আমাদের দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন
করে। প্রবাসীদের পাঠানো এ কষ্টার্জিত আয়ের ওপর নির্ভর
করে দেশে
বৃহৎ অংকের
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকে।
বিশেষ করে
বৈদেশিক মুদ্রার
রিজার্ভ বৃদ্ধির
ক্ষেত্রে রেমিট্যান্সের মুখ্য ভূমিকা রয়েছে।
তবে প্রবাসীরা বৈধ পথে বিদেশ
থেকে ডলার
পাঠালে তা
রেমিট্যান্স হিসেবে
গণ্য হয়।
অবৈধ পথে
অর্থ প্রেরণ
করলে সেটি
রেমিট্যান্সের অন্তর্ভুক্ত হয় না। ফলে
দেশের বৈদেশিক
রিজার্ভের মজুদ
ক্ষতিগ্রস্ত হয়
এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে রেমিট্যান্স আসা কমে যাওয়ার
কারণ খুঁজতে
গিয়ে হুন্ডির
ক্ষেত্রে মোবাইল
ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস
বা মোবাইল
ব্যাংকিংয়ের জড়িত
থাকার প্রমাণ
পাওয়া যায়।
ফলে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়াতে মোবাইল
ব্যাংকিংকে অনুমোদন
দেয়া যায়
কিনা তা
যাচাই করার
পর অবশেষে
বাংলাদেশ ব্যাংক
প্রজ্ঞাপন জারি
করে। বণিক
বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা
যায়, মোবাইলে
আর্থিক সেবাদানকারী (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে
সরাসরি দেশে
রেমিট্যান্স পাঠানোর
সুযোগ করে
দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এত দিন
এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো তৃতীয় কোনো পক্ষের
আনা রেমিট্যান্স গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে
দিত। নতুন
নির্দেশনা কার্যকর
হলে প্রবাসীরা সরাসরি এমএফএসের মাধ্যমে
দ্রুততম সময়ে
রেমিট্যান্স পাঠাতে
পারবেন। মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক
মুদ্রানীতি বিভাগ
থেকে জারি
করা এক
প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে
এ-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রকাশ করা
হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা
হয়েছে, এখন
থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত মোবাইল সার্ভিস প্রোভাইডাররা প্রবাসী আয় প্রত্যাবাসনের জন্য (দেশে আনার
জন্য) বিদেশের
অনলাইন পেমেন্ট
গেটওয়ে সার্ভিস
প্রোভাইডার, ব্যাংক,
ডিজিটাল ওয়ালেট,
কার্ড স্কিম
বা এগ্রিগেটর পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে পারবে। রেমিট্যান্স প্রত্যাবাসন-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে আগ্রহী
মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রোভাইডারদের আগামী
৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এ-সংক্রান্ত অনুমোদন চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে
হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারি করা নীতিমালা অনুযায়ী, লাইসেন্সপ্রাপ্ত মোবাইল আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রবাসী আয় প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিদেশী অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে সার্ভিস প্রোভাইডার, ব্যাংক, ডিজিটাল ওয়ালেট, কার্ড স্কিম ও এগ্রিগেটর পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করবে। মোবাইল আর্থিক সেবাদাতাদের বিদেশী সহযোগীদের সঙ্গে কার্যকর ব্যবস্থা থাকবে, যার মাধ্যমে তাদের অ্যাকাউন্টে বৈদেশিক মুদ্রা আসবে। ওই বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাসী গ্রাহকের মনোনীত সেলফোনের আর্থিক অ্যাকাউন্টে টাকায় রূপান্তরিত হয়ে প্রবেশ করবে।
এক্ষেত্রে বিদেশে কর্মরত প্রবাসীরা যথাযথ ই-কেওয়াইসি পরিপালন করে মোবাইল
ব্যাংকিং অর্থাৎ
এমএফএসে হিসাব
খুলতে পারবেন।
আর বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো সেলফোনের আর্থিক
সেবাদাতাদের অ্যাকাউন্টে লেনদেন নিষ্পত্তির সুবিধা
দিতে পারবে।
এজন্য অবশ্য
নির্দিষ্ট ব্যাংকগুলোর বিদেশের নস্ট্রো হিসাবে
অর্থ জমার
পর ওই
অর্থের সমপরিমাণ টাকা সেটেলমেন্ট হিসাবে
জমা হবে।
উল্লেখ্য, নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট হলো
বৈদেশিক মুদ্রায়
দায়দেনা পরিশোধের জন্য বিদেশের ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশী ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট। এ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে
গ্রাহকের পক্ষে
