বাংলাদেশকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণের সবুজ সংকেত দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এমন ইঙ্গিত দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আইএমএফ তিন মাসের মধ্যে এ ঋণের আনুষ্ঠানিকতা চূড়ান্ত করবে। সাত কিস্তিতে এ ঋণ দেবে তারা। প্রথম কিস্তির ঋণ মিলবে আগামী ফেব্রুয়ারিতে। আর সর্বশেষ কিস্তির ঋণ পাওয়া যাবে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। ঋণের সুদহার হবে বাজারদর অনুযায়ী। তাতে গড় সুদহার হবে ২ দশমিক ২ শতাংশ। সন্দেহ নেই আইএমএফের ঋণ অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি দেবে। তবে এতে সন্তুষ্ট হয়ে বসে থাকলে চলবে না। বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কার, যা আইএমএফও বলছে। আর্থিক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নতুন কয়েকটি আইন প্রণয়ন এবং পুরনো কয়েকটি আইন সংশোধনের চলমান কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা, মুদ্রার বিনিময় হার ও সুদের হার উন্মুক্তকরণ, আর্থিক খাত ও রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার জোরদার এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আহরণ বাড়ানোসহ বেশকিছু শর্ত দিয়েছে আইএমএফ। অর্থনীতিবিদরা এসব সংস্কারে সরকারকে অনুরোধ করে আসছিলেন অনেক দিন থেকে, কিন্তু তা আমলে নেয়া হয়নি। আজকের অর্থনৈতিক সংকটের জন্যও সংস্কারে সরকারের উদাসীনতা কম দায়ী নয়। আইএমএফের ঋণের পাশাপাশি অর্থনীতিতে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানেও উদ্যোগ নিতে হবে।
বিশ্ববাজারে অভূতপূর্ব হারে বেড়ে
গিয়েছে জ্বালানি,
খাদ্যপণ্য ও নিত্যপণ্যের দাম; তাই বাজেট
সহায়তার প্রয়োজন।
সে সময় থেকেই সরকার
ঋণসহায়তা চাইছে।
শুধু তা-ই নয়, বাণিজ্য ঘাটতি
মেটাতেও এ ঋণ দরকার।
প্রত্যেক ঋণদাতাই
তার অর্থ
সুদে-আসলে
ফেরত পাওয়ার
নিশ্চয়তা চায়।
আইএমএফও এর ব্যতিক্রম নয়। ঋণ দেয়ার
ক্ষেত্রে দাতারা
কিছু শর্ত
আরোপ করে, যার কিছু
কঠিন, আর কিছু সহজ।
কিছু শর্ত
পূরণ জনগণের
জন্য ভোগান্তি
বয়ে আনে।
আর কিছু
শর্ত আছে, যা পূরণ
করতে গেলে
শাসকদের স্বার্থ
ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক্ষেত্রে ভারসাম্য
রক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেয়া
প্রয়োজন। আলোচ্য
বিষয়গুলোর মধ্যে
রয়েছে ভর্তুকি
কমানো, রাজস্ব
খাতে সংস্কার,
মূল্যসংযোজন কর (ভ্যাট) হারের
কাঠামো সহজ, বাজেট থেকে
সঞ্চয়পত্রকে আলাদা,
ব্যাংকঋণের বর্তমান
সুদহার ৯ শতাংশ তুলে
দেয়া, নগদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা
আনা, রাষ্ট্রীয়
মালিকানাধীন ব্যাংকসহ
ব্যাংক খাতে
খেলাপি ঋণ কমানো, ব্যাংক
খাতে সুশাসন
নিশ্চিত, নজরদারি
বাড়ানো এবং ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা
সঞ্চিতি বিলম্বে
সংক্ষরণ প্রভৃতি।
আইএমএফ প্রতিনিধি
দলের বাংলাদেশের নিম্ন কর-জিডিপি
অনুপাত নিয়ে
উদ্বেগ যথার্থ।
কিন্তু প্রধানত
ভ্যাটের ওপর আইএমএফের প্রস্তাবিত কৌশলের নির্ভরতা উদ্বেগজনক,
যার বৈষম্যমূলক প্রভাব সর্বজনবিদিত। অন্যদিকে
শর্তগুলো ব্যাপক
কর ফাঁকি
এবং অর্থ
পাচার, বিশেষ
করে মিস ইনভয়েসিং ভিত্তিক
অবৈধ অর্থ
পাচার প্রতিরোধ
ও নিয়ন্ত্রণে সম্ভাব্য পদক্ষেপের কোনো
