বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স)। বাণিজ্য ঘাটতি মেটানোর অন্যতম উৎস রেমিট্যান্স প্রবাহে সাম্প্রতিক সময়ে ভাটা পরিলক্ষিত হচ্ছে। গত বছর বিপুল পরিমাণ মানুষ বিদেশে গেলেও রেমিট্যান্সে তার প্রভাব পড়ছে না। সরকারের নানা উদ্যোগের পরও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রেমিট্যান্স বাড়ছে না। এর জন্য দায়ী করা হচ্ছে হুন্ডি প্রক্রিয়াকে। এ অবস্থায় রেমিট্যান্স বাড়াতে হুন্ডি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, অবৈধ পথে প্রবাসী আয় পাঠানোর প্রমাণ পেলেই ব্যবস্থা নেবে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। শুধু হুঁশিয়ারি নয়, হুন্ডিতে রেমিট্যান্স আসায় চারটি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের ২৩০টি গ্রাহক অ্যাকাউন্ট থেকে ক্যাশ আউট স্থগিত করা হয়েছে। উদ্দেশ্য নাকি তাদের আতঙ্কিত করা। হুন্ডি বন্ধে বিএফআইইউর সক্রিয়তা ইতিবাচক কিন্তু আনুষ্ঠানিক খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান না করে শুধু ব্যবস্থা নেয়া হলে রেমিটান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কাই বেশি, এ বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক বাজারের সংস্কারে জোর দিতে হবে, যাতে প্রবাসীরা এটি ব্যবহারে উৎসাহিত হন। 

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) এক তথ্য মতে, বিভিন্ন দেশে হুন্ডি চক্র এতটাই সক্রিয় হয়ে উঠেছে যে ব্যাংকিং বা অন্য যেকোনো মাধ্যমের চেয়ে অত্যন্ত দ্রুত এবং কোনো রকম হয়রানি ছাড়াই তারা গ্রাহকের ঠিকানায় টাকা পৌঁছে দিচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, হুন্ডি হচ্ছে অর্থ পাচারের একটি ভয়ংকর রূপ ও মাধ্যম। কেননা আমদানি বা রফতানির মাধ্যমে অর্থ পাচার করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ডকুমেন্ট বা কাগজপত্র প্রদর্শন করতে হয়। এর ফলে অপরাধীর পরিচয় কোনো না কোনো সময় প্রকাশ পায়। কিন্তু হুন্ডিতে মূলত এজেন্টের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন হয়। এটি পুরোপুরি চলে বিশ্বাসের ওপর। এখানে কোনো কাগজপত্রের লেনদেন হয় না। এ প্রক্রিয়ায় অর্থ পাচার করা হলে পাচারকারীদের শনাক্ত করা খুবই কঠিন। এছাড়া হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরে খরচ কম। এ কারণেই পাচারকারীরা হুন্ডিকেই পছন্দ করে বেশি। শুধু বাংলাদেশ থেকে অর্থ যায় না, হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ আসেও। বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা থাকায় প্রবাসী শ্রমিকরাও হুন্ডির আশ্রয় নিয়ে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। মূলত যারা অবৈধভাবে পালিয়ে বিদেশে অবস্থান করছে কিংবা যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ, তারাই বাধ্য হয়ে হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক জরিপ বলছে, প্রবাসীরা বিদেশ থেকে দেশে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠায় তার ৪০ শতাংশ আসে ব্যাংকিং চ্যানেলে। সরাসরি প্রবাসী বা তাদের আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে নগদ আকারে আসে ৩০ শতাংশ এবং বাকি ৩০ শতাংশ আসে হুন্ডির মাধ্যমে। হুন্ডির কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ ঠেকাতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সবসময়ই তত্পর থাকে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে হুন্ডির কোনো তথ্য থাকে না। সর্বসাম্প্রতিক মাসগুলোয় দেশে রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমে যাওয়ার হার উদ্বেগজনক। এর পেছনের কারণগুলো চিহ্নিত করতে হবে আগে, তারপর ব্যবস্থা। না হলে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয় খাতে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি হুন্ডি প্রক্রিয়ায় অর্থ পাচার বন্ধ করায় জোর দিতে হবে।

বর্তমানে বৈধপথে প্রবাস আয়ে আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। এছাড়া রেমিট্যান্স প্রেরণকারীদের সিআইপি সম্মাননা দিচ্ছে সরকার। রেমিট্যান্স বিতরণ প্রক্রিয়া সম্প্রসারণ ও সহজীকরণের পাশাপাশি অনিবাসী বাংলাদেশীদের জন্য বিনিয়োগ ও গৃহায়ণ অর্থায়ন সুবিধা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া ফিনটেক পদ্ধতির আওতায় আন্তর্জাতিক মানি ট্রান্সফার অপারেটরকে বাংলাদেশের ব্যাংকের সঙ্গে ড্রয়িং ব্যবস্থা স্থাপনে উদ্বুদ্ধকরণের পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রেরণে ব্যাংক বা এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর চার্জ ফি মওকুফ করা হয়েছে। এছাড়া শ্রমিকদের সুবিধা বিবেচনায় দেশের বাইরে সাপ্তাহিক ছুটির দিন ব্যাংকগুলো নিজস্ব এক্সচেঞ্জ হাউস খোলা রাখতে পারবে। গরিব, স্বল্পশিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত মানুষের জন্য ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট খোলা সহজ হয়নি। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকের শাখা নেই। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ডিজিটাল যুগেও বাংলাদেশের এক ব্যাংকের এটিএম বুথে অন্য ব্যাংকের টাকা ওঠানো কিংবা জমা দেয়া যায় না। এক ব্যাংকের ব্রাঞ্চে অন্য ব্রাঞ্চের আর্থিক সেবা পাওয়া তো দূরের বিষয়। অর্থাৎ ব্যাংক খাত নিজেদের মধ্যেই আন্তঃসংযুক্ত নয় বলে গ্রামীণ সমাজে ব্যাংকিং সেবাপ্রাপ্তি কঠিন। বিদেশী রেমিট্যান্স হাবের সঙ্গে মোবাইল ব্যাংকিং যুক্ত হওয়ায় এ সমস্যা কিছু কমলেও সেখানে আছে স্ক্যামিংয়ের অভিযোগ। অভিযোগ আছে, মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের অনেকেই হুন্ডি ব্যবসায় জড়িত। মোবাইল ব্যাংকিংকে শক্তিশালী মনিটরিং ও অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা দরকার।

বিদেশ থেকে টাকা পাঠাতে হলে ব্যাংক কর্মকর্তারা যেসব প্রশ্ন করেন, তার উত্তর দেয়ার ভয়ে অনেকে ব্যাংকে যেতে চান না। তার কাছে তখন সহজ সমাধান হয়ে ওঠে হুন্ডি। এখন এটা আরো সহজ। দেশে হুন্ডির স্থানীয় এজেন্টরা টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে পাঠিয়ে দেয়। এ প্রক্রিয়া এতটাই সহজ যে তাতে করে সরকারি প্রণোদনাও অনেকে প্রয়োজন মনে করেন না। কারণ, হুন্ডিতে ওই বাড়তি টাকা তার পরিবার পেয়েই যায়। অভিজ্ঞতা যেটা বলে ব্যাংক ও খোলাবাজারে বিনিময় হারে বড় ধরনের পার্থক্য হলে বৈধ পথে প্রবাসী আয় আসা কমে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসী আয়ে যে মন্থর গতি, সেটার জন্য এটা একটা কারণ হতে পারে। তবে বিষয়টিকে এত হালকাভাবে দেখা যাবে না। সরকারের উচিত কেন এ পরিস্থিতি তৈরি হলো, তা এখনই খুঁজে দেখা এবং প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করা। তাহলে বৈধ পথে প্রবাসী আয় ফেরানো খুব বেশি কঠিন হবে না। দেশে বৈদেশিক মুদ্রার অনেক রেট কার্যকর। দেশী বাণিজ্যিক ব্যাংক, কার্ব মার্কেটের অর্থাৎ হুন্ডি মার্কেট ও বিদেশী ব্যাংকের রেট ভিন্ন ভিন্ন। বাংলাদেশ ব্যাংকের দৈনিক ঘোষিত রেট থাকে, কিন্তু তা মানা হয় না। প্রবাসীরা নির্ধারিত রেটে ডলার কেনা কিংবা বেচা কোনোটাই করতে পারেন না। ব্যাংকে এলসি নিষ্পত্তির ডলার হারও বর্ধিত। একজন প্রবাসী ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠালে বা ভাঙালে ‘ঠকেন’ বলেই তারা কার্ব