বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আইন সংশোধনের পর সরকার প্রথমবারের মতো নির্বাহী আদেশে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দিল বৃহস্পতিবার। বিশেষ বা জরুরি পরিস্থিতিতে নয়, স্বাভাবিক সময়েই এটি করা হলো। এর আগে ৮ জানুয়ারি গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় নিয়ে গণশুনানি করে বিইআরসি। যেহেতু গণশুনানি তারা করেছে সেহেতু দাম সমন্বয়ের বিষয়ে এবারের ঘোষণাটিও তাদেরই দেয়ার কথা ছিল। সে প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছিলও তারা, কিন্তু তার আগেই নির্বাহী আদেশে মন্ত্রণালয় দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিল। সরকার আগে থেকেই জ্বালানি তেলের দাম নির্বাহী আদেশে বাড়িয়ে আসছিল। এখন আইন সংশোধন করে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নির্ধারণের এখতিয়ার নিজেদের হাতে নেয়। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে সেটির চর্চাও শুরু করল। এর মাধ্যমে বিইআরসি কার্যত অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপ নিচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার আর কোনো কাজ অবশিষ্ট রইল না। এতে ভোক্তা স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হবে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন, ২০০৩-এর আওতায় প্রতিষ্ঠিত হলেও ২০০৭ সাল থেকে এর কার্যক্রম শুরু হয়। সেখানে মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে পক্ষগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। তবে গণশুনানিতে যা যা যৌক্তিক বলে প্রমাণিত হয় বিইআরসির আদেশে তা প্রতিফলিত হয় না। আদেশে কোম্পানি/সংস্থাগুলোর স্বার্থই সুরক্ষা পায়। তার পরও গণশুনানির কারণে ন্যায্য ও যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়ে, রেগুলেটরি কালচারে জাতি সমৃদ্ধ হয়। জাতির প্রগতিশীল চরিত্রের বিকাশ ঘটে। আইনি ক্ষমতা প্রয়োগে রেগুলেটরি ও প্রশাসনিক সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। বিইআরসি আইন সংশোধন করায় সেসব অগ্রগতি অকার্যকর হয়ে গেল। গণশুনানির কারণে কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। কোম্পানিগুলোও যেনতেন হিসাব উপস্থাপন করে মূল্যহার বাড়ানোর ব্যাপারে কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। তবে জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে ভোক্তারা সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকেন। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে থাকেন না। কারণ গণশুনানির মাধ্যমে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ হয়। গণশুনানি ছাড়া দাম নির্ধারণ হলে সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা বাড়ে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনে (বিপিসি) ও তার আওতাধীন কোম্পানিই দৃষ্টান্ত। বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও সরকার একই নীতি গ্রহণ করল, যা উদ্বেগজনক। এতে কোম্পানিগুলোর কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি তৈরি হবে। 

বিইআরসির মাধ্যমে দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়ায় সরকারের প্রতিও আস্থা তৈরি হয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যৌক্তিকভাবে দাম বাড়ালে ভোক্তা মেনে নেন, কিন্তু হুট করে দাম বাড়ালে ভোক্তার আস্থা থাকে না। এতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় না। সরকার আইন সংশোধন করে দাম বাড়ানোর ক্ষমতা নেয়ার পর বিইআরসি গণশুনানি করেছে। এতে আশাবাদী হয়েছিল জনগণ। ভেবেছিল, সরকার জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া তাদের মূল্য সমন্বয়ের ক্ষমতা ব্যবহার করবে না। কিন্তু এখন জরুরি পরিস্থিতি ছাড়াই ক্ষমতা ব্যবহার করল। বিদ্যুৎ খাতে কখনোই পরিস্থিতি এমন হয় না যে তিনদিনের মধ্যে দাম বাড়াতে হবে। সরকার চাইলে তিনদিন পর বিইআরসির মাধ্যমেই দাম বাড়াতে পারত। এতে সরকারের প্রতিও জনগণের বিশ্বাসযোগ্যতাটা বাড়ত।

