বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য প্রায় ১ হাজার কোটি ডলারের। এফডিআইয়ের সবচেয়ে বড় উৎসও যুক্তরাষ্ট্র। এ বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে রোড শো করছে বাংলাদেশ, আবার যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশে আয়োজন করছে মেলা। এরই ধারাবাহিকতায় রাজধানীতে তিনদিনের ইউএস ট্রেড শো শুরু হয়েছে বৃহস্পতিবার। উদ্দেশ্য বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের প্রসার ঘটানো। বাংলাদেশে কমার্শিয়াল উইংও চালু করেছে যুক্তরাষ্ট্র, আগে এটি ভারত থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো। ইতিবাচক পদক্ষেপ বটে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো গভীর হচ্ছে, এ কথা ঠিক। কিন্তু দুই দেশের সম্পর্কে যে অপার সম্ভাবনা, তার খুব কমই এখন পর্যন্ত কাজে লাগানো গিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় একক বাজার। দেশটিতে জিএসপির আওতায় যে বাণিজ্য সুবিধা পাওয়া যেত, সেটা আপাতত স্থগিত রয়েছে। এ বিষয়ে মনোযোগ দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ আকর্ষণেও জোর তত্পরতা চালাতে হবে। বাংলাদেশ পণ্য রফতানি ও বিনিয়োগ ঘিরে যে উৎসাহ তৈরি হয়েছে সেটি ধরে রাখতে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। উভয় দেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাও দূর করা প্রয়োজন।
প্রতিযোগী দেশগুলো জিএসপির
আওতায় মার্কিন
বাজারে বিভিন্ন
পণ্যের রফতানি
বাড়াচ্ছে। পোশাকপণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার
হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবৃদ্ধিও ভালো, তবে তা যথেষ্ট
নয়। এদিক থেকে প্রতিযোগী
দেশ ভিয়েতনাম
ও ভারতও
এগিয়ে যাচ্ছে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ২ ট্রিলিয়ন ডলারেরও
বেশি আকারের
আমদানিতে বাংলাদেশের
অংশগ্রহণ খুবই সামান্য। বর্তমানে
যে কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে ব্যবসা করছে, তারা যে খুব শান্তিতে
ব্যবসা করতে পারছে তা নয়। সমস্যা
হলো দেশের
আইন-কানুনগুলো
অনেক অস্বচ্ছ।
শেভরনের মতো ফ্ল্যাগশিপ বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলোকে আরো আকৃষ্ট
করতে গেলে যে সমন্বিত
উদ্যোগ বা মনোযোগ প্রয়োজন
তা নীতিনির্ধারকদের নেই। মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মুনাফা।
সমগ্র এশিয়ায়
মার্কিন কোম্পানিগুলো বিপুল পরিমাণে ব্যবসা
করে। সে তুলনায় বাংলাদেশে
দেশটির ব্যবসা
খুবই অপ্রতুল।
বলা যায়, ক্ষুদ্র একটা অংশ। এটি সম্প্রসারণের সুযোগ
রয়েছে। বড় মার্কিন কোম্পানিগুলোকে ধরে রাখার পাশাপাশি
নতুনগুলোকে আকৃষ্ট
করতে যে পরিমাণ পদ্ধতিগত
উন্নয়ন দরকার,
এ বিষয়ে
আমাদের আরো মনোযোগ দিতে হবে। কর জটিলতার মতো বিষয়গুলো দূর করা নিয়ে ভাবতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের
পদ্ধতিগুলো আরো সহজ করা দরকার। বাণিজ্য
বিরোধ নিষ্পত্তির
ক্ষেত্রগুলো আরো স্বচ্ছ হতে হবে। সব মিলিয়ে দেশটির
সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে দেশটিকে আরো বুঝতে
পারার প্রয়োজন।
তাদের কৌশলগত
অগ্রাধিকারগুলোকে আরো ভালোভাবে অনুধাবন
করতে হবে। দুই দেশের
অর্থনৈতিক সম্পর্ক
বা যোগাযোগের
একটা বহুমাত্রিকতা আছে। এ বিষয়গুলো
আমাদের অনুধাবন
করতে হবে। সব মিলিয়ে
বাংলাদেশ সমন্বিত
ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে।
তাহলে বিদ্যমান
সম্পর্কের চেয়েও
বহুগুণ বড় অর্থনৈতিক সম্পর্ক
সম্ভব।
বাংলাদেশ আজ ১৬ কোটি মানুষের বাজার। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বড় কোম্পানি আছে। এসব কোম্পানি ভারতে আসে। সেখান থেকে মাধ্যম হয়ে বাংলাদেশে এলে তাদের পণ্যের দাম ২৫ শতাংশ বেড়ে যায়। ভারত থেকে নেপাল ও ভুটানের মতো বাংলাদেশকে একই মানদণ্ডে বিবেচনা করে। কিন্তু বাংলাদেশের বাজার অনেক বড়। সরাসরি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করলে বাংলাদেশের মানুষের কর্মসংস্থান হতো; প্রযুক্তি হস্তান্তর হতো, যা জরুরি। বাণিজ্যিক সেবা অফিস খোলার মাধ্যমে আমেরিকার বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অনেকগুলো কোম্পানির বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা কাজে লাগাতে হবে।
ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে একজন ঊর্ধ্বতন ফরেন কমার্শিয়াল সার্ভিস অফিসার নিযুক্ত করছে ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্স, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের রফতানির সুযোগ বাড়ানো যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের যেসব কোম্পানি বাংলাদেশের বাজারে আসার বা উপস্থিতি আরো বাড়ানোর কথা বিবেচনা করছে, তাদের সহায়তায় বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতামূলকভাবে কাজ করা যায়। অফিসটি প্রত্যেককে আলাদাভাবে ব্যবসায়িক পরামর্শ দেয়ার কাজকে সহজতর করবে, বাংলাদেশের বাজার-উপযোগী রফতানি দক্ষতা ও তথ্য সরবরাহ করবে এবং ব্যবসায়িক ম্যাচমেকিং ও অন্যান্য সেবার মাধ্যমে সম্ভাব্য বাংলাদেশী অংশীদারদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের সংযোগ ঘটাতে কাজ করতে পারে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অনেকগুলো কোম্পানির বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই বিনিয়োগ নিশ্চিত করে আমরা বাংলাদেশের পরবর্তী ৫০ বছরের উন্নয়নে আরো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। আইসিটি, স্বাস্থ্য, ডিজিটাল ইকোনমি এবং কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। একে পরিচর্যা করা প্রয়োজন।
প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) উৎস হিসেবেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান শীর্ষে। রেমিট্যান্সের উৎস হিসেবেও দেশটির অবস্থান দ্বিতীয়। গত পাঁচ বছরে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় দ্বিগুণে। যুক্তরাষ্ট্র আমদানি বাণিজ্যে চীননির্ভরতা কমাতে চায়। এজন্য পণ্য আমদানির উৎস হিসেবে অন্যতম সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশকেই বিবেচনা করছে দেশটি। অতীতে আফ্রিকার দেশগুলো বা ভিয়েতনামে এ ধরনের বিকল্প তৈরির চেষ্টা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে চীন ইস্যুতে ওইসব দেশ থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে ওয়াশিংটন। বাকি দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই এখন তুলনামূলক বেশি সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন দেশটির বাণিজ্য খাতসংশ্লিষ্টরা। এফডিআই এগুলো হয়তো চোখে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু দৃশ্যমান নয় এমন ক্ষেত্রগুলোয়ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নত হয়েছে, যেমন নলেজ শেয়ারিং। সম্প্রতি প্রাণের সঙ্গে প্রডাকশন শেয়ারিং শুরু করেছে প্রোক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল। এটি মূলত নলেজ ও টেকনোলজি শেয়ারিং। বাংলাদেশের বাণিজ্যসংশ্লিষ্টরা গত পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে অনেক সতর্কতা বজায় রেখেছেন। ইউএসএআইডিও বাংলাদেশকে অনেক সহায়তা দেয় টেকনোলজি ট্রান্সফারের ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফাইজারের টিকা ভারত না পেলেও বাংলাদেশ পেয়েছে। সামগ্রিকভাবে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ইতিবাচক অনেক বিষয়ের ওপর প্রভাব পড়েছে। অর্থনৈতিক কূটনীতিতেও মার্কিনদের সঙ্গে অনেক ভালো অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। ভূরাজনৈতিক একটি প্রেক্ষাপটও আছে। ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে বাংলাদেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। পাঁচ বছর আগে অর্থনৈতিক কূটনীতির গতি অনেক শ্লথ ছিল, যেটা এখন নেই বললেই চলে।
জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি সম্প্রতি বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত করার সুপারিশ করেছে। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সক্ষমতা দেখিয়েছে বলেই এই উত্তরণ। মার্কিন ব্যবসায়ী নেতারা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বর্তমান চিত্রের ব্যাপক প্রশংসা করে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের স্মার্ট গভর্ন্যান্স, মানবসম্পদ, উদ্ভাবনী ব্যবসায়ী উদ্যোগ ও সবুজ জ্বালানি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন মার্কিন ব্যবসায়ীরা। তারা দুর্নীতির ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স চান। নতুন যে এই সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, তার পরিসর আরো বাড়াতে সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের দুর্নীতির ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স দেখাতেই হবে। তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে আরো বিনিয়োগকারী এ দেশে আসতে আগ্রহ প্রকাশ করবেন










