দেশের সড়ক ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। সড়ক উন্নয়নে সরকারের বিপুল বিনিয়োগের বিষয়টি স্পষ্ট, তবে তা নিরাপদ চলাচল যে নিশ্চিত করতে পারেনি, এ নিয়ে কোনো প্রশ্নের অবকাশ নেই। বিশেষজ্ঞরা সড়ক নির্মাণ ও মেরামতে ব্যাপক অনিয়ম এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের কথা প্রায় বলে থাকেন। সড়কের বেহাল অবস্থার বিষয়টিও গণমাধ্যমের নিত্যদিনের শিরোনামে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে ভয়াবহ যে বিষয়টি যুক্ত হয়েছে, তা হলো সড়ক দুর্ঘটনা। সর্বত্র সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার দারুণ অভাব রয়েছে। ৭ জানুয়ারি শনিবার রোড সেফটি ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৬ হাজার ৮২৯টি এবং এতে প্রাণ হারিয়েছেন ৭ হাজার ৭১৩ এবং আহত হয়েছেন ১২ হাজার ৬১৫ জন। ক্ষতির আর্থিক মূল হিসাব করা হয়েছে ১৮ হাজার কোটি টাকা। সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে বাংলাদেশে প্রত্যাশিত লক্ষ্যে পৌঁছানো দূরে থাক, কাছেই যেতে পারেনি। আইনের দুর্বল দিক, আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়া, উপযুক্ত আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে বিভিন্ন ধরনের বাধা, সরকারের সদিচ্ছা ও জনসচেতনতার অভাবের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা যাচ্ছে না। দেশে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দুর্ঘটনার কারণগুলো আমলে নিয়ে সে মোতাবেক কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চালকের অদক্ষতা ও বেপরোয়া যানবাহন চালানোর পাশাপাশি ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, সড়ক ও সেতুর নাজুক অবস্থাও সড়ক দুর্ঘটনার জন্য বহুলাংশে দায়ী। গণপরিবহনে বাড়তি যাত্রী সামাল দিতে গতিসীমার বাইরে দ্রুত গাড়ি চালিয়ে বেশি ট্রিপ দেয়ার অশুভ প্রতিযোগিতা আর বাড়তি মুনাফার লোভে পরিবহন সংস্থাগুলো চালকদের অনেক বেশি সময় কাজ করতে বাধ্য করে। ফলে চালকের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ পড়ে, তাকে বেসামাল হয়ে গাড়ি চালাতে হয়; যা প্রকারান্তরে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। লক্কড়-ঝক্কড়, অচল যানবাহনে রঙ লাগিয়ে যেনতেন মেরামত করে রাস্তায় চলাচল করে বিভিন্ন উৎসব-পার্বণের সময়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী দূর-দূরান্তে গমনাগমন করে। সড়ক-মহাসড়কে চলে বাস-ট্রাকের মাদকাসক্ত চালকের অমনোযোগী লড়াই। অতি আনন্দে গাড়ি চালানোর সময় তারা ব্যবহার করেন সেলফোন, যা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত। পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী বহন, অদক্ষ চালক ও হেলপার দ্বারা যানবাহন চালানো, বিরামহীন যানবাহন চালানো, মহাসড়কে অটোরিকশা, নসিমন-করিমন ও মোটরসাইকেলের অবাধ চলাচল এবং ব