ফান্ড বন্ধ করে দেয়ার ইউজিসির ঘোষণার পরও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টাররোলে নিয়োগ বন্ধ হয়নি। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক বছরের ব্যবধানে দেশের ৪৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০৬ জনকে নতুন করে মাস্টাররোলে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এতে মাস্টাররোলে কর্মচারীর সংখ্যা ৩ হাজার ১০৩ থেকে বেড়ে ৩ হাজার ৩০৯ জনে দাঁড়িয়েছে। অস্বচ্ছ ও অনৈতিক নিয়োগ এবং আর্থিক বিধিমালা লঙ্ঘিত হওয়ার ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অ্যাডহক ও মাস্টাররোলে নিয়োগের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট উপাচার্যরা বিতর্কিত ভূমিকা পালন করছেন। চাকরিতে প্রবেশে নাগরিকের সমান অধিকার সংবিধান স্বীকৃত। অ্যাডহক নিয়োগে বাংলাদেশের সংবিধান লঙ্ঘিত হচ্ছে। এ অধিকার সুরক্ষায় সব ধরনের অনৈতিক নিয়োগ বন্ধ করা প্রয়োজন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের জন্য ইউজিসি প্রণীত শিক্ষক নিয়োগ-পদোন্নয়নের নীতিমালা যথাযথ বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। যেসব উপাচার্য এ ধরনের অনৈতিক নিয়োগ দিতে চান না তাদের ওপর অহেতুক চাপ তৈরি হচ্ছে। প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগের সুযোগ না থাকায় অদক্ষ লোক নিয়োগ পাচ্ছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়মের সংস্কৃতি চালু হচ্ছে। এমন প্রবণতা বন্ধে ইউজিসিকে আরো শক্ত অবস্থান গ্রহণ করতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মাস্টাররোল ও চুক্তিভিত্তিক উপায়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তাদেরই বিভিন্ন পদে স্থায়ী করা হয়। বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হলেও মাস্টাররোলের কর্মচারীরাই অগ্রাধিকার পেয়ে আসছেন। এর কারণ মাস্টাররোলে নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রতিষ্ঠানের ওপর এক ধরনের অধিকার সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন নিয়োগের ক্ষেত্রে তারা বিশেষ সুবিধা বা আনুকূল্য নিতে চান। দীর্ঘদিন ধরে এ সংস্কৃতি চলে আসছে। এতে অপেক্ষাকৃত যোগ্যরা বঞ্চিত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, মাস্টাররোলে নিয়োগে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি হয়ে থাকে। এ নিয়োগের জন্য ইউজিসির আগাম অনুমতি নিতে হয় না, এমনকি কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিও দিতে হয় না। মেয়াদের শেষ সময়ে এসে উপাচার্যের মাস্টাররোলে অনেক নিয়োগ প্রদান এবং পরবর্তী সময়ে তাদের দাবি মানতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার উদাহরণও কম নেই। মাস্টাররোলে নিয়োগে যোগ্যতার চেয়ে ঘুস প্রদান ও আত্মীয়স্বজনের পরিচয় বেশি প্রাধান্য পায়। তাছাড়া মাস্টাররোলে নিয়োগপ্রাপ্তদের পরবর্তী সময়ে স্থায়ী করার চাপ থাকে, একাধিক আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
মাস্টাররোলে নিয়োগ দেয়া হয় দৈনিক ভিত্তিতে। অর্থাৎ প্রতিদিনের মজুরি ভিত্তিতে বেতন দেয়া হবে। তবে দীর্ঘদিন ধরে মাস্টাররোলে নিয়োগ স্থায়ী পদে নিয়োগের পূর্ব ধাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ যারা মাস্টাররোলে নিয়োগ পেতেন, তারাই পরবর্তী সময়ে রাজস্ব পদে নিয়োগ পাচ্ছিলেন। কারণ মাস্টাররোলে কাজ করার কারণে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর তাদের এক ধরনের অধিকার তৈরি হয়। ফলে যোগ্য কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দেয়া কঠিন হয়ে পড়ছিল। আর নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যেহেতু একটি অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম থাকে, তাই এর বাইরে কোনো কর্মচারী নিয়োগ দেয়ার সুযোগ নেই। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিভিন্ন সময়ে মাস্টাররোলে নিয়োগ বন্ধ করতে নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু হতাশাজনক বিষয় হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন সেটি অনুসরণ করছে না। এক্ষেত্রে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টাররোলে নিয়োগের কোনো বিধান পাওয়া যায় না। পাশের দেশ ভারতে একসময় এমন প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেয়া হলেও এখন সেখানেও মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদান করা হচ্ছে।
বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েরই সিন্ডিকেট-সিনেটের সদস্য হিসেবে থাকেন এক/একাধিক সংসদ সদস্য বা রাজনৈতিক নেতা, যারা সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরই শুরু করেন নিয়োগ বাণিজ্য। কিছু ব্যতিক্রম আছে অবশ্য। তাদের প্রভাব এতটাই থাকে যে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ না দিলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপাচার্যের পদটি পর্যন্ত চলে যেতে পারে। এ ভয়ে উপাচার্যরাও নিরুপায়। যদিও অনেক সময় এ দৌড়ে উপাচার্যরাও পিছিয়ে নেই! সেই সঙ্গে যুক্ত থাকেন সরকারি দলের কিছু ক্ষমতাশীল শিক্ষক, যারা বিভিন্ন সময়ে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যমতে, ছেলেমেয়ে-আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে বাসার কাজের ছেলেমেয়েদের পর্যন্ত নিয়োগ দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না। এমনও দেখা যায়, ব্যক্তিকে সামনে রেখে ইচ্ছামতো বিদ্যমান আইনকানুন পরিবর্তন করে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অনুমোদন না নিয়েই নিয়োগ দিয়ে যাচ্ছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই গবেষণা ও শিক্ষা উন্নয়ন খাতের বাজেট কমে আসে। কিন্তু নিয়মবহির্ভূতভাবে চালানো কর্মকাণ্ডের জন্য কারো কোনো শাস্তি হয় না। এ বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের জোরালো ভূমিকা জরুরি। নতুন জনবল নিয়োগ বন্ধ করার পাশাপাশি অতিরিক্ত জনবলকে প্রয়োজনে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে জনবল ঘাটতি আছে, সেখানে বদলির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নিজস্ব আয় বাড়ানোর চেষ্টার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধাও বাড়ানোর ব্যাপারে আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন।
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় যেন বিধিবিধান অনুসরণ করে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে, এজন্য দফায় দফায় নির্দেশনা দিচ্ছে ইউজিসি। উপাচার্য, ট্রেজারার, রেজিস্ট্রারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সভা ও কর্মশালা করা হয়েছে। লিখিত নির্দেশনার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানে মৌখিকভাবেও দিকনির্দেশনা দেয়া হয়। এর পরও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পুরোপুরি আর্থিক ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত হচ্ছে না। বিশেষ করে মাস্টাররোলে নিয়োগ বন্ধ করতে কমিশনের পক্ষ থেকে কয়েকবার নির্দেশনা দেয়া হয়। এক্ষেত্রে শুধু নির্দেশনাদান বা সতর্ক করলেই হবে না, নিয়ম ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে ইউজিসির বলিষ্ঠ ভূমিকা প্রত্যাশিত।










