সাত মার্চের ভাষণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তির কথা আগে বলেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি মুক্তি বলতে শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক মুক্তির কথাই বোঝাতে চেয়েছেন। ঢাকায় বসবাসকারীদের মধ্যে অনেকেরই অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আছে। গাড়ি-বাড়ি আছে। কিন্তু স্বস্তি নেই। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে প্রচুর সময় লাগছে। আমাদের সবারই মানসিকভাবে অস্থিরতা হচ্ছে, দ্রুত যদি পৌঁছতে পারতাম। কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছতে পারলে মানসিক পরিতৃপ্তি থাকত। সেটা ঢাকা শহর আমাদের দিচ্ছে না। অনেক পরিমাপক বিবেচনায় নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঢাকা এবং বড় বড় শহরের বাইরে সব শিল্পপ্রতিষ্ঠান একটি ছাতার নিচে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা করলেন। যেটাকে কম্প্রিহেনসিভ কম্পোজিট উদ্যোগ বলে। অর্থাৎ বলতে চাই শিল্পের বিকাশ হবে জনগণের দোরগোড়ায়। এ ধারণা থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘরে ফেরার কর্মসূচি ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ কিংবা ‘একটি বাড়ি, একটি খামার’ প্রভৃতি কর্মসূচির চিন্তা করেছেন। আসলেই এ সবগুলোর মধ্যে একটির সঙ্গে আরেকটির সমন্বয় আছে।

বঙ্গবন্ধু সমতা ও এলাকাভিত্তিক সামগ্রিক উন্নয়নের কথা বলতেন, যেন কোথাও কোনো বৈষম্য না থাকে। ঢাকায় যা উন্নয়ন হয় তা যেন কুড়িগ্রামেও হয়। আমরা বঙ্গবন্ধুর উন্নয়নের ধ্যান-ধারণার সঙ্গে অর্থনৈতিক অঞ্চলের ধারণা যদি নিয়ে আসি, তাহলে পুরো চিত্রই বদলে যাবে। প্রায় চার কোটি লোক উত্তরবঙ্গে থাকে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলায়ও ব্যাপক উন্নয়ন হবে। যমুনা সেতু হওয়ার আগে উত্তরবঙ্গে যেতে ১০-১২ ঘণ্টা লাগত। আর এখন পৌনে দুই ঘণ্টায় সিরাজগঞ্জে যাই, অফিস করে রাতে চলে আসি। সুপরিকল্পিত উন্নয়ন হলে প্রতিটি জায়গায় এর ছোঁয়া লাগে, এটাই স্বাভাবিক, অর্থনৈতিক মুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে। বাসস্থানের নিশ্চয়তা, চিকিৎসার সুব্যবস্থা, সন্তানের লেখাপড়ার সুযোগ—সব মিলিয়ে আর্থিক সামর্থ্যের সঙ্গে মানসিক স্বস্তিও আসতে হবে।

একটি বিষয় কল্পনা করুন। উন্নয়ন ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় রাষ্ট্র, অর্থনৈতিক অঞ্চলের ডেভেলপার, ইউনিট ইনভেস্টর, তার সঙ্গে শ্রমিক কর্মচারী—উৎপাদনে চারটি অনুঘটকই উইন উইন সিচুয়েশনে থাকবে। সব পক্ষই যদি মনে করে আমরা জয়ী হয়েছি তখন কার্যটি সম্পাদন হয়। এখানে চারজনের যদি সমন্বয় হয়, চারজনই যদি মনে করে আমরা উইন করছি, তখনই সঠিক কাজটি হবে।

আমাদের যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল আছে, তার মধ্যে ২৫টির বেশি প্রাইভেট ইকোনমিক জোন আছে। প্রাইভেট ইকোনমিক জোনের ডেভেলপারকে স্বস্তি দিতে চাইলে উইন উইন সিচুয়েশন থাকতে হবে। এখানে রাষ্ট্রের একটা বিরাট ভূমিকা থাকতে হবে। এখানে উৎপাদিত পণ্যের বাজার ব্যবস্থা, আমদানি-রফতানি সহজীকরণ, সর্বোপরি লোকাল পলিটিক্যাল এলিট পারসন আর স্থানীয় জনসাধারণের সম্মিলিত মনোভাব ওই ইকোনমিক জোনের স্বার্থের পক্ষে থাকতে হবে।

অর্থনৈতিক জোনকে কেন্দ্র করে ডেভেলপার ও ইউনিট ইনভেস্টরদের অনেক সুবিধা দেয়া হয়েছে। এগুলো অবশ্যই জরুরি। কর্মক্ষেত্রের উপযুক্ত পরিবেশের নিশ্চয়তাও দিতে হবে। ডেভেলপার যে শর্তে বেজার সঙ্গে চুক্তি করেছে তা যেন অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালিত হয়। যেমন কাজ করার সময় তথাকথিত সামাজিক এলিটরা বাধা দিচ্ছে। ফলে যে সময়ে কাজটি শেষ করার কথা, সেটি শেষ করা যাচ্ছে না। আমরা যে মানসিক অস্বস্তিতে আছি, সেটাও এক ধরনের বাধা। এসব বিষয়ও রাষ্ট্রকে চিন্তা করতে হবে।

আমরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে তিনটি জিনিস কিনে নেব। একটি শিল্পাঞ্চলে প্রথমে লাগবে বিদ্যুৎ। গুণগত মানের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। পল্লী বিদ্যুৎ আমাদের ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিচ্ছে। আমরা কিনে নিচ্ছি। আমরা পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে এ বিদ্যুৎ ব্যবহার করছি। সমপরিমাণ বিদ্যুৎ বিক্রয় হলে পল্লী বিদ্যুৎকে ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত সঞ্চালনের জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হতো। তার জন্য লোকবল লাগত, ম্যানেজমেন্ট লাগত। তাহলে তো সরকার বলতে পারত, তুমি এ ডেভেলপারের কাছ থেকে ৫ শতাংশ কম নাও। নিয়ম অনুযায়ী, অর্থনৈতিক অঞ্চল ১০ শতাংশ সার্ভিস চার্জ নেবে। আমরা যে আড়াই-তিন হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করছি, সেটি তো তুলতে হবে। সরকার আমাকে সেই জিনিসটি দেবে। যাতে আমরা ইউনিট ইনভেস্টরের হাতে সুবিধাদি একেবারে ঘরের দরজায় তুলে দিতে পারি। এগুলো করার জন্য আমাদের প্রচুর টাকা লাগবে। এ টাকাটা আমরা সার্ভিস চার্জের মাধ্যমে দিয়ে তুলব। ফলে ইউনিট ইনভেস্টরের লাভ হলো, তাকে কোথাও দৌড়াতে হচ্ছে না। ঘরের দুয়ারে রেডিমেড সবকিছু পাচ্ছে। বিদ্যুৎ-গ্যাস সবই ডেভেলপার ব্যবস্থা করছে। সঙ্গে সব সেবা এক ছাতার নিচে। সে শুধু শিল্প নিয়ে চিন্তা করবে। বিদ্যুতে সিস্টেম লস হয়। যখন ইকোনমিক জোনে আসবে তখন কিন্তু সিস্টেম লস হবে না। লস হলেও খুব কম। যেহেতু কেন্দ্রীয়ভাবে সরবরাহ দেয়া হবে। আমরা রাষ্ট্রের অনেক কিছু বাঁচিয়ে দিচ্ছি, তাহলে রাষ্ট্রের কাছ থেকে কি আমি কিছুটা সুবিধা পেতে পারি না? বলা হচ্ছে, তোমাকে কিছু সুবিধা দিচ্ছি। ভ্যাট তোমাকে দিতে হবে না। সেটি মওকুফ করে দেয়া হবে। ইউনিট ইনভেস্টর ৩ শতাংশ মওকুফ পাবে। আর ডেভেলপার ১০ শতাংশ সার্ভিস চার্জ পাবে। এতে তারা প্রণোদিত হবে।

আমরা যত বেশি ভ্যালু অ্যাডেড ইকোনমিক জোন করতে পারব ততই রাষ্ট্রের লাভ। অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর চিন্তার সঙ্গে একেবারে মাঠ পর্যায়ের চিন্তার যোগসূত্র না হলে সেগুলো খুব বেশি ফলপ্রসূ হবে না। কথা হলো, রাষ্ট্র কী কী করে দিতে পারে। সেটি হলো, স্বল্প খরচে পণ্য আনা-নেয়া। এটি হতে পারে একমাত্র নদীপথে। আমাদের যেমন সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল। সিরাজগঞ্জের পাশ দিয়ে যমুনা বয়ে গেছে। সরকার একটা ব-দ্বীপ পরিকল্পনা করেছে। ব-দ্বীপ পরিকল্পনা নদীকে নদীর মতো করেই সাজাতে চায়। এ মুহূর্তে এসে আমাদের প্রথমে চিন্তা করতে হবে সিরাজগঞ্জ থেকে গোয়ালন্দ হয়ে পদ্মা সেতুর নিচ দিয়ে মোংলা, চট্টগ্রাম বা পায়রায় পণ্যটা নিয়ে আসতে চাই। এ সুযোগ সরকারকে করে দিতে হবে। সরকার করে দেয়া মানেই কিন্তু রাষ্ট্রের উপকার করা।

আমরা এখন স্লোগান দিচ্ছি, মানুষের কাছে শিল্প যাবে, ঘরে থেকেই কর্ম হবে। ঘরে থেকে কর্ম হলে ঢাকার যানজট, জনজট, জলজট, সর্বোপরি মনোজট সবই কমে যাবে। তাছাড়া প্রতি বছর ১৬-১৭ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে ঢুকছে। তাদের যদি ঢাকায় নিয়ে আসা হয় তাহলে হবে না। তাদের ঢাকা আসা রোধ করতে হবে। সেটি খুব সুপরিকল্পিত উপায়ে করতে হবে। তাকে অর্থের ব্যবস্থা করে দিতে হবে, এলাকাভিত্তিক তার কাজের জায়গার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। মানসম্মত শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান তার দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। এজন্য নতুনভাবে সবকিছু সাজাতে হবে। ধরা যাক, ঈশ্বরদী থেকে একটা শাটল ট্রেন এসে সকাল ৭-৮টার দিকে লোকজনকে সিরাজগঞ্জ ইকোনমিক জোনে নামিয়ে দিয়ে গেল কিংবা টাঙ্গাইল থেকে একটা শাটল ট্রেন নামিয়ে দিয়ে গেল। আবার ইকোনমিক জোনকে ঘিরে চারদিকে পাঁচ কিলোমিটারের একটা সড়ক করে দেয়া হলো। সর্বোপরি নদীপথ সচল করার জন্য রাষ্ট্রকে বিরাট ভূমিকা পালন করতে হবে।

নদীগুলো এখন শুকিয়ে যাচ্ছে। সেগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। বর্ষার পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। বঙ্গোপসাগরে যেটুকু যাওয়ার ততটুকু পানি যাবে, বাকিটুকু থেকে যাবে। সেগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। অথবা নেদারল্যান্ডসের মতো ডাম্পিং করে রাখতে হবে। পানি আসলে অনেক বড় সম্পদ। এটি আমরা আগে মনেই করিনি। কাজেই প্রতিবেশী দেশ যখনই পানি ছেড়ে দেবে তখনই আমাদের পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এক্ষেত্রে আমাদের অনেক খরচ হচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর রিটার্ন আসা শুরু করবে। রাষ্ট্রের কাছে আমাদের অনুরোধ থাকবে, কম্প্রিহেনসিভ ডেভেলপমেন্টের চিন্তাটা করতে হবে। অগোছালো বা অপরিকল্পিত কোনো উন্নয়ন নয়। সুপরিকল্পিত উন্নয়ন হতে হবে। একজন শ্রমিক যখন নির্ভাবনায় ইকোনমিক জোনে ঢুকবেন, ধরা যাক, একটা সাইকেলের লেন বা রাস্তা করে দেয়া হলো, তাহলে পেট্রল বাঁচবে। যানজট হবে না। পরিবেশ বাঁচবে, শ্রমিকের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে।

নীলফামারী ইপিজেড ওই এলাকার চোহারাই বদলে দিয়েছে। সেখানে আমি দেখতে গিয়েছিলাম। মঙ্গাপীড়িত এলাকাটি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। মেয়েরা সাইকেল নিয়ে ইপিজেডে চলে আসছে কিংবা মোটরসাইকেল নিয়ে স্বামী নামিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। কয়েকজন মিলেও মোটরসাইকেলে আসছে। জিজ্ঞাসা করলে তারা বলেছিল, তারা কয়েকজন মিলে মোটরসাইকেল কিনেছে এবং সবাই মিলে এর কিস্তি শোধ করে। নিজের যোগাযোগের ব্যবস্থা নিজেই করে নিয়েছে। পরিবেশটা নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকে। তাহলেই সামগ্রিক অর্থে উন্নয়ন হবে এবং এর সুফলও পাওয়া যাবে।

অর্থনৈতিক অঞ্চলের ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব সমস্যা দেখছি। প্রথমত, স্থানীয় জনসাধারণের একটা খুব ক্ষুদ্র অংশ নানাভাবে বিশৃঙ্খলা, গণ্ডগোল করে। ফলে কার্যসম্পাদন বিঘ্নিত হয়। সামগ্রিক অর্থে রাষ্ট্রের উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে। সুতরাং এ জায়গায় কোনো রকম গোলযোগ করা যাবে না। প্রয়োজনে একজন পুলিশ অফিসারের নেতৃত্বে ক্যাম্প বসিয়ে দিতে হবে। কঠোরভাবে এ ধরনের গণ্ডগোল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একেবারে জিরো টলারেন্সে নিয়ে আসতে হবে। এর সঙ্গে ডেভেলপারকে বলতে হবে নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে কাজটি শেষ করতে। রাস্তাঘাট নির্মাণ করে দিতে হবে। মানসম্পন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ দিতে হবে। রেললাইন, নদীপথটা মসৃণ করে দিতে হবে। ডেভেলপারের স্বার্থেই দ্রুত সে বিনিয়োগকারীদের ডেকে নিয়ে আসবে। কারণ যত তাড়াতাড়ি সে বিনিয়োগকারীকে জায়গাটা বুঝিয়ে দিতে পারবে তত দ্রুত রিটার্ন পাবে। সরকার অনেক বাজেটারি সুবিধা দিয়ে রেখেছে। বাস্তবায়নের সময় বোঝা যাবে আসলে সেগুলো কাজে লাগছে নাকি নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

 

শেখ মনোয়ার হোসেন: উদ্যোক্তা পরিচালক

সিরাজগঞ্জ ইকোনমিক জোন