বিদেশী ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে সংশ্লিষ্ট পণ্য
বিক্রেতার এলসি
মূল্য পরিশোধ
করা হয়।
আবার রফতানি
বিল ও রেমিট্যান্সের অর্থও
নস্ট্রো অ্যাকাউন্টে যোগ হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা কার্যকর হলে প্রবাসীরা বিদেশে বসেই এমএফএস
প্রতিষ্ঠানের অ্যাপ
ব্যবহার করে
যেকোনো সময়
রেমিট্যান্স পাঠানোর
সুযোগ পাবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ
কমে যাচ্ছে।
রেমিট্যান্সের অর্থ
অবৈধ হুন্ডিতে চলে যাচ্ছে বলে
বিভিন্ন সংস্থার
পর্যবেক্ষণে উঠে
এসেছে। হুন্ডির
কারবারিরা প্রবাসীদের স্বজনদের কাছে রেমিট্যান্সের অর্থ পাঠানোর জন্য
মোবাইল ব্যাংকিংকে ব্যবহার করছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে এমএফএস
প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি রেমিট্যান্স আনার সুযোগ দেয়া
হয়েছে। এটি
কার্যকর হলে
বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে
বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণা।
আমরা
এক্ষেত্রে আশাবাদী
হতে চাই,
কারণ প্রযুক্তিগত সমস্যা প্রযুক্তি দিয়েই
সমাধান করতে
হবে। এজন্য
বাংলাদেশ ব্যাংক
দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলা যায়।
এখন এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যথাযথ তদারকিও
নিশ্চিত করা
প্রয়োজন। কারণ
যেহেতু হুন্ডির
ক্ষেত্রে এমএফএসকে দায়ী করা হয়েছিল,
তাই প্রযুক্তিগত কোনো দুর্বলতার সুযোগে
যেন এর
অপব্যবহার না
হয়, সেটি
নিশ্চিত করতে
হবে।
বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং দেশজুড়ে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। সে হিসেবে হুন্ডি কারবারিরা এর সুবিধাও নিয়েছে, দীর্ঘদিন পর এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপের ফলে এমএফএস ব্যবহার করে হুন্ডির কার্যক্রম বন্ধ হবে—সে প্রত্যাশা করা যেতেই পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে শুধু প্রজ্ঞাপন জারি করে এবং অনুমোদনের জন্য কিছু আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করলেই কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। এর সঙ্গে প্রবাসীদের আকৃষ্ট করতে প্রণোদনা দরকার হবে কিনা সেটিও যাচাই করতে হবে। কারণ দেশের ভেতর স্বাভাবিক লেনদেন করতেই এমএফএসগুলো ব্যাংকের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে—এমন অভিযোগ আছে। সুতরাং ব্যাংক খাতের পাশাপাশি এমএফএসকে রেমিট্যান্সের জন্য অনুমোদন দেয়া হলে সেটি যদি কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না এনে দেয়, তাহলে এ উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হবে। এজন্য গ্রাহক সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রবাসীরা যে কারণে হুন্ডিতে অর্থ পাঠাত, সেটিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনার দাবি রাখে।
মোবাইল
ব্যাংকিংয়ের আরেকটি
দিক হচ্ছে,
এর মাধ্যমে
প্রতারণা সংঘটিত
হয়ে থাকে।
নিকট অতীতে
এমএফএসের সাবেক
কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ভুয়া ফোন কলের
মাধ্যমে গ্রাহকের টাকা হাতিয়ে নেয়া
হয়েছে এমন
অভিযোগও দেখা
গেছে। আর
প্রবাসীদের ক্ষেত্রেও নানাভাবে আর্থিক প্রতারণার চিত্র আমরা অতীতে
দেখেছি। যেহেতু
দেশে থাকা
স্বজনদের জন্য
রেমিট্যান্স লাভজনক
একটি বিষয়।
তাই প্রতারক
চক্র যে
এমএফএসের ক্ষেত্রেও সক্রিয় হবে না
তা নিশ্চিত
করে বলা
যাবে না।
এজন্য মোবাইল
ব্যাংকিংয়ে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারের
কঠোর নজরদারি
বজায় রাখতে
হবে।
বাংলাদেশের সঞ্চিত রিজার্ভ
কমে যাচ্ছে,
দেশের প্রয়োজন
পূরণের জন্য
রিজার্ভ খরচ
খুব স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু
সেই সঙ্গে
রিজার্ভের পরিমাণ
বৃদ্ধির দিকেও
নজর দিতে
হবে। তাই
রিজার্ভের প্রধান
একটি উৎস
রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে।
এক্ষেত্রে মোবাইল
ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে
দেশে রেমিট্যান্স আনার যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, সেটি
সফলভাবে বাস্তবায়ন হোক—আমরা সে
প্রত্যাশাই করি।
এজন্য ব্যাপক
প্রচারণা চালানোসহ প্রবাসী ও তাদের
স্বজনদের সচেতন
করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভূমিকা
রাখবে, সেটিও
আমাদের কাম্য।










