নিবন্ধনের সময়ে দলিলে জমির প্রকৃত শ্রেণী উল্লেখ না করে রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা অহরহই ঘটছে। এতে প্রতি বছরই বড় অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। আবার রাজধানীর অনেক জায়গায় ভূমি বা ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে নিবন্ধনমূল্য প্রকৃত বাজারমূল্যের কাছাকাছি না থাকায় রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা ঘটছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ভূমি বা ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রদর্শিত রেজিস্ট্রেশন মূল্য প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক কম দেখানো হয়। এভাবে কর ফাঁকি রোধ করতে এসব ভূসম্পত্তির নিবন্ধনমূল্যকে বাজারমূল্যের কাছাকাছি পর্যায়ে নিয়ে আসা প্রয়োজন। ভূমি সম্পর্কে দুদকের পর্যবেক্ষণ তাত্পর্যপূর্ণ। একে আমলে নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এতে ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে।

সরকার নির্ধারিত উচ্চ রেজিস্ট্রেশন ফির কারণে ক্রয়মূল্যের অনেক কম দাম দেখিয়ে দলিল করছেন ক্রেতারা। ফলে বৈধভাবে আয় করা অনেক অর্থ-সম্পদই অবৈধ হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কেবল কম দাম দেখিয়ে দলিল করাই নয়, উচ্চহারে রেজিস্ট্রেশন ফি ও সরকার নির্ধারিত জমির ভ্রান্ত মূল্য নির্ধারণের কারণে অনেকে জমি কিনে রেজিস্ট্রেশনও করছেন না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ক্রেতা যে মূল্যে জমি কিনেছেন, সরকার নির্ধারিত মূল্য এর চেয়ে অনেক বেশি। ফলে জমির দামের প্রায় কাছাকাছি পরিমাণ অর্থ ওই ক্রেতাকে খরচ করতে হয় রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ। আবার অনেক এলাকায় জমির দাম এত কম নির্ধারণ করা আছে, যেখানে প্রকৃত ক্রয়মূল্যের তুলনায় সরকার নির্ধারিত দর অনেক কম। সেখানকার ক্রেতারা সরকার নির্ধারিত মূল্যে দলিল করছেন। ফলে শহরে কালো টাকা সৃষ্টি হচ্ছে, আর গ্রামের মানুষকে বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দরে দলিল করতে হচ্ছে। এমন অসামঞ্জস্য দ্রুত দূর করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বাজারমূল্য অনুযায়ী রাজস্ব নির্ধারণের পদ্ধতি অনুসরণ করা যায় এবং অবশ্যই সেটি নিম্নপর্যায়ে রাখতে হবে, যাতে মানুষের মধ্যে কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা হ্রাস পায়। একই সঙ্গে তদারকি ও তদন্ত জোরদার করতে হবে, যাতে কেউ ভূমি শ্রেণী পরিবর্তন বা অন্য কোনো উপায়ে কম দাম দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দিতে না পারে।

তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে বাংলাদেশ বহুদূর এগিয়ে গেলেও ভূমি রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি এখনো ব্রিটিশ আমলের ম্যানুয়াল পদ্ধতিতেই চলছে। প্রচলিত পদ্ধতিতে দলিল লেখক হাতে বা কম্পিউটার টাইপের মাধ্যমে দলিল প্রস্তুত করার পর সাব-রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে দলিলগ্রহীতা দলিলটি রেজিস্ট্রেশনের জন্য উপস্থাপন করেন। সাব-রেজিস্ট্রার উপস্থাপিত কাগজপত্র স্বাভাবিক দৃষ্টিতে সঠিক মনে করলে শুনানি গ্রহণ করে দলিলটি রেজিস্ট্রেশনের জন্য গ্রহণ করেন। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেকর্ড অব রাইটসের কপি না থাকায় উচ্চমূল্যের ভূমির শ্রেণী গোপন করে অপেক্ষাকৃত নিম্ন মূল্যের শ্রেণী দলিলে লিপিবদ্ধ করে জাল পর্চা ও দাখিলা উপস্থাপনের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এ প্রবণতা বন্ধে উন্নত দেশের আদলে ভূমিসংক্রান্ত সব প্রক্রিয়াকে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনা প্রয়োজন। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ভূমির শ্রেণী নির্ধারণের তথ্য না থাকায় সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ভূমি অফিসকে ডিজিটাল করা গেলে এ ধরনের কর ফাঁকি দেয়ার সুযোগ বন্ধ হবে। আবার জমির মালিকানাসংক্রান্ত তথ্যের প্রয়োজনে সহজেই তা পাওয়া সম্ভব হবে। এছাড়া দুদক, এনবিআর বা অন্য কোনো সংস্থা যেকোনো ব্যক্তির সম্পদ নিয়ে সহজেই নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। ভূমি নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এলে রেজিস্ট্রেশন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জনগণকে উন্নত সেবাদানে উৎসাহিত হবেন। এছাড়া রেজিস্ট্রেশন বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থাও বাড়বে। সরকারের প্রকৃত রাজস্ব প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে। ভূমি রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতির প্রস্তাবিত ডিজিটালাইজেশন সম্পন্ন করা হলে একটি দলিল রেজিস্ট্রেশনের কাজ সম্পন্ন করে দ্রুত মূল দলিল ফেরত দেয়া সম্ভব হবে। জাল পর্চা বা ভুয়া ব্যক্তির মাধ্যমে জাল দলিল রেজিস্ট্রেশনের ঝুঁকি দূর হবে। পুরো ভূমি নিবন্ধন প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশন হলে ভূমির শ্রেণী পরিবর্তন করে দলিল রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার সুযোগ বন্ধ হবে।

ভূমি নিবন্ধন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে দলিলে জমির প্রকৃত মূল্য না লিখে কম মূল্য লেখা হয়। এভাবে নিবন্ধন ফি কম দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দেয়া যায় এবং জমি কেনার বিপুল অর্থ গোপন রাখা যায়। আবার বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি মূল্য দেখিয়ে দলিল নিবন্ধন করা হয়, যাতে জমির দলিল ব্যাংকে রেখে বেশি ঋণ পাওয়া যায়। ফলে ভূমি নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সংশোধন না করে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় সত্যিকার অর্থে গতিশীলতা ও গঠনমূলক পরিবর্তন আনতে হলে ভূমি জরিপ, ভূমি প্রশাসন ও ভূমি রেজিস্ট্রেশন বিভাগকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা প্রয়োজন। ভূমিসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এ তিনটি বিভাগের সমন্বয় সাধন করতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে ভূমি জরিপ, রাজস্ব কার্যক্রম একই ছাতার নিচে পরিচালনার জন্য পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগকৃত প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা এবং ভূমি প্রশাসনে কর্মরত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যোগ্য কর্মকর্তাদের দ্বারা কার্যক্রম পরিচালনার সুপারিশ রয়েছে দুদকের।

ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে ভূমি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা সৃষ্টি হলে রেজিস্ট্রেশন বিভাগের কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি পাবে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জনগণকে উন্নত সেবা প্রদানে উৎসাহিত হবে। রেজিস্ট্রেশন বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে। সরকারের প্রকৃত রাজস্ব প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে, যা জনগণের কল্যাণে সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যয় করতে পারবে। সার্বিকভাবে ভূমি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা প্রতিষ্ঠিত হবে। জনগণের জন্য হয়রানি ও দুর্নীতিমুক্ত ভূমি রেজিস্ট্রেশন সেবা প্রদান নিশ্চিত হবে।