ইঙ্গিত নেই।
দেশে ও দেশের বাইরে
আর্থিক লেনদেনের
তথ্যের স্বয়ংক্রিয় আদান-প্রদানের জন্য
কমন রিপোর্টিং
স্ট্যান্ডার্ড (সিআরএস)
গ্রহণ করা গেলে এসব দুর্নীতি ও অর্থ পাচার
রোধ সম্ভব
হতো। সামষ্টিক
অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় নেয়া আগের
উদ্যোগগুলোর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকার আইএমএফের
সহযোগিতায় বাস্তবায়নের জন্য একটি পরিকল্পনা
সাজিয়েছে, যা ঝুঁকি কমিয়ে
বাংলাদেশের অবস্থান
মজবুত করবে
এবং সামাজিক
ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং জলবায়ু
ঝুঁকি প্রশমনের
কাজ ত্বরান্বিত করে শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি
অর্জনের ক্ষেত্র
প্রস্তুত করবে।
সংস্কারে সর্বাগ্রে
দরকার রাজনৈতিক
সদিচ্ছা। ঋণের
অর্থ দিয়ে
যেসব প্রকল্প
বাংলাদেশ সরকার
হাতে নেবে,
তার উদ্দেশ্য
হতে হবে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা এবং দুর্দশায় পড়া জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা
দিয়ে দৃঢ়, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক
প্রবৃদ্ধি এগিয়ে
নেয়া।
আইএমএফের
আলোচনার অন্যতম
বিষয় ছিল মুদ্রার বিনিময়
হার বাজারমুখী
করা। এটা নতুন কিছু
নয়, দেশের
অর্থনীতিবিদরা অনেক
দিন ধরেই
এসব বলে আসছেন। এসব কিছু শৃঙ্খলার
মধ্যে নিয়ে
আসা জরুরি।
আইএমএফ ভর্তুকি
কমানোর কথা বলেছে। সেটা
একেবারে অপ্রাসঙ্গিক, তা বলা যাবে
না। তবে কোন খাতে
সমন্বয় করা হবে, তা সরকারকে নির্ধারণ
করতে হবে।
খাদ্যনিরাপত্তা যেন হুমকির মুখে
না পড়ে, তা বিবেচনায়
নিয়ে এটি বাস্তবায়ন করতে
হবে। মহামারীর
একটা ধাক্কা
সরকার মোকাবেলা
করেছে। তা শেষ হতে না হতে শুরু হলো রাশিয়া-ইউক্রেন
যুদ্ধ। সেই সঙ্গে যেকোনো
সময় প্রাকৃতিক
দুর্যোগ আসতে
পারে। ফলে সরকার যদি অভ্যন্তরীণভাবে এসব মোকাবেলা করার
মতো সক্ষমতা
অর্জন করতে
পারে, তাহলে
ঝুঁকি কমে।
এটা হলো অর্থনীতির প্রতিরক্ষণ সক্ষমতা। নিজেদের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনুধাবন
করে তা করতে হবে।
সমস্যাগুলো একে অন্যের সঙ্গে
সম্পর্কিত, যে কারণে অর্থনীতির
সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন খাতে আলাদা
করে সিদ্ধান্ত
নিয়ে সমাধান
পাওয়া যাবে
না, বরং হিতে বিপরীতও
হতে পারে।
আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান ঢালাওভাবে
নীতি সংস্কারের
যেসব পরামর্শ
দেয়, সেগুলোও
অনেক ক্ষেত্রে
প্রযোজ্য নাও হতে পারে।
যেমন হঠাৎ
করে এখন ডলারের দাম বাজারের ওপর সম্পূর্ণ ছেড়ে
দিলে তা কোথায় গিয়ে
দাঁড়ায়, তা বলা কঠিন
এবং তার প্রতিক্রিয়ায় দেশের
মূল্যস্ফীতি সহনীয়
পর্যায়ে না থাকতে পারে।
আবার আমদানির
এলসি খোলার
ব্যাপারে কোনো
অগ্রাধিকারের পরিষ্কার
ঘোষিত নীতি
না থাকার
জন্য ব্যাংকগুলোয় ডলার কেনা নিয়ে
ব্যবসায়ীদের যে ধরনের চেষ্টা-তদবির ও কাড়াকাড়ি চলছে,
তা প্রাপ্ত
বৈদেশিক মুদ্রার
সবচেয়ে ভালো
ব্যবহার নিশ্চিত
করছে না। যেসব উৎপাদন
উপকরণ থেকে
সবচেয়ে বেশি
মূল্যসংযোজন হয়, সেগুলোর আমদানিই
বেশি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। সেগুলো
যে শুধু
রফতানিমুখী পোশাক
শিল্পের কাঁচামাল
হতে হবে, এমন কথা নেই। কারণ
দেশের রফতানিবিকল্প পণ্যের উৎপাদন সরাসরি
রফতানির মতোই
বৈদেশিক মুদ্রার
