এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিপণন ব্যবস্থাপকরা তাদের প্রবৃদ্ধি কৌশলে, নীতি নির্ধারণে এবং বাজারজাতে কৌশল প্রণয়নে ‘প্যারেটো ল’ নামে পরিচিত ‘৮০/২০ নীতি’র একটি ধারণা বা তত্ত্ব কাজে লাগিয়ে আসছেন। কিন্তু সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার এহরেনবার্গ-বাস ইনস্টিটিউটের প্রথিতযশা  বিপণন বিশেষজ্ঞ  অধ্যাপক বাইরন শার্প বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন যে বর্তমান বাস্তবতায় প্যারেটো লর ৮০/২০ তত্ত্ব অপ্রাসঙ্গিক; বরং কালের বিবর্তনে নতুন প্যারেটো ল এখন ৬০/২০। ৮০/২০ নীতির শিকড় বর্তমান ব্যবসায়িক বিশ্ব এবং বিপণনচর্চার অনেকটাই গভীরেই প্রোথিত আছে এবং এ বিবেচনায় নতুন এ তত্ত্বের অবতরণ এবং প্রয়োগ খুবই কৌতূহলোদ্দীপক একটি বিষয়।

অধ্যাপক শার্প হচ্ছেন প্রমাণনির্ভর বিপণনের একজন পুরোধা। তিনি শতাধিক বিপণনবিষয়ক মার্কিন বই, গবেষণা নিবন্ধ, গবেষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো নীতি ও ভুল ধারণার বিস্তারকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। এ সময়ে পণ্য/সেবা বিপণন গবেষণায় তিনি একজন বিপ্লবী ধারণার প্রবর্তক। বিপণন ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে প্যারেটো ল, যা বেশির ভাগ স্থানেই ৮০/২০ নীতি নামেই বেশি পরিচিত, সেটি অত্যন্ত পরিচিত ও বহুল চর্চিত একটি তত্ত্ব। ক্রেতার সঙ্গে সুসম্পর্ক ব্যবস্থাপনা বা কাস্টমার রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট  (সিআরএম) পরিচালনায় প্যারেটো ল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ ব্যবসার মুনাফা-সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত প্রণয়ন ও ক্রেতার তথ্যভাণ্ডার-সংশ্লিষ্ট কৌশল নির্ধারণে বিপণনবিদদের একটি বড় অংশ এই ৮০/২০ নীতিই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেন। এছাড়া ব্যবসায়িক নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও  নীতিনির্ধারণে বর্তমানে ক্রেতাসংক্রান্ত তথ্যভাণ্ডারকেই ব্যবহার করা হয়, যেটি ডিজিটালাইজেশনের বর্তমান এ যুগে ব্যবসায়িক নির্বাহীরা সবসময় ব্যবহার করেন। তবে বর্তমান বিপণন ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্যারেটো লর পুরনো হয়ে যাওয়া বা অপ্রাসঙ্গিকতা ছাড়া এ নীতির আর কোনো ভুল নেই।

প্যারেটো ল কী?

ইতালিয়ান অর্থনীতিবিদ জোসেফ এম জুরান একজন মান ব্যবস্থাপনাবিষয়ক উপদেষ্টা ‘ভিলফ্রিদো প্যারেটোর’ নামে এ বিষয়টির কথা প্রথম লিখেছিলেন। প্যারেটো ১৮৯৬ সালে ৮০/২০ নীতির সম্পর্কে ধারণা দিয়েছিলেন। ব্যবসায়িক নীতিনির্ধারণ জগতে প্যারেটো ল বহুলভাবে স্বীকৃত হলেও দুঃখজনকভাবে এ বিষয়ে জুরানের নামটি কেউ মনে রাখেনি।

