বাংলাদেশে প্রায় চার হাজার বছর ধরে আম চাষ হয় এবং আম এ দেশে ফলের রাজা হিসেবে সমাদৃত। এ দেশের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুর জেলায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আম উৎপাদন করা হয় এবং অন্যান্য জেলায় এ ফল চাষের ব্যাপ্তি ঘটছে। কৃষি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৭-০৮ অর্থবছর দেশে ৩১ হাজার ৬৪৫ হেক্টর জমি থেকে মোট ৮ লাখ ৩ হাজার টন আম উৎপাদন হয়। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার বিচক্ষণ দিকনির্দেশনায় জনগণের পুষ্টি চাহিদা নিশ্চিতে ফল ও সবজি উৎপাদনে অধিকতর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে এ দেশের বিদ্যমান উষ্ণ ও অবউষ্ণ আবহাওয়ায় সহজে ফলনযোগ্য এ সুমিষ্ট ফল আম উৎপাদন উৎসাহিত করা হয়। ফলে আম চাষের অধীন জমির পরিমাণ ও উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৯৫ হাজার ২৪৪ হেক্টর ও ১২ লাখ ২২ হাজার টনে। মোট আম উৎপাদনের দিক থেকে আমরা বিশ্বে সপ্তম স্থানের অধিকারী এবং বাংলাদেশের আম আজ বিশ্ববাজারে জায়গা দখল করতে চলেছে।
বাংলাদেশে প্রতি হেক্টর জমিতে বার্ষিক ১২ দশমিক ৮ টন আমের ফলন হয়, যা ভারত, চীন, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, ব্রাজিল, মেক্সিকো প্রভৃতি প্রধান আম উৎপাদনকারী দেশের তুলনায় কম। প্রধানত বাগানের যথাযথ পরিচর্যার অভাব এবং রোগ ও পোকামাকড় দমনে প্রতিবেশবান্ধব সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণে অনীহা বা বিলম্বিত পদক্ষেপের কারণে ফলন কম হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবেশের উপাদানগুলোকে অবজ্ঞা করে রোগ ও পোকামাকড় দমনের জন্য নির্বিচারে বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়। বালাইনাশকের বাছবিচারবিহীন এবং অবিবেচক প্রয়োগ আমের মুকুলের পরাগী পতঙ্গ ও বাগানে বিচরণকারী পরভোজী এবং পরজীবী পোকার স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত করে এবং তাদের মৃত্যু ঘটায়। বালাই দমনে প্রতিবেশবান্ধব সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণে কার্যকরী পদক্ষেপের মাধ্যমে পরাগী, পরভোজী ও পরজীবী পতঙ্গ সুরক্ষা করলে আম উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। সেই সঙ্গে মানসম্পন্ন আম সরবরাহের মাধ্যমে দেশে নিরাপদ পুষ্টি চাহিদা পূরণে ইতিবাচক ফল পরিলক্ষিত হবে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আম্রকাননে বিচিত্র রকমের পতঙ্গ বিচরণ করে এবং তাদের কতিপয় প্রজাতির সংক্রমণে ফলন ও গুণগত মান ব্যাহত হলেও অধিকাংশ প্রজাতির পতঙ্গ পরাগায়ণ ও আপদ দমনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। গবেষণা উপাত্ত থেকে জানা যায়, এ দেশে প্রায় ২১ প্রজাতির পোকা আম বাগানে সংক্রমণ করে। তার মধ্যে শোষক পোকা, ফলের মাছি, ভোমরা পোকা, ছাতরা পোকা এবং কাণ্ডের মাজরা পোকা নিয়মিত মুখ্য এবং বিছা পোকা অনিয়মিত মুখ্য আপদ হিসেবে পরিগণিত। অন্যান্য পোকার সংক্রমণ হলেও তা অর্থনৈতিক ক্ষতির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে না।
গবেষণা প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায়, বাংলাদেশের আম বাগানে সচরাচর আট প্রজাতির পরাগী, ১৩ প্রজাতির পরভোজী এবং দুুই প্রজাতির পরজীবী পোকা বিচরণ করে। পরভোজী ও পরজীবী পতঙ্গগুলো সমন্বিত বালাই ব্যবস্থায় জৈবিক উপাদান বলে স্বীকৃত। এরা প্রাকৃতিকভাবে আপদ দমনে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। আমের ফুলে স্ব ও পরপরাগায়ণ পরিলক্ষিত হয় এবং ফুলের পরাগায়ণে বাতাসের সঙ্গে পতঙ্গের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমের পরাগী পতঙ্গগুলো লেপিডপ্টেরা, ডিপ্টেরা ও হাইমেনপ্টেরা বর্গের অন্তর্ভুক্ত। প্রধানত পাণ্ডুর প্রজাপতি, ঘরের মাছি, ভনভন মাছি, ঘোড়া মাছি, মকরন্দ মাছি, ছুতোর ভোমরা, আঁচলা বোলতা এবং পিঁপড়ার প্রজাতিগুলো পরাগায়ণে সক্রিয় থাকে।
