সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সার্কেলের মোটরযান পরিদর্শক নূর মোহাম্মদ তোয়াহাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তিনি পরিদর্শন না করেই একটি ট্রাকের ফিটনেস সনদ ইস্যু করেন। ট্রাকটি এগারো দিন আগে ময়মনসিংহের ত্রিশালে দুর্ঘটনায় পড়ে। এতে এক শিশুসহ তিনজন মারা যান। পুলিশের হেফাজতে থাকাবস্থায়ই এ মোটরযানের ফিটনেস সনদ দেয়ার নজিরবিহীন ঘটনার মধ্য দিয়ে বিআরটিএর অনিয়ম আবারো সামনে এসেছে। বাণিজ্যিক গাড়ি প্রতি বছর সংস্থাটির যেকোনো সার্কেলে নিয়ে ফিটনেস হালনাগাদ করার নিয়ম। আইন অনুযায়ী, গাড়ি না দেখে ফিটনেস সনদ দেয়া নিষিদ্ধ। অথচ এক্ষেত্রে অব্যাহতভাবে আইনের ব্যত্যয় ঘটছে। বরখাস্ত হওয়া পরিদর্শকের মতো অনেকেই কোনো রকম পরীক্ষা ছাড়াই অর্থের বিনিময়ে গাড়ির ফিটনেস সনদ দিচ্ছে বলে অভিযোগ মিলছে। সনদ পেয়ে বাস্তবে আনফিট মোটরযানগুলো উঠছে সড়ক-মহাসড়কে। প্রতিনিয়ত ঝুঁকিতে ফেলছে সড়ক নিরাপত্তা। কাজেই এ ধরনের অনিয়ম রোধে দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা জরুরি।
সময়ের ব্যবধানে দেশের পরিবহন খাতের উল্লেখযোগ্য প্রসারণ ঘটেছে। নতুন অনেক মোটরযান সংযোজনের পাশাপাশি সড়ক অবকাঠামোয় হয়েছে লক্ষণীয় উন্নতি। কিন্তু সড়কে মৃত্যু থামছে না। প্রতিদিন দুর্ঘটনায় দেশের কোথাও না কোথাও ঝরছে তাজা প্রাণ। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে এটা আরো বেড়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, এবারের ঈদযাত্রায় গত সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সড়ক-মহাসড়কে ৩১৯টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৯৮ ও আহত হয়েছেন ৭৭৪ জন। সড়কে উচ্চহারে দুর্ঘটনার পেছনে অদক্ষ চালক, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জনগণের অসচেতনতা, অনিয়ন্ত্রিত গতি, সড়ক নির্মাণে ত্রুটিসহ অনেক কারণ দায়ী। এর মধ্যে একটা বড় কারণ ফিটনেসবিহীন গাড়ি। বিআরটিএর তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জুন নাগাদ দেশে নিবন্ধিত মোটরযানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৩ লাখ ৫ হাজার ৯৩৬। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মোটরযান হলো—বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, লরি প্রভৃতি। বাণিজ্যিক এসব যানবাহনের দেড় বছর পরপর ফিটনেস নেয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও সীমাবদ্ধতায় ফিটনেস যাচাইয়ের কাজটি যথাযথ হয় না। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই দায়সারাভাবে ফিটনেস সনদ প্রদান করা হয়, যা সড়ক নিরাপত্তা বিধানে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
যানবাহনের ফিটনেস সনদ নিশ্চিত করাটা একটা বৈশ্বিক চর্চা। পৃথিবীর কোথাও ফিটনেসবিহীন কোনো মোটরযান সড়কে চলাচলের সুযোগ নেই। সময় যত যাচ্ছে যানবাহনের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এটা মাথায় রেখে আবেদন করা থেকে শুরু হয়ে যাচাই প্রক্রিয়া সবই স্বয়ংক্রিয় করেছে অনেক দেশ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স এমনকি চীন গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন জায়গায় অটোমেটেড টেস্টিং স্টেশন (এটিএস) তৈরি করেছে। সেখানে বিভিন্ন যান্ত্রিক সরঞ্জাম দিয়ে গাড়ির কারিগরি দিক যাচাই এবং তার ভিত্তিতে ফিটনেস সনদ দেয়া হয়। ভারতও এখন এদিকে মনোযোগ দিয়েছে। আধুনিক সরঞ্জামে সজ্জিত অনেক এটিএস তারা গড়ে তুলছে। এরই মধ্যে নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে, আগামী বছরের এপ্রিল থেকে সব বাণিজ্যিক যানবাহনের ফিটনেস যাচাই ধাপে ধাপে এটিএসের মাধ্যমে করাটা বাধ্যতামূলক হতে যাচ্ছে। প্রক্রিয়াগত আধুনিকায়নের কারণে এতে সময়ের যেমন সাশ্রয় হচ্ছে, তেমনি অনিয়ম-দুর্নীতিও অনেকাংশে কমে আসবে। আমাদের জন্যও এ ধরনের উদ্যোগ অনুসরণ এখন সময়ের দাবি।
