এখন বিশ্বব্যাপী চলছে ডলার সংকট। এ প্রেক্ষাপটে প্রায় সব দেশের অর্থনীতিতে বিনিময় হার একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশেও তাই। দেশে গত বছর ১ ডলার সমান ছিল ৮৫ টাকা। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত দরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫ দশমিক ৪৮ টাকায়। ফলে দেশে খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ নানা অসহনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একটা দেশ কখনো জনগণের প্রয়োজনীয় সব চাহিদা একাই মেটাতে পারে না বা নিজের ভৌগোলিক সীমানায় উৎপাদন করতে পারে না। ভিন্ন দেশের সঙ্গে লেনদেন করতে হয়। ভিন্ন দেশে ভিন্ন মুদ্রা প্রচলিত এবং এক দেশের মুদ্রা অন্য দেশে চলে না, সেহেতু চলে আসে এক্সচেঞ্জ রেটের বিষয়। মূলত দুটি ভিন্ন দেশে যে হারে একটি দেশের প্রচলিত মুদ্রা অন্য দেশের প্রচলিত মুদ্রার সঙ্গে বিনিময় করা যায়, তাকেই বিনিময় হার বলে।

এক্সচেঞ্জ রেট বা বিনিময় হার তিনভাবে নির্ধারণ হতে পারে। প্রথমটি, ফ্লেক্সিবল বা ফ্লোটিং এক্সচেঞ্জ রেট, যেখানে সরকারের কোনো হাত থাকে না, বরং এক্সচেঞ্জ রেট নির্ধারিত হয় চাহিদা এবং জোগানের ভিত্তিতে। দেশে কোনো পণ্য আমদানি করা হলে কিংবা দেশের নাগরিকরা অন্য দেশের জায়গা-জমি ইত্যাদিতে বিনিয়োগ করলে সাধারণত বিদেশী মুদ্রার চাহিদা বাড়ে। আবার দেশ থেকে পণ্য রফতানি করা হলে কিংবা অন্য দেশ এখানে বিনিয়োগ করলে বিদেশী মুদ্রা হাতে আসে তথা মুদ্রার জোগান ঘটে। তবে মুক্তবাজার অর্থনীতির যেসব সুবিধা আছে তা এই এক্সচেঞ্জ রেটেও দেখা যায়। যে কারণে বাংলাদেশসহ প্রায় প্রতিটি দেশে এ এক্সচেঞ্জ রেটের ব্যবহার রয়েছে। এর বড় অসুবিধা হলো বারবার বিনিময় হার পরিবর্তন হয়েছে। ফলে অর্থনীতিতে একটা অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আবার ফাটকাবাজি তথা ভবিষ্যতে বিদেশী মুদ্রার দাম বেড়ে যাবে ভেবে জনগণ বিদেশী মুদ্রার প্রতি আকৃষ্ট হয়। অনেক সময় তা কিনে জমিয়ে রাখার চেষ্টা করে। এতে বিদেশী মুদ্রার প্রকৃতপক্ষেই দাম বেড়ে যায়। যাকে অর্থনীতিতে সেলফফুল-ফিলিং প্রফেসিংও বলা হয়।

দ্বিতীয়টি হলো ফিক্সড এক্সচেঞ্জ রেট। এ পদ্ধতিতে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক্সচেঞ্জ রেট নির্ধারণ করে দেয়। ধরা যাক, সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিল ১ ডলার সমান ৯০ টাকা এবং এ দামেই পণ্য লেনদেন হবে। একে বলা হয় ফিক্সড এক্সচেঞ্জ রেট। এ পদ্ধতির সুবিধা হলো বাজার অর্থনীতিতে ভারসাম্য বজায় থাকে এবং অনিশ্চয়তা অনেকটা দূর হয়। তবে এর বড় অসুবিধা হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সবসময় ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেটে বেচাকেনায় যুক্ত থাকতে হয়, যার প্রভাব পড়ে মুদ্রা বিনিময়ে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফিক্সড এক্সচেঞ্জ রেটে বিদেশী মুদ্রা বা ডলারের চাহিদা বাড়লে ডলারের দামে ঊর্ধ্বমুখী একটা চাপ দৃশ্যমান হয়। যেহেতু ফিক্সড এক্সচেঞ্জ রেট, তাই সরকার চাইবে এক্সচেঞ্জ রেট আগের মতোই রাখতে। স্বাভাবিকভাবে এজন্য সরকার ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেটে ডলার বিক্রি করবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জোগান দেয়া অতিরিক্ত ডলারে চাহিদা মিটলে ডলারের দাম বাড়বে না। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পাবে টাকা, আর অন্যান্য ব্যাংকে আমানত কমে যাবে। প্রকারান্তরে এতে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণ দেয়ার সক্ষমতা অনেক কমে যাবে; এখন যেমনটা হচ্ছে। তাছাড়া এ এক্সচেঞ্জ রেট পদ্ধতিতে কালোবাজারির দৌরাত্ম্য বাড়ে, তাদের আয় বাড়ে; কিন্তু ব্যাংকের মুনাফা এবং সরকারের রাজস্ব প্রাপ্তির সুযোগ ব্যাহত হয়।

এখন উল্লেখিত দুটি এক্সচেঞ্জ রেট পদ্ধতির সমন্বয়ে অন্য এক পদ্ধতির তৈরি হয়েছে। একে বলা হয় ম্যানেজড ফ্লোট। এ পদ্ধতিতে সরকার সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন একটা সীমা নির্ধারণ করে দেয় যে বিদেশী মুদ্রার দাম বা বিনিময় হারটা কত হবে এবং এ সীমার বাইরে গেলে সরকার তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংক হস্তক্ষেপ করে। একটা দেশের অর্থনীতিতে এক্সচেঞ্জ রেটের ভূমিকা অনেক। এর ওপর একটা দেশের বাণিজ্যিক ব্যবস্থা কেমন আর মানুষের জীবনযাত্রার মান কেমন, তা নির্ভর করে। তাই এ এক্সচেঞ্জ রেটকে সবসময় ভারসাম্যের মধ্যে রাখা অত্যাবশ্যক, যদিও আজকের বিশ্বে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে এ এক্সচেঞ্জ রেটের ভারসাম্যহীনতার কারণে নানা অর্থনৈতিক সমস্যাসহ সামাজিক সমস্যা পোহাতে হচ্ছে।

এদিকে বর্তমানে বাংলাদেশে বিনিময় হারের বাজারে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। এর কারণ বর্ধিত ঋণ চাহিদা, প্রণোদনা ঋণ সরবরাহ, বর্ধিত মূল্যের আমদানি, রফতানির তুলনায় বর্ধিত আমদানি এবং কম রেমিট্যান্স। গত ৩০ এপ্রিল আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ছিল ৪৪ বিলিয়ন ডলার, যা এখন ৩৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দেশের মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। কিন্তু এক্ষেত্রে নিজস্ব ব্যর্থতাও আছে। বাংলাদেশ বিনিময় হারের যথাযথ তদারকি এবং নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বরাবরই দুর্বল। দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের বড় ব্যবসায়ীরা দপ্তর খুলেছেন। তাদের অনেকেই আমদানিতে ওভার ইনভয়েসিং এবং রফতানিতে আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থপাচার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আর তুলনামূলক ছোটরা অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে হুন্ডির আশ্রয় নিচ্ছেন বলে খবর মিলছে।

গত জুনে ব্যাংকে অতিরিক্ত তারল্য আবারো ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তখন কেউ কেউ রেমিট্যান্সে প্রণোদনা প্রত্যাহারের পরামর্শ  দিয়েছিল। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে যে বিনিময় হার বেড়েই চলেছে তাতে ভারসাম্য আনতে এখন মুদ্রা ও রাজস্ব উভয় নীতির সম্মিলিত প্রয়োগ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। টাকার খুব বেশি অবমূল্যায়ন শ্রীলংকার মতো জ্বালানি দুষ্প্রাপ্যতা ঘটিয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে পারে, যা যে কোনো নিরাময় চেষ্টাকে কঠিন করে তুলতে পারে। আবার তুরস্কের মতো দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে অবমূল্যায়ন ঠেকানোর চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে।

ডলার বিক্রি থেকে প্রাপ্ত বিপুল অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জমা আছে। টাকার বিনিময় হারের অবমূল্যায়ন করলেই আমদানি কমবে, আর বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ধরে রাখা যাবে, এমন কোনো স্বতঃসিদ্ধ সূত্র নেই অর্থবিজ্ঞানে। আর মুদ্রার সঞ্চালন বা বিয়োজন বা শুষে নেয়ার কাজ সবসময়ই সাময়িক উপশম হতে পারে সংকটাপন্ন অর্থনীতিকে চাঙা করতে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেগুলো সবসময়ই অকার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।  একটি দেশের মুদ্রাকে ব্যাপক পতনের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে রফতানি, প্রবাসী আয় কিংবা বিদেশী বিনিয়োগের মতো দীর্ঘমেয়াদি রসদ জোগাতে হবে অর্থনীতিতে। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক বা অশুল্ক সব বাণিজ্য বাধা দূর করতে হবে। প্রয়োজনীয় রিটার্ন তুলে আনতে অদক্ষ বলে প্রমাণিত প্রকল্প ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ঘুস-দুর্নীতি, অনিয়ন্ত্রিত ভোগে টানতে হবে লাগাম। সর্বোপরি দেশীয় পণ্যের প্রতি চাহিদা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি আমদানি বিকল্প শিল্পের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

 

সুমাইয়া বিনতে হোসাইন: শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়