বিদ্যুৎ একটি সেকেন্ডারি বা দ্বিতীয় পর্যায়ভুক্ত জ্বালানি। বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিক বা প্রাইমারি জ্বালানি যেমন—তেল, গ্যাস, কয়লার মতো নিঃশেষযোগ্য বা সূর্যরশ্মির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রয়োজন। একসময় বলা হতো, বাংলাদেশ প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর ভাসছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান জ্বালানি ছিল প্রাকৃতিক গ্যাস। কিন্তু নব্বইয়ের দশক থেকে বিশেষজ্ঞরা সতর্কবাণী উচ্চারণ করে আসছেন যে বর্তমান হারে গ্যাস ব্যবহার অব্যাহত থাকলে ও নতুন মজুদ পাওয়া না গেলে বর্তমান মজুদ আগামী তিন-চার দশকেই নিঃশেষ হয়ে যাবে। বাস্তবে তাই হয়েছে। গ্যাসের উল্লেখযোগ্য নতুন মজুদ পাওয়া না যাওয়ায় বিদ্যমান মজুদ ফুরিয়ে আসছে। আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভর করে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা সাজানো হয়। বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভ্রান্ত নীতি ও কৌশল, ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সমন্বয়ের অভাব এবং স্বজনতোষণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অনিবার্য বিষয়টিকে ত্বরান্বিত করেছে মাত্র। যুদ্ধের ফলে জ্বালানির দাম বেড়েছে এ কথা সঠিক, কিন্তু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বা ওঠানামা নতুন কিছু নয়। মূল সমস্যা হচ্ছে রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থতা, উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে দুর্নীতি এবং অপচয়। ফলে সরকার বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিদ্যুতের মূল্য পরিশোধ করতে পারছে না, তারা জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ডলার পাচ্ছে না। বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে থাকছে এবং ক্যাপাসিটি পেমেন্টের দায় বাড়ছে। এসব মিলিয়েই লোডশেডিং, দাম বৃদ্ধি এবং দেশীয় ও রফতানি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিপর্যয় নেমে এসেছে। দীর্ঘদিন বিভিন্ন মহল থেকে এসব আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সরকার নিজেদের কল্পিত সাফল্য নিয়ে এতটাই আত্মতুষ্টিতে ভুগছিল যে এসব সতর্কবার্তায় তারা কর্ণপাত করেনি। বলা যায়, অতীতের ভুল নীতিই এখন সরকার ও জনগণকে ভোগাচ্ছে।

গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু বাসাবাড়িতে পড়বে তা নয়, কৃষি ও শিল্পপণ্যের উৎপাদন খরচও এতে বৃদ্ধি পাবে। উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরাও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে হতাশার কথা জানিয়েছেন। এমনিতে সামগ্রিক অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে। বেশির ভাগ অর্থনৈতিক সূচকই নিম্নগামী। বিশ্ব অর্থনীতিও মন্দার আশঙ্কায়। কমে যাচ্ছে সামগ্রিক চাহিদা। এ রকম একটা সময়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যৌক্তিক নয়। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এ সময়ে আবারো প্রশ্ন উঠেছে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো টিকিয়ে রাখার যৌক্তিকতা নিয়েও। ২০০৯-১০ সালে আপাত-সংকট কাটাতে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো চালু করেছিল। উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি দাম দিয়ে সরকার তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনেছে। দেশের শিল্প-কারখানা বাঁচিয়ে রাখতে এবং জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সে সময় কুইক রেন্টালের প্রয়োজনীয়তা ছিল, কিন্তু সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী যেখানে চাহিদার চেয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বেশি, সেখানে কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো টিকিয়ে রাখার কোনো যুক্তি নেই। কিন্তু কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র টিকিয়ে রাখা হয়েছে এবং ক্যাপাসিটির চার্জ হিসাবে অর্থ দিয়ে যেতে হচ্ছে, যা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। বিগত ১২ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়লেও সাধারণ মানুষকে বেশি দাম দিয়েই বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের দাবি, লোকসান কমাতেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। সরকার যদি বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে, সেক্ষেত্রে লোকসান অযৌক্তিক নয়, কিন্তু বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকার সময়ও সেসবের ভাড়া বা ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ দিতে গিয়ে সরকারের লোকসান কোনোভাবেই যৌক্তিক বলা যায় না। অথচ সরকার বরাবর গ্রাহকের কাছ থেকেই ভর্তুকির টাকা আদায়ের সহজ পথ বেছে নিয়ে বিকল্প পন্থা গড়ে তোলার কথা ভাবছে না। সিস্টেম লস, যার আড়ালে দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে, সেটা হ্রাস করা গেলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর দরকার পড়ে না। এ খাতে অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে।

সব দেশের সব সরকারেরই নিজের আইন ভঙ্গ করার একটা প্রবণতা থাকে। ১৯৯৬ সালে বিশ্বব্যাপী বিদ্যুৎ খাতে সংস্কার শুরু হয়। এ সংস্কারের মধ্যেই ছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা তৈরি করা। সরকারের কাজে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি নিশ্চিত করাই নিয়ন্ত্রণ সংস্থার কাজ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) চাপেই ২০০৩ সালে বিইআরসি আইন করা হয়। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে এটি কার্যকর হতে শুরু করে। এখন যা করা হচ্ছে, এটা পরিষ্কারভাবে পেছনের দিকে যাওয়া। এতে অদক্ষতা বাড়বে এবং জবাবদিহি হ্রাস পাবে। সর্বোপরি বিইআরসি আরেকটি অকার্যকর নিয়ন্ত্রক সংস্থায় পরিণত হবে, যা উন্নয়নশীল একটি দেশের জন্য কাম্য নয়।