সাশ্রয় করে।
বাংলাদেশ ২০০২ সালে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবে টাকাকে বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্গে অবাধে বিনিময়যোগ্যতার ক্ষেত্রে আইএমএফের সমর্থিত নীতি গ্রহণ করে, যা অর্থনীতির উদারীকরণের একটি যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত ছিল বলা চলে। এ নীতি অনুযায়ী ডলারের বাজারদরে যেকোনো ব্যবসায়ী যত ইচ্ছা আমদানি করতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ডলার ছেড়ে বা তুলে নিয়ে টাকা-ডলারের বিনিময় হার কেবল পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করতে পারে। এ-যাবৎ এভাবেই চলছিল। কিন্তু এখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় বাজারে ডলার বিক্রি করে ডলারের বাজারদর ধরে রাখা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় কিছুটা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং কিছুটা ডলারের দাম সমন্বয়ের একটা মাঝামাঝি পথ হয়তো সাময়িকভাবে নেয়া যেতে পারে, কিন্তু তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজ বিবেচনা অনুযায়ী স্বাধীন ক্ষমতা প্রয়োগ ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজার পরিবীক্ষণের দক্ষতা প্রয়োজন। এছাড়া আইএমএফ এখনই সম্পূর্ণ বাজারভিত্তিক বিনিময় হার প্রস্তাব করবে, তাতে সন্দেহ নেই। তবে মনে রাখা দরকার, ১৯৯৮ সালের পূর্ব এশিয়ার আর্থিক বিপর্যয়ের সময় একমাত্র মালয়েশিয়া আইএমএফের পরামর্শ উপেক্ষা করে বৈদেশিক লেনদেনের ওপর নিয়ন্ত্রণ সাময়িকভাবে পুনঃপ্রবর্তন করেছিল এবং ওই বিপর্যয় থেকে প্রায় অক্ষত অবস্থায় উঠে এসেছিল। অবশ্য সেটা ছিল মূলত বৈদেশিক লেনদেনের মূলধনি হিসাব নিয়ে।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ আগে থেকেই
আইএমএফের ঋণ নেয়ার পরামর্শ
দিচ্ছিল। তাদের
যুক্তি ছিল দুটি। যেমন
অর্থনীতি আইএমএফের
নজরদারিতে থাকলে
বাংলাদেশের প্রতি
বিশ্বের আস্থা
বাড়বে এবং সরকার বাধ্য
হয়ে সংস্কার
করবে। গত দুই দশকে
বাংলাদেশে কার্যত
বড় কোনো
সংস্কার হয়নি।
আইএমএফের শর্ত
মেনে ভ্যাট
আইন করা হলেও তাতে
অনেক গোঁজামিল
দেয়া হয়েছে।
কেননা এটি অনুমোদনের সময় বাংলাদেশ আর আইএমএফের ঋণের
আওতায় ছিল না। একই কারণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রত্যক্ষ কর আইন আলোর
মুখই দেখছে
না। বিনিময়
হারে কোনো
নমনীয়তা ছিল না বলে বাংলাদেশ ব্যাংক
দীর্ঘ সময় ধরে ডলারের
বিপরীতে টাকাকে
শক্তিশালী করে রেখেছিল। ফলে এখন বিপদে
পড়ে অল্প
সময়ে বেশি
হারে অবমূল্যায়ন করতে হয়েছে। বাংলাদেশ
ব্যাংকের দুর্বল
নজরদারির কারণে
বেড়েছে খেলাপি
ঋণ, ঘটেছে
একের পর এক আর্থিক
কেলেঙ্কারি। সব রীতিনীতি ভঙ্গ
করে সুদহার
বেঁধে দিয়েছে
সরকার, যা বর্তমান উচ্চ
মূল্যস্ফীতির সময় সমস্যা হিসেবে
দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ বছরের
পর বছর সংস্কারহীন অবস্থায়
আছে। এখন আইএমএফের শর্ত
মেনে সেসব
সংস্কার করতে
হবে। এর অনেকগুলোই জনপ্রিয়
হবে না। বিশেষ করে ভর্তুকি হ্রাস,
কর মওকুফ
সুবিধা তুলে
নেয়া, জ্বালানির
মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি।
সুতরাং আইএমএফের
ঋণ নিয়ে
সরকার কী কী সংস্কার
পদক্ষেপ নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।