দেশে ফিটনেস পরীক্ষার সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান আছে। বিধিবিধান অনুসারে যানবাহনের মালিক প্রথমে আবেদন করেন। আবেদনপত্র গ্রহণের পর তা যাচাই-বাছাই করা হয়। এরপর আবেদন করা যানবাহনটি পরিদর্শন করা হয়। পরিদর্শনের কাজ শেষ হলে যাচাই করা হয় যানবাহনের উপযুক্ততা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রে এ গাইডলাইনের লঙ্ঘন ঘটছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফিটনেস সনদ দিতে হলে সংশ্লিষ্ট যানবাহন কারিগরি ত্রুটিমুক্ত হতে হবে। কারিগরি ও বাহ্যিক অন্তত ৬০টি বিষয় বিবেচনায় আনার কথা বলা হয়েছে আইনে। ফলে একটি যানের সনদ দিতে আধা ঘণ্টা থেকে ১ ঘণ্টা লেগে যাওয়া স্বাভাবিক। অথচ ৩-৪ মিনিট যাচাই করেই সনদ দেয়া হচ্ছে। এর পেছনে বিআরটিএ লোকবল সংকটকে দায়ী করছেন। তারা বলছেন, সারা দেশে মোটরযান পরিদর্শক ও সহকারী পরিদর্শক পদ রয়েছে ৪০০। মোটরসাইকেল বাদে তাদের দিয়ে ১৫ লাখ ৫২ হাজার ৭৯৮ গাড়ির ফিটনেস দিতে হয়। এজন্যই নাকি অনেক সময় পরিদর্শন না করেই মোটরযানের ফিটনেস সনদ প্রদানের ঘটনা ঘটে। তাদের বক্তব্য কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
অবশ্য পরিবহন মালিকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের ভাষ্যমতে, ঘুস না দিলে গাড়ি ঠিক না থাকলেও সনদ মেলে না। আবার অর্থ দিলে গাড়িও নিতে হয় না। বছরের পর বছর পাওয়া যায় সনদ। বলা হচ্ছে, অর্থের বিনিময়ে যে ফিটনেস সনদ দেয়া হয়, তার ভাগ শুধু মোটরযান পরিদর্শক নন, বিআরটিএর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও পান। জনবলের ঘাটতি যে আছে, তা অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু সব সীমাবদ্ধতা ছাপিয়ে সুশাসন ঘাটতিই এখন সংস্থাটির বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা বন্ধ করতে হবে। এজন্য অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতায় ফিটনেস যাচাই প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে স্বয়ংক্রিয় করতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুসারে লোকবলও বাড়াতে হবে। সর্বোপরি বিআরটিএর কর্মীবাহিনীকে নৈতিকবলে বলীয়ান করতে হবে।
শুধু ফিটনেস সনদে কড়াকড়ি নয়, রাস্তায়ও ফিটনেসবিহীন গাড়ির দৌরাত্ম্য কমাতে হবে। ১৯৯৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে অনুপযুক্ত ও পুরনো গাড়ি উচ্ছেদের অনেক সিদ্ধান্ত হয়েছে। এমনকি ২০১৭ সালে গণপরিবহনে সুষ্ঠু যাত্রীসেবা নিশ্চিতে যে ২৬ দফা সুপারিশ তৈরি করা হয়, তার অন্যতম ছিল ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ করা। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়েছে তার সামান্যই। ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলাচল বন্ধ করা ও নতুন সড়ক আইন বাস্তবায়নে প্রতি জেলায় টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল মহামান্য উচ্চ আদালত। এ নির্দেশের কার্যকর রূপায়ণ জরুরি।
পরিদর্শন ছাড়া ফিটনেস সনদ প্রদানের সাম্প্রতিক ঘটনায় বিআরটি কর্তৃপক্ষের টনক নড়েছে। দায়ী পরিদর্শককে এরই মধ্যে বরখাস্ত করা হয়েছে। কোনো সার্কেলে অনিয়ম হলে সংশ্লিষ্ট পরিচালককে জবাব দিতে হবে বলে চিঠি দেয়া হয়েছে। গাড়ির উপস্থিতি নিশ্চিতে ফিটনেস ইস্যুর সময়ে পরিদর্শনের ছবি তুলে রেজিস্ট্রি খাতায় সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়ারও খবর মিলছে। এগুলোর যথাযথ পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি যাচাই করা ছাড়া কিংবা ভুয়া ফিটনেস সনদ প্রদানে আরো কারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করতে হবে। কোথায় কোথায় অনিয়ম হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে হবে। নিতে হবে কঠোর ব্যবস্থা। কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপে সংস্থাটিতে সার্বিকভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে—এটিই প্রত্যাশা।