ভিলফ্রিদো প্যারেটোর তত্ত্ব থেকে জানা যায়, ইতালির ৮০ শতাংশ জমি ২০ শতাংশ জনগণের মালিকানায় ছিল। জুরানডটকম (juran.com) ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে, জুরান বুঝতে পেরেছিলেন এই ৮০/২০ নীতি আয়, জনগণের সম্পদ এবং মান ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।   পরবর্তী এক শতাব্দীতে ধীরে ধীরে ব্যবসায়িক জগতে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি হিসেবে স্থান পেয়ে যায়। প্রতিষ্ঠানের ৮০ শতাংশ বিক্রয়ের পেছনে রয়েছে শীর্ষ ২০ শতাংশ ক্রেতা প্যারেটো ল—এটিই বলার চেষ্টা করেন।

আরো সহজভাবে বলতে গেলে, ২০ শতাংশ জোগান ৮০ শতাংশ পণ্য উৎপাদনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। ১৯৯০ সালে ইউএনডিপির মানব উন্নয়নসংক্রান্ত প্রতিবেদনে পৃথিবীব্যাপী ‘আয় অসমতা’র বিষয়টি বোধগম্যভাবে প্রদর্শিত হয়। এটি দেখায় বিশ্বব্যাপী আয়ের বিন্যাসের অসমতা কতটা তীব্র ও প্রকট; যেখানে পৃথিবীর ২০ শতাংশ মানুষ ৮২ দশমিক ৭ শতাংশ আয় নিয়ন্ত্রণ করছে। ২০১০-এর দশকে আয়ের এ অসমতা আরো ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়, যা বর্তমান সময়ে আরো তীব্রতর হয়েছে।

অর্থনীতি, গণিতশাস্ত্র, ক্রীড়া, দল ব্যবস্থাপনা এবং গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় ৮০/২০ নীতির অনেক উদাহরণ ও বাস্তবায়ন রয়েছে। একই সময়ে অনেকেই বিষয়টির গাণিতিকভাবে স্বীকৃতির বিরোধিতা করে, বরং এ তত্ত্বকে একটি অনুমাননির্ভর তত্ত্ব হিসেবেও আখ্যায়িত করার চেষ্টা করেন।

বিপণন ব্যবস্থাপকদের জন্য ৮০/২০ তত্ত্বে কী আছে?

অধ্যাপক শার্প ও অধ্যাপক জেনি রোমানিউক তাদের ২০০৭ সালের এক নিবন্ধে বলেন, বিপণনের ক্ষেত্রে ৮০/২০ নীতি যতটা ভাবা হয় ততটা কার্যকর নয়। ২০১০ সালে প্রকাশিত তাদের বই ‘হাউ ব্র্যান্ডস গ্রো’-এ তারা বলেন, ৮০/২০ তত্ত্ব একটি ‘বিভ্রান্তিমূলক সরলতা’। তারা বলেন, এটি ৬০/২০ তত্ত্ব হিসেবে কাজ করতে পারে কিন্তু কখনই ৮০/২০ তত্ত্বের মতো কার্যকর হবে না।

প্রথমবার বিষয়টি উত্থাপনের ১২ বছর পর, ২০১৯ সালে তারা নিশ্চিত করেন যে একটি ব্র্যান্ডের/ব্যবসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বা শীর্ষ ২০ শতাংশ ক্রেতা সাধারণত কোনো বছরে ৫০ শতাংশের বেশি বিক্রয়ে ভূমিকা রাখেন না এবং পরবর্তী বছরগুলোয় তাদের এ ভূমিকা ক্রমেই কমতে থাকে। এমনকি সবচেয়ে স্থিতিশীল ক্রেতা বা বিগত বছরের সবচেয়ে বড় ক্রেতারাও পরবর্তী বছরে ২০ শতাংশ বিক্রয়ে ভূমিকা রাখতে পারেন অথচ ক্ষুদ্র ক্রেতারা বিগত বছরের চেয়ে পরবর্তী বছরে বেশি ভূমিকা রাখতে পারেন। 

অধ্যাপক শার্প ও তার কর্মী দল হচ্ছে প্রথম গবেষক দল, যারা ৮০/২০ মতবাদের মতো একটি প্রতিষ্ঠিত নীতিকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। পরবর্তী গবেষণাগুলোয় তারা বিভিন্ন রকম ফলাফল দেখতে পান, যেগুলো হচ্ছে ৬০/২০, ৫৩/২০ বা ৫০/২০ এবং ৬৫/২০ নীতি। ২০১১ সালে এরিক ব্রিঞ্জলফসেন, ইউ (জেফরি) হু এবং ডাংকান সিমেস্টার আনুষ্ঠানিকভাবে বলেন,  ‘বিদায়, প্যারেটো নীতি’।

গত ১২ বছরে এহরেনবার্গ-বাস ইনস্টিটিউট ফর মার্কেটিং সায়েন্স বিভিন্ন গবেষণা করে এবং তারা একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে বিপণনের ক্ষেত্রে ৮০/২০ তত্ত্বের প্রয়োগের চিন্তা একটি ভুল ধারণা। 

এ ব্যাপারে অধ্যাপক ‘হেরাল্ড গুড হার্ড’ নামে আরেকজন প্রখ্যাত গবেষক পরবর্তী সময়ে বলেন, ২০:৩০:৫০ তত্ত্ব বাস্তবতার আরো বেশি কাছাকাছি। এ তত্ত্ব বলে যে ২০ শতাংশ শীর্ষ ক্রেতা ৫০ শতাংশ বিক্রয়ের জন্য দায়ী, অন্যদিকে ৫০ শতাংশ ক্ষুদ্র ক্রেতা কিনে থাকেন ২০ শতাংশ পণ্য আর মাঝখানের ৩০ শতাংশ ক্রেতারা কিনে থাকেন ৩০ শতাংশ পণ্য। অল্প কথায় বলতে গেলে, ২০:৩০:৫০ শতাংশ ক্রেতারা ৫০:৩০:২০ শতাংশ কেনাকাটার জন্য দায়ী। তাই এটি বলা যায়, ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় বিপণনের কৌশল প্রণয়নে মধ্যম ও ক্ষুদ্র ৫০ শতাংশ ভোক্তাকে আরো বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত।

ব্যবসার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন বাস্তবতা এবং বাংলাদেশ 

২০১৩ সালে আমি প্রাইম ব্যাংকের ‘প্রায়োরিটি ব্যাংকিং’ সেবার পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলাম। আমি আমার অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ থেকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ৮০/২০ তত্ত্বের কার্যকারিতা দেখতে পাই।

আমি ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের নির্বাহীদের সাহায্যে ব্যাংকিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে গুলশান, বনানী, মতিঝিল ও ধানমন্ডি শাখার ক্রেতাদের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখতে পাই শীর্ষ ২০ শতাংশ অ্যাকাউন্টধারী তাদের নগদ অর্থ, সঞ্চয়, মেয়াদি আমানতের মাধ্যমে ব্যাংকের ৮০ শতাংশ তহবিলের মালিক। এভাবেই তারা ‘প্রায়োরিটি ব্যাংকিং’ সেবার যোগ্য বিবেচিত হন এবং উচ্চসেবা গ্রহণের সুবিধা ভোগ করেন।

মূল্যবান এবং উচ্চ মুনাফা সৃষ্টিকারী ক্রেতাদের বিশেষ সেবা প্রদানের মাধ্যমে আমরা এ তহবিল ধরে রাখতে পারি, যাতে ব্যাংক অলস পড়ে থাকা এসব টাকা নিয়ে ব্যবসা করতে পারে। বিপরীতে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রেতারা ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে পাঁচ তারকা হোটেলের মতো উচ্চমানের সেবা পেয়ে থাকেন।

পরবর্তী সময়ে আমরা দেশব্যাপী উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখতে পাই ব্যাংকের শীর্ষ ২৫ শতাংশ অ্যাকাউন্টধারী ৮০ শতাংশ অর্থপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত।