মার্কেট বা হুন্ডিতে গিয়ে লাভবান হন। ব্যাংক ও হুন্ডি মার্কেটের বিনিময় হারের পার্থক্য প্রায়ই ৫ টাকার কাছাকাছি বলে প্রবাসীদের পছন্দের মাধ্যম হুন্ডি। এমনকি সরকার ঘোষিত আড়াই শতাংশ প্রণোদনার পরও হুন্ডি মার্কেটের বিনিময় হার ভালো। ফলে লাভের জন্য হুন্ডি মার্কেট সবার পছন্দ। এক্ষেত্রে টাকার মান বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া বা হুন্ডির কাছাকাছি রাখা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ টাকার মান ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর, টাকা অতিমূল্যায়িত বলে অভিযোগ আছে। একটা প্রমাণ হচ্ছে, আরইইআর অর্থাৎ রিয়েল ইফেক্টিভ এক্সচেঞ্জ রেট। বাংলাদেশের আরইইআর, এনইইআর (নমিনাল ইফেক্টিভ এক্সচেঞ্জ রেট) রেটের চেয়ে বেশি। সম্প্রতি আরইইআর ক্রমাগত বাড়ছে। অর্থাৎ টাকার ক্রয়ক্ষমতা বা ‘প্রাইস কম্পিটিটিভনেস’ বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত ডলারের বিনিময় হারের চেয়েও দুর্বল। প্রবাসী ও ব্যবসায়ীরা ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রা ভাঙাতে গেলে কম বিনিময় পান বলে তিনটি সমস্যা হয়। এক, মুদ্রাটি কার্ব মার্কেটে বা হুন্ডিতে চলে যায়। দুই, বাংলাদেশের রিজার্ভ কম হয়। তিন, বাণিজ্যিক ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস সংকুচিত হয়ে বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রির পথ বন্ধ হয়।  বিদেশগামী ছাত্র, ব্যবসায়ী, রোগী কিংবা পর্যটক সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকে ডলার কিনতে গেলে পুলিশি আচরণসহ হয়রানির শিকার হন। অন্যদিকে বিদেশ থেকে আনা মুদ্রা বিক্রি করতে গেলে রেট কম দেয়, বিভিন্ন কাগজপত্র চায়। কিনতে গেলে কেন যাবেন, কই যাবেন, ভিসা-আমন্ত্রণপত্র জমা দেন, এটা-সেটা আনেন, ওটা নোটারি করেন, ফরম পূরণ করেন, এই-ওই জায়গা থেকে সত্যায়িত করেন, এত কপি ফটোকপি করেন, এসব উৎপাতের পাশাপাশি আছে ডলার নেই, কাল আসেন, বসের সঙ্গে দেখা করেন, আজকে ব্যাংকিং সময় শেষ, এসব আসলে হয়রানি ও ঘুসের বাহানা। একদিকে অর্থ অন্যদিকে শ্রমঘণ্টা নষ্ট। বিপরীতে হুন্ডি এজেন্টরা ফোন দিলে বাসায় টাকা ও বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে আসে—স্যার কখন লাগবে, কী পরিমাণ লাগবে। মুদ্রা বিনিময় যে একটা বিধিবদ্ধ ব্যাংকিং সেবা হওয়া উচিত, এই বোধটা বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নেই বললে চলে। সেবা মানের ধারণা পরের বিষয়। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সেবা নেই। বিদেশে প্রয়োজনে বৈধভাবে সীমিত পরিমাণ অর্থ নেয়ার সহজ সুবিধাও কম। আছে আবেদন ও অনুমতির প্রশ্ন। বাংলাদেশ ব্যাংককে এসব বিষয় আমলে নিতে হবে।

হুন্ডি একদিকে সহজলভ্য, অন্যদিকে হুন্ডির হোম সার্ভিস একটা বড় সেবা। ব্যাংকগুলো এজেন্ট ব্যাংকিং শুরু করলেও আস্থা তৈরি করতে পারেনি। ব্যাংক খাত কীভাবে প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে হোম সার্ভিস দিতে পারে, তা নিয়ে ভাবা যেতে পারে। সর্বাগ্রে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আনার খরচ কমাতে হবে। রেমিট্যান্সের প্রণোদনার ব্যবস্থাটি চলমান রাখতে হবে। মনিটরিং আরো জোরদার করতে হবে। শাস্তির বিধানগুলো কার্যকর করতে হবে। রেমিট্যান্সের অর্থ যাতে গ্রাহক দ্রুত পেতে পারে বাজেটে এমন কিছু করতে হবে। কারণ মানুষ হুন্ডিতে যাওয়ার প্রথম কারণ হলো অর্থ দ্রুত পাওয়া। যেকোনো অঞ্চল থেকে মানুষ দ্রুত হুন্ডিতে অর্থ পায় বলেই এটি জনপ্রিয় হয়েছে। তাছাড়া ব্যাংক খাতের উন্নয়নে ব্যাংকগুলোয় সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও সংস্কার করতে হবে।