পাণ্ডুর প্রজাপতি লেপিডপ্টেরা বর্গের পাইরিড়ি পরিবারভুক্ত। এ পোকা পূর্ণাঙ্গ দশায় ফুলের সুধা পান করে দুই থেকে তিনদিন বা কখনো কখনো দুই সপ্তাহ পর্যন্ত বেঁচে থাকে এবং এ সময় আম এবং অন্যান্য ফুলের পরাগায়ণ ঘটায়। ঘরের মাছির পূর্ণাঙ্গ পোকা সচরাচর ১৫ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত বাঁচে, তবে দুই মাস পর্যন্তও বেঁচে থাকতে পারে। পূর্ণাঙ্গ মাছিগুলো সুবাসিত আমের মুকুলের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং একটি মাছি প্রতি মিনিটে পাঁচ থেকে সাতটি ফুলে পরিভ্রমণ করে। মাছিগুলো ফুল থেকে সুধা পান করে এবং পরাগায়ণে সহায়তা করে। বিচরণকৃত ফুলে এদের পরাগায়ণ সফলতা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। ঘরের মাছির পরাগায়ণে প্রতি গাছে আমের সংখ্যা ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। এ মাছি আম ছাড়াও যেসব গাছের ফুল গলিত দ্রব্যাদির ন্যায় ঘ্রাণ ছড়ায় (যেমন গাজর, বাঁধাকপি), সেগুলোর পরাগায়ণে জড়িত থাকে।
ভনভন মাছি ডিপ্টেরা বর্গের ক্যালিফোরিড়ি পরিবারের সদস্য। এরা পূর্ণাঙ্গ পতঙ্গরূপে আবির্ভূত হয়ে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত বেঁচে থাকে। এ মাছির দীর্ঘ ও নলাকার মুখোপাঙ্গ ফুলের পরাগায়ণের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। একটি মাছি প্রতি মিনিটে আট থেকে ৬০টি ফুলে পরিভ্রমণ করে এবং বিচরণকৃত ফুলে এদের পরাগায়ণ সফলতা ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ। ভনভন মাছির পরাগায়ণে প্রতিটি বৌলে আমের গুটি ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ এবং প্রতিটি গাছে ৭০ শতাংশ বেশি হয়। সেই সঙ্গে আমের আকার, আয়তন ও ওজন যথাক্রমে ২৫, ১৫ ও ২৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি ঘটে। ডিপ্টেরা বর্গের সিরফিড়ি পরিবারের অন্যতম সদস্য মকরন্দ মাছির পূর্ণাঙ্গ পোকা গাছে বাসা বাঁধে এবং এক মাস পর্যন্ত বেঁচে থাকে। এ মাছি বছরে তিন থেকে সাতটি বংশধর তৈরি করতে পারে। একটি মকরন্দ মাছি প্রতি মিনিটে তিন থেকে সাতটি আমের মুকুলে পরিভ্রমণ করে এবং বিচরণকৃত ফুলে এদের পরাগায়ণ সফলতা ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ।
বিচিত্র প্রজাতির গাছপালার ফুলের কার্যকর পরাগায়ণে মৌমাছির গুরুত্ব অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। আফ্রিকা বা এশিয়ায় এ পোকার উত্পত্তি এবং বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পরাগী পতঙ্গগুলোর মধ্যে মৌমাছির প্রাচুর্য সর্বাধিক।
বর্তমান বিশ্বের যুক্তরাষ্ট্র, কানাড়া, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে মৌমাছির খামার গড়ে উঠেছে এবং এসব খামারে ব্যাপকভিত্তিক মৌ কলোনি থেকে মধু উৎপাদন করা হয়। তাছাড়া আমসহ বিভিন্ন ফল ও সবজির পরাগায়ণের জন্য বাগান বা মাঠে মৌ কলোনির ব্যবহার অত্যন্ত লক্ষণীয়। মৌমাছির সব প্রজাতিই কলোনি স্থাপন করে বসবাস করে এবং এরা সামাজিক পোকা নামে অভিহিত। একটি কলোনিতে যৌন মিলন সক্ষম স্ত্রী মাছি, যৌন মিলনে অক্ষম স্ত্রী মাছি এবং যৌন মিলন সক্ষম পুরুষ মাছি থাকে। যৌন মিলনে অক্ষম স্ত্রী মাছি কর্মী মাছি হিসেবে স্বীকৃত এবং শুধু কর্মী মাছি ফুলের পরাগায়ণে ভূমিকা রাখে। একটি কর্মী মৌমাছি প্রতি মিনিটে পাঁচ থেকে ১৫টি আমের ফুলে পরিভ্রমণ করে এবং বিচরণকৃত ফুলে এদের পরাগায়ণ সফলতা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ। মৌমাছির পরাগায়ণে প্রতিটি বৌলে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ আমের গুটি বেশি হয়। তাদের পরাগায়িত আমের আকার ও আয়তন যথাক্রমে ১২ ও ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি ঘটে।