আমার মনে আছে, নিয়েলসন আরএমএসের (রিটেইল মেজারমেন্ট সিস্টেম) একটি দল আমাদের কাছে তাদের একটি পণ্যের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল। তাদের ডাটাবেজ/তথ্যভাণ্ডার খুচরা ব্যবসায়ীদের নিয়ে এবং তাদের লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে। নিয়েলসনের পক্ষ থেকে আমাদের বলা হয়, তারা শুধু নাম ব্যতীত আমাদের সেরা ২০ শতাংশ খুচরা ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন লেনদেনসংক্রান্ত তথ্যাদি সরবরাহ করতে পারবে, যারা ৮০ শতাংশ বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ করে থাকে (এফএমসিজি খাতে)। যদিও পরবর্তী সময়ে এ প্রস্তাব আমাদের কাছ থেকে আর গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। কারণ এ ধরনের মতবাদ এবং দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্যারেটো ল ছাড়া এর আর কোনো ভিত্তি ছিল না।

সম্প্রতি একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়, যেখানে বলা হয় ফেসবুকের সেরা ১০০ বিজ্ঞাপন শুধু তাদের ১৬ শতাংশ আয়ে ভূমিকা রাখে। বলা বাহুল্য, বিশ্বব্যাপী ৩০ লাখ প্রতিষ্ঠান ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে।

অনেকেই বলেন, প্রাইভেট লেবেল ব্র্যান্ড/পণ্যের ক্ষেত্রে ৮০/২০ নীতি প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে আপনি তাইওয়ানিজ একটি চুক্তিভিত্তিক ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ফক্সকনের কথা বিবেচনা করতে পারেন। ফক্সকন মূলত আমেরিকান, কানাডিয়ান, চাইনিজ, ফিনিশ ও জাপানি কোম্পানিদের জন্য কাজ করে। ফক্সকন সাধারণত যে পণ্যগুলোর জন্য কাজ করে, তার মধ্যে রয়েছে ব্ল্যাকবেরি, কিন্ডলে, নিনতেন্দো ডিএস, আইপ্যাড, আইফোন, আইপড, নকিয়া সামগ্রী, উই উ, এক্স বক্স ৩৬০, এক্স বক্স ওয়ান, প্লেস্টেশন ৩ এবং প্লেস্টেশন ৪। ফক্সকনের সেরা ২০ শতাংশ ক্রেতা এর আয়ের ৮০ শতাংশ এনে দেন। আরেকটি উদাহরণ হতে পারে ইন্টেল, যারা অ্যাপল, লেনোভো, এইচপি ও ডেলের জন্য মাইক্রো প্রসেসর সরবরাহ করে। এখানেও আমি ধারণা করি, ইন্টেলের শীর্ষ ২০ শতাংশ গ্রাহক তাদের ৮০ শতাংশ আয় এনে দেন।

এছাড়া বর্তমানে প্রায় সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই পণ্যের কাঁচামালের জন্য বা পণ্য চূড়ান্তভাবে তৈরির জন্য একাধিক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভর করেন। ২০২০ সালের অক্টোবরে রয়টার্সে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যাপল তাদের পণ্য চূড়ান্তভাবে প্রস্তুতকরণের জন্য ফক্সকন ছাড়াও লাক্সশেয়ার নামে আরেকটি চীনভিত্তিক ইলেকট্রনিকস পণ্যপ্রস্তুতকারক কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে এবং কোম্পানিটি (লাক্সশেয়ার) অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। ‘মর্নিংস্টার রিসার্চ’-এর মতে, লাক্সশেয়ারের প্রাপ্ত আয়ের ৫৮ শতাংশ আসে অ্যাপল থেকে। সুতরাং এটি বলা যায়, লাক্সশেয়ারের ৮০ শতাংশ আয় আসলে শীর্ষ কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকেই আসছে। 

অতিসম্প্রতি আমি বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য বিপণন কর্তার সঙ্গে কথা বলি, যিনি সিগারেট, খাদ্য ও পানীয় শিল্পে অত্যন্ত অভিজ্ঞ এবং বর্তমানে তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আছেন। তিনি আমাকে জানান, তিনি লক্ষ করেছেন বাংলাদেশের এফএমসিজি খাতে ৭০/৩০ নীতি প্রযোজ্য। তবে আমি বিশ্বাস করি, এ নীতি ‘বিজনেস-টু-বিজনেস’ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ‘বিজনেস-টু-কাস্টমার’ প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি প্রযোজ্য। 

অন্যদিকে বাংলাদেশের মোড়কজাত পণ্যের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং এ বিষয়ে আমরা আগের ন্যায় একই সিদ্ধান্তে প্রত্যাবর্তন করতে পারি না। কিন্তু আমি এটা বলতে পারি যে বাংলাদেশের ভোক্তামুখী কোনো পণ্য বা ব্যবসার ক্ষেত্রে ৮০/২০ নীতি কার্যকরী নয়। কারণ লাখ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আমাদের বিক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রতিনিয়ত ভূমিকা পালন করছেন। আর কোটি কোটি ভোক্তার মাধ্যমে আমাদের প্রতিদিনের বিক্রয় কার্যক্রম চলছে, যার মধ্যে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় ধরনের ক্রেতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। তাই ব্যাপারটি সহজ নয়। তবে এর প্রয়োগ খুবই কৌতূহলোদ্দীপক একটি বিষয়।

গবেষকরা এরই মধ্যে প্রমাণ করেছেন যে একটি ব্র্যান্ডের/ব্যবসার অর্ধেকেরও বেশি বিক্রয় খুব ক্ষুদ্র ৮০ শতাংশ ক্রেতার মধ্য থেকেই আসতে পারে, বিষয়টি আশা করা কোনো প্রকার ভুল নয়। তাই প্রফেসর শার্পের মতোই আমিও বলতে চাই, প্যারেটো ল নিয়ে কথা বলাই যায় কিন্তু ‘এটি সবসময়ই ৮০/২০ পদ্ধতিতে কাজ করবে বলে মনে করে নেয়াটাই হবে ভুল।’

আমি অবশ্য বলতে চাই, যখন বেশির ভাগ গবেষক ও বিশেষজ্ঞ এটিকে একটি নীতি হিসেবে দেখিয়েছে, অধ্যাপক শার্প এটিকে দেখিয়েছেন একটি আইন হিসেবে। কিন্তু ব্যাংকিং, বিজনেস-টু-বিজনেস এবং আরো কিছু ব্যবসার ক্ষেত্রে এ ৮০/২০ নীতির এখনো মূল্য রয়েছে, বিশেষ করে তাদের কাছে যারা সাবলীলভাবে তথ্যসমৃদ্ধ সিদ্ধান্ত নিতে এবং উদ্দেশ্য নিরূপণসাপেক্ষে কাজ করেন।

আমার এ লেখার ড্রাফটটি যুক্তরাজ্যের পেপসিকোর ‘রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ বিভাগের পরিচালক জন বোউসকে দেখানোর পর তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মাঝে মাঝে ৮০/২০ নীতির ব্যবহার করা সম্ভব বলে মনে করি। আমি এক্ষেত্রে ৮০ ভাগ পদার্থবিজ্ঞান ও ২০ ভাগ গবেষণার প্রণালির বিষয় বলে মনে করি। তবে সেক্ষেত্রে যা নিয়ে আমি কিছু গবেষণা করছি, শুরু করার জন্য আমার সেই খাদ্যপণ্য নিয়ে কিছু প্রয়োজনীয় জ্ঞান থাকতে হবে।’

পণ্য উন্নয়ন ও বিপণনের ক্ষেত্রে ৮০/২০-এর নীতির প্রভাব অনেকটা ব্যাপক। যদিও অধ্যাপক শার্পের সঙ্গে একমত পোষণ করে আমি বলতে পারি, ভোগ্যপণ্য ও মোড়কজাত এফএমসিজি পণ্যের ক্ষেত্রে ৮০/২০ নীতিকে এখন ‘সেকেলে’ বলা যায় এবং ব্যবহারিকভাবে এটি এখন আমাদের মেনে নিতে হবে যে ‘বিপণনের ক্ষেত্রে প্যারেটো ল হচ্ছে ৬০/২০।

 

এস এম দিদারুল হাসান: ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার, মার্কেটিং

ইস্পাহানি টি লিমিটেড