গ্রাহক সুরক্ষা বাড়াতে জাতীয় বীমা নীতি-২০১৪-তে ‘ইলেকট্রনিক ডাটা ও তথ্যের বিনিময় চালুকরণ’-এর প্রেক্ষাপটে যাত্রা করে ইউনিফায়েড মেসেজিং প্লাটফর্ম (ইউএমপি)। ডিজিটাল প্লাটফর্মটি তৈরির উদ্দেশ্য ছিল সব বীমাকারীর পলিসি-সংক্রান্ত নির্ভুল তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা। প্লাটফর্মটি বর্তমানে বীমা খাতের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে এবং এর সুফল সর্বস্তরে প্রতিফলিত হচ্ছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। বীমা খাত অটোমেশনে এ পদক্ষেপ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা যায়। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে ইউএমপির সঠিক ব্যবহারের ওপর। বর্তমানে ইউএমপির মাধ্যমে গুটিকতক কাজ করা হচ্ছে। একে আরো সম্প্রসারণ করে নতুন বিষয় যুক্ত করার মাধ্যমে গ্রাহকের আস্থা বাড়ানো যেতে পারে। বীমা খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির কার্যক্রম এখানেই থামিয়ে রাখলে চলবে না। এ খাতকে আরো গ্রাহকবান্ধব করতে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রত্যাশা থাকবে ইউএমপি বীমা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রত্যেক বীমা কোম্পানি যেন এ প্লাটফর্ম ব্যবহার করে তা নিশ্চিত করতে তদারকিও জোরদার করতে হবে। শুধু ইউএমপি চালু করলেই হবে না, সেখানে রক্ষিত গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষার জন্য যথাযথ পদক্ষেপও নিতে হবে। পাশাপাশি বীমা খাতের অটোমেশন প্রক্রিয়াকেও এগিয়ে নিতে হবে।
দেশের বীমা শিল্পের এমন রুগ্ণ ও অবিকশিত থাকার কথা নয়। একটি শিশু জন্মের পর থেকেই আসতে পারে বীমার আওতায়। বাংলাদেশেও তা সম্ভব। তবে বিবিধ বীমা পণ্য ও সেবা বিক্রিতে দেশ এখনো মান্ধাতা আমলেই পড়ে আছে। আর এখানেই নিহিত রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বীমা খাতে অটোমেশন তথা ডিজিটালাইজড করার বিষয়টি। করপোরেট সুশাসনের অভাব, অদক্ষ ও অপর্যাপ্ত মানবসম্পদ, বীমা পণ্য প্রণয়ন ও বিপণন, সম্পদ ও দায়ের ব্যবস্থাপনায় যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে। সেসব কাটিয়ে উঠতে হবে পর্যায়ক্রমে। এক্ষেত্রে প্রযুক্তি রাখতে পারে বড় ভূমিকা। সার্বিক আর্থিক খাতে পরিষেবা বাড়াতে হবে। দূর করতে হবে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা, কর ও ভ্যাট ফাঁকি, সর্বোপরি গ্রাহকদের পাওনা দিতে হবে যথাসময়ে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএকে শক্তিশালী করতে হবে। বীমা খাতের মূল চ্যালেঞ্জগুলো হচ্ছে আস্থার সংকট, সুশাসনের অভাব, দক্ষ জনবলের সংকট, প্রযুক্তিহীনতা ও যোগ্য নেতৃত্ব। আস্থার সংকট দূর করার জন্য বীমা খাতকে শৃঙ্খলায় আনতে হবে। এজন্য প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একুশ শতকে মিলেনিয়ালস প্রজন্মের গ্রাহক পেতে যাচ্ছে বীমা খাত। যারা মিলেনিয়ালস প্রজন্ম তারা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর; তারা ঘরে বসেই সব সেবা পেতে চায়; তারা রিভিউ দেখে যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। মিলেনিয়ালস প্রজন্মকে টার্গেট করে বীমা শিল্পকে আরো তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর করা উচিত। যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করার জন্য মেধাবী কর্মীদের প্রেষণা ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বীমা শিল্পের উন্নয়নে প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার জন্য কোম্পানির নিজস্ব প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট তৈরি করতে পারলে এটা আরো কার্যকর হবে। পুরো বীমা খাতকে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনতে হবে।
পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোয় জিডিপিতে বীমার অবদান উল্লেখযোগ্য। যুক্তরাজ্যে এ অবদান ১১ দশমিক ৮ শতাংশ, ইউএসএ ৮ দশমিক ১ শতাংশ, জাপান ৮ দশমিক ১ শতাংশ, হংকং ১১ দশমিক ৪ শতাংশ, সিঙ্গাপুর ৭ শতাংশ, ভারত ৪ দশমিক ১ শতাংশ, ব্রাজিল ৩ দশমিক ২ শতাংশ ও চীন ৩ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশের জিডিপিতে বীমার অবদান দশমিক ৫ শতাংশ। ওইসব দেশে বীমার ঘনত্ব (প্রিমিয়াম পার ক্যাপিটা মার্কিন ডলারে) ইউকে ৪৫৩৫, ইউএসএ ৩৮৪৬, জাপান ৫১৬৯, হংকং ৩৯০৪, ব্রাজিল ৩৯৮, চীন ১৬৩, ভারত ৫৯ ডলার। আশার কথা, ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বীমা শিল্পের উন্নয়ন এবং এ শিল্পে গতিশীলতা আনার লক্ষ্যে বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ নেয়। এ বছর ১ মার্চ প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক জাতীয়ভাবে বীমা দিবস পালনের ঘোষণা বীমা শিল্পে অর্থবহ পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বীমা খাতকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হলে প্রযুুক্তির মাধ্যমে এ খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, অনেক উন্নত দেশেই যেখানে শতভাগ নাগরিক বীমা পলিসির আওতায়, সেখানে বাংলাদেশের চিত্রটি শুধুই হতাশার। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আইএলওর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ওডব্লিউআইডি কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১১ সালে কানাডা, জাপান, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ইত্যাদি ওইসিডি বা অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশে ১০০ শতাংশ নাগরিক ইন্স্যুরেন্স সেবার আওতাভুক্ত ছিল। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮৪ শতাংশ মানুষ বীমা সেবা পেত। তবে এশিয়ার অনেক দেশ এমনকি বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী ভারতেও এ হার তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। ওই সময়ে পাকিস্তানে প্রায় ২৭ শতাংশ মানুষ ইন্স্যুরেন্স সেবা পেলেও ভারতে তা ছিল প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশে প্রায় ৩ শতাংশ। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যতিক্রম ছিল শ্রীলংকা, যাদের ইন্স্যুরেন্স সেবার আওতাধীন জনসংখ্যা প্রায় শতভাগ। ওই দেশগুলোয় বীমা খাতের সম্প্রসারণে প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রেখেছে। শুধু তাই নয়, কোম্পানিগুলোকে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়েছে। বাংলাদেশ দেরিতে হলেও এ পথে যাত্রা করেছে। এখন প্রয়োজন পরিকল্পনাগুলো দ্রুত এগিয়ে নেয়া।
বীমাকারী ও বীমা গ্রাহকদের আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা প্রদান, বীমাকারী কর্তৃক বীমা গ্রাহকদের প্রিমিয়াম রশিদ প্রেরণ (প্রিমিয়াম রশিদ লেখা বা প্রিন্টের জন্য শ্রমঘণ্টা, ডাক, কুরিয়ার ইত্যাদি) বাবদ খরচ সাশ্রয়, এ-সংক্রান্ত প্রিমিয়াম রশিদ ছাপানো ও হিসাব রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য জটিলতা নিরসন, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি রোধ, বীমা পলিসি গ্রাহকদের টাকা আত্মসাৎ বন্ধ, গ্রাহক হয়রানি রোধ, বীমা গ্রাহকের আস্থা বৃদ্ধি, সরকারের রূপকল্প ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার অংশ হিসেবে সামগ্রিকভাবে বীমা খাতকে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনয়নপূর্বক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে ইউএমপি বড় ভূমিকা রাখছে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রযুক্তিগত ব্যবহারের ফলে আগের চেয়ে কার্যকর, সঠিক ও সহজভাবে বীমা দাবি নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে। যেহেতু বীমা দাবি নিষ্পত্তি করা বীমাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেয়, তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বীমা দাবি নিষ্পত্তির জন্য কোম্পানিগুলো চলমান অগ্রগতির মাধ্যমে উদ্ভাবনী পদ্ধতি খুঁজতে থাকে। মোবাইল প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী বীমার বিস্তার ঘটানো সম্ভব। গ্রাহকরা বর্তমানে অনলাইনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কাস্টমাইজড বীমা সেবা গ্রহণ করতে পারেন। গ্রাহকরা তাদের ইচ্ছানুযায়ী পলিসি ক্রয় ও বীমা সেবা গ্রহণ করতে পারেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে বীমাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বীমা কার্যক্রমের বিভিন্ন ধাপ, যেমন ঝুঁকি নির্ণয়, প্রতারণা শনাক্তকরণ এবং অবলিখনের কাজগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে পারছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে কোম্পানিগুলো দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করে স্বল্প সময়ের মধ্যে সঠিকভাবে রিপোর্টিং করতে পারে।
বীমা খাত ডিজিটালাইজেশনের একটি ধাপ ইউএমপি চালু। পুরো খাত অটোমেশন করতে এখনো বহু পথ পাড়ি দিতে হবে। সেখানে গ্রাহকের তথ্য যাচাইয়ের মধ্যে প্রযুক্তির ব্যবহার সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। গ্রাহকের লেনদেন থেকে শুরু করে আর্থিক বিষয়গুলোরও পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব রাখতে হবে। গ্রাহক কবে অর্থ জমা দিচ্ছেন, কবে বীমা পরিপক্ব হচ্ছে বা ভাঙানো হচ্ছে, কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা, কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করছে কোথায়, অর্থাৎ ব্যাংকের মতো বীমা খাতকেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনে পরিচালিত করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশে বীমা খাতে গ্রাহকের অর্থ কীভাবে সুরক্ষা দেয়া হচ্ছে তা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। ইউএমপির কাজের আওতা আরো সম্প্রসারণ ও সফটওয়্যারের আপগ্রেডেশন একটি চলমান প্রক্রিয়া। এক্ষেত্রে সফটওয়্যার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নতি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স যুক্ত ও নিয়মিত চাহিদা নিরূপণ, বিজনেস ইন্টেলিজেন্স যুক্ত, কিউআর কোড এমবেডেড ব্যবস্থা চালু, প্রয়োজনীয় মডিউল তৈরি ও নিয়মিত আপডেট থাকতে হবে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা এক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা রাখবে এবং বীমা খাতের অটোমেশন প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিতে তারা আরো সক্রিয় হবে বলে প্রত্যাশা।