হাইমেনপ্টেরা বর্গের এপিড়ি পরিবারের পতঙ্গ ছুতোর ভোমরার পূর্ণাঙ্গ পুরুষ ও স্ত্রী পোকা ফুলে ফুলে পরিভ্রমণ করে পরাগরেণু ভোজন ও সুধা পান করে এবং পরাগায়ণ ঘটায়। তারা ফুলের ওপর বসে তার বক্ষদেশীয় পেশি দ্বারা শব্দতরঙ্গ সৃষ্টি করে। ফলে পরাগরেণু আলগা হয়ে যায় এবং ছুতোর ভোমরা তা বহন করতে সক্ষম হয়। ছুতোর ভোমরার এ কৌশল গুঞ্জন পরাগায়ণ নামে অভিহিত।
পিঁপড়া কলোনি স্থাপন করে বসবাস করে বিধায় সামাজিক পোকার দলভুক্ত। এদের কলোনিতে যৌন প্রজননক্ষম স্ত্রী, যৌন প্রজনন অক্ষম স্ত্রী এবং যৌন মিলন সক্ষম পুরুষ থাকে। যৌন প্রজনন অক্ষম স্ত্রীগুলো কর্মী এবং সৈনিক এ দুই ভাগে বিভক্ত। কর্মী পিঁপড়া এক থেকে তিন বছর বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে এবং তারা আমের মুকুলে উরোগামী হিসেবে চলাচল করে। এদের পরাগায়ণ সক্ষমতা উড়ে বিচরণকারী পতঙ্গের চেয়ে অনেক বেশি। একটি পিঁপড়া প্রতি মিনিটে চার থেকে সাতটি ফুলে ভ্রমণে সক্ষম এবং তার দেহে ৫৫০ থেকে ৬৫০টি পরাগরেণু বহন করতে পারে। ডিপ্টেরা বর্গের টেবানিড়ি পরিবারভুক্ত ঘোড়া মাছি ও হাইমেনপ্টেরা বর্গের ভেসপিড়ি পরিবারের সদস্য আঁচলা বোলতা আমের পরাগায়ণে সক্রিয় থাকলেও এদের স্বল্প আধিক্যের কারণে গুরুত্ব কম।
আমের মুকুলের পরাগায়ণে পতঙ্গের গুরুত্ব বিশ্বের আম উৎপাদনকারী সব দেশে স্বীকৃত। তাইওয়ান ও ভারতে গুণগত মানের ফলন পাওয়ার জন্য আম বাগানে পরাগায়ণের জন্য মৌমাছি ও ঘরের মাছি সরবরাহ করা হয়। বাগানে মাছির আধিক্য বৃদ্ধির জন্য গাছের নিম্নভাগের ডালের সঙ্গে মাছ বা মাংসপিণ্ড জালের থলেতে বুলিয়ে দেয়া হয়। থাইল্যান্ডে আম বাগানে মৌমাছি পালন করে পরাগায়ণ নিশ্চিতে ও মধু উৎপাদন করা হচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশেও মৌ খামারিরা তাদের মৌ কলোনির পুষ্টি চাহিদা মেটাতে প্রস্ফুটিত আম বাগানে কলোনি স্থানান্তর করেন।
বাংলাদেশে বৃদ্ধিমান আমের ফলন অব্যাহত রাখতে এবং আমের গুণগত মান বৃদ্ধির অনুষঙ্গ হিসেবে পরাগী পতঙ্গ সুরক্ষা আবশ্যক। এজন্য আপদ দমনে যুক্তি এবং ন্যায়সংগতভাবে বালাইনাশক ব্যবহার ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহার উৎসাহিত করা প্রয়োজন। বাগানের আশপাশের পতিত জমিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছপালা, যেগুলো পরাগী পতঙ্গের সহজাত বাসস্থান, সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করা সমীচীন। বাগানে আম গাছের ফাঁকা স্থানে গুল্মজাতীয় অন্যান্য ফল বা সবজি চাষ করে সারা বছর পরাগী পতঙ্গের আবাসস্থল নিশ্চিত করে তাদের সংরক্ষণ ও বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে প্রত্যাশিত পরাগায়ণ সম্ভব। আমের যথার্থ ফলন প্রাপ্তি, জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও প্রতিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য এর অন্যতম উপাদান পরাগী পতঙ্গ সংরক্ষণ অপরিহার্য। কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীদের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনবে।
ড. মো. রুহুল আমীন: অধ্যাপক, কীটতত্ত্ব বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর










