বিশ্ব এটি মেনে চলছে, যদিও উন্নত দেশগুলোয় নিজ নিজ প্রটোকল রয়েছে। প্রত্যাশা থাকবে, এবারের মৎস্য সপ্তাহ পালনের মধ্য দিয়ে মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয় মৎস্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাত এবং বাজারজাতে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ‘কোড অব প্র্যাকটিস ফর ফিশ অ্যান্ড ফিশারি প্রডাক্টস’ বাংলাদেশে অনুসরণে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।
মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন নেতৃত্বের ভূমিকায়। গত কয়েক দশকে চাষ করা মাছ এবং এক দশকে প্রাকৃতিক উৎসের মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অগ্রগতি অনুকরণীয়। কিন্তু নদীর নাব্যতা হ্রাস, দূষণ, হাওর-বাঁওড় এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাশয়গুলোর সংকোচন, দখল, অপ-উন্নয়ন ও জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়ার মতো ঘটনা বাড়ছে। একই সঙ্গে মাছ ধরা এবং চাষের সঙ্গে জড়িত বিপুল পেশাজীবীর আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়টি এখনো উপেক্ষিত, যা এই অগ্রগতিকে হুমকিতে ফেলতে পারে। দেশে এখন প্রায় চার কোটি লোক মৎস্য খাতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জড়িত। লাভজনক হওয়ায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত মানুষ ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান মৎস্য চাষে এগিয়ে এসেছে। মৎস্য খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশ্বের অনুপ্রেরণা এখন। ভালো ব্যবস্থাপনা এবং মৎস্যবিজ্ঞানী, মৎস্য অধিদপ্তর ও জেলেদের নিরলস পরিশ্রম, ত্যাগে এটা সম্ভব হয়েছে। হাওর-বাঁওড়, অন্যান্য জলাশয় ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, দূষণ রোধ এবং জাতীয় আয়ে মৎস্য খাতের বিপুল অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। তবেই এ অগ্রগতি ধরে রাখা সম্ভব। পৃথিবীর প্রায় ৫২টি দেশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের মাছের চাহিদা রয়েছে। এসব দেশে বিভিন্নভাবে মাছ রফতানি হচ্ছে। এটি আরো বাড়িয়ে তুলতে নিরাপদ মাছের সরবরাহের কোনো বিকল্প নেই। ভুলে গেলে চলবে না, চিংড়ি মাছে ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া যাওয়ায় ইউরোপে এর রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল। এর পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক প্রটোকল মেনে মৎস্য চাষ এবং বাজারজাত করতে হবে। নিরাপদ মাছের সরবরাহ নিশ্চিতকরণে আন্তর্জাতিক কিছু প্রটোকল রয়েছে, যেগুলো বাংলাদেশও অনুসরণ করতে পারে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক যৌথভাবে প্রণীত ‘কোড অব প্র্যাকটিস ফর ফিশ অ্যান্ড ফিশারি প্রডাক্টস’ শীর্ষক একটি বিস্তারিত প্রটোকল রয়েছে। বিভিন্ন সংস্কার ও সংশোধনের মধ্য দিয়ে ২০২০ সালে এটি চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছে। এতে মাছের পোনা উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাত, বাজারজাত ও ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত কীভাবে মৎস্য অনিরাপদ হতে পারে এবং এখান থেকে পরিত্রাণে করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, প্রাকৃতিক মাছের দূষণ রোধ, নিরাপদ প্রক্রিয়াকরণ, রফতানি, স্থানীয় বাজারজাত, পরিবহন ব্যবস্থা, সংরক্ষণ প্রভৃতি বিষয়ে বিস্তারিত গাইডলাইন রয়েছে। বাংলাদেশ এখনো এ গাইডলাইন পুরোপুরি অনুসরণ করছে না। বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় মাছ অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে। এর কিছু প্রাকৃতিক, আবার কিছু কৃত্রিমভাবে সংঘটিত হয়ে থাকে। পানি দূষণ বন্ধের মাধ্যমে প্রাকৃতিক উৎসকে নিরাপদ করতে হবে। পাশাপাশি মৎস্য চাষ ও বাজারজাতে আন্তর্জাতিক রীতি অনুসরণ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রণীত নীতি দেশে গ্রহণ করতে হবে সর্বাগ্রে। একই সঙ্গে মাঠ পর্যায়ে নীতি বাস্তবায়নে তদারকি বাড়াতে হবে।
মৎস্য চাষ, উৎপাদন ও রফতানিতে চীন সবচেয়ে এগিয়ে। বিপুল জনসংখ্যার চাহিদা মিটিয়ে দেশটি রফতানিতেও প্রথমে অবস্থান করছে। এর পেছনে রয়েছে নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির ব্যবহার। দেশটিতে ছোট একটি ঘরের মধ্যেও মৎস্য চাষ করা হয়। বায়োফ্লেক্স পদ্ধতি চীনেরই উদ্ভাবিত। চীন আগে থেকেই মাছ চাষ ও ব্যবস্থাপনায় অন্যান্য দেশ থেকে এগিয়ে। বিগত দুই দশকে চীন মাছ চাষের ক্ষেত্রে এক ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। এ সাফল্যের স্বাদ এখন শুধু চীন একা ভোগ করছে না, সবাই ভোগ করছে। বিশ্বের উৎপাদিত মোট মাছের শতকরা ৭০ ভাগই উৎপাদন করে চীন। বাংলাদেশে হ্যাচারিতে মাছের পোনা উৎপাদনের কৌশল ষাটের দশকে প্রথম চীন থেকে আসে। হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন প্রযুক্তি ছাড়াও পর্যায়ক্রমে চীন থেকে দ্রুত বর্ধনশীল মাছের প্রজাতি যেমন—সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, মিরর কার্প ইত্যাদি মাছ আমদানি করা হয়েছে। এসব মাছ আমাদের দেশের জলবায়ুতেও দ্রুত বর্ধনশীল। পরিবেশবান্ধব চিংড়ি চাষাবাদের ক্ষেত্রেও চীনের সাফল্য আশাব্যঞ্জক। মাছের রোগবালাই দমনের ক্ষেত্রে প্রচলিত রাসায়নিক দ্রব্যের পাশাপাশি ভেষজ ওষুধ চীনে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে তারা সুফলও পাচ্ছে। বাংলাদেশও ভেষজ ঔষধি গাছে সমৃদ্ধ। মাছের রোগবালাই দমনে এসব ঔষধি গাছ ব্যবহার করা যায় কিনা তা নিয়ে কার্যকর গবেষণা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে চীনের সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে।
মাছের উৎপাদন ত্বরান্বিত করতে প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীকে ‘বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ’ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া মাছের উৎপাদনকে ত্বরান্বিত ও টেকসই করতে, পাশাপাশি বর্তমান সরকারের আমার গ্রাম, আমার শহরের কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যেতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় নেত্রকোনা জেলার সদর উপজেলার ‘দক্ষিণ বিশিউড়া’ ও শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ‘হালইসার’ গ্রামকে ‘ফিশার ভিলেজ’ বা ‘মৎস্য গ্রাম’ ঘোষণা করেছে। এছাড়া সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রজেক্ট ইন বাংলাদেশ প্রকল্পের আওতায় প্রকল্প এলাকায় ১০০টি মডেল ভিলেজ প্রতিষ্ঠা ও ৪৫০টি মৎস্যজীবী গ্রাম উন্নয়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রফতানির বাজার সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণে মান নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। মাছের মান নিয়ন্ত্রণে দেশে তিনটি অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছে। এখানে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে হবে, যেন কোনো দেশেই মাছের সঙ্গে বিষাক্ত উপাদান না যায়। জনবহুল বাংলাদেশের খাদ্যচাহিদা মেটাতে কল-কারখানার বর্জ্য, ফসলি জমিতে কীটনাশক ও সারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে নদীদূষণ এবং অতিরিক্ত মাছ আহরণসহ নানা কারণে দেশী মাছের অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অনেক প্রজাতি হুমকির মুখে রয়েছে। এ থেকে উত্তরণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে দ্রুত।
মৎস্যচাষীরা প্রায়ই বলেন, তারা মাছের ভালো দাম পাচ্ছেন না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে মাছ থেকে মূল্যসংযোজিত পণ্য তৈরিতে জোর দিতে হবে। এতে চাষীরা আর্থিকভাবে অধিক লাভবান হবেন। মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যেমন প্রশংসা পাওয়ার সুযোগ আছে, ঠিক তেমনি সামনে বড় কয়েকটি চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম জলবায়ু পরিবর্তন ও মাছের আবাসস্থলের অবক্ষয়। তাছাড়া দেশে মাছের চাষাবাদ বৃদ্ধি পাওয়ায় আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে চাষাবাদে মানসম্পন্ন উন্নত জাতের মাছের পোনা এবং স্বল্পমূল্যের মানসম্পন্ন মৎস্য খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করা। রোগবালাই দমনে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি মাছের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক বা ওষুধের প্রয়োগ বন্ধ করতে হবে। বাজারে বিষমুক্ত মাছের সরবরাহ নিশ্চিত করতে মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয় তদারকি বাড়াতে পারে। পাশাপাশি বাজারে মাছে ভেজাল বা ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রয়োগ না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। পাশের দেশ মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশ প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ মৎস্য আমদানি করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে কিছু সাদা মাছ ও চিংড়ি ছাড়া তেমন কিছুই রফতানি করতে পারে না ‘উত্তম চাষ’ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মৎস্য খাতকে উন্নয়নের পরের পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুন অনুসারে এর সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে, নিশ্চিত করতে হবে নিরাপদ মাছের সরবরাহ। অভ্যন্তরীণ বাজারে মৎস্য ও মৎস্য পণ্য বাজারজাত করতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানির ক্ষেত্রে মৎস্য ও মৎস্য পণ্য (পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৮ (সংশোধিত) অবশ্যই সবাইকে মেনে চলতে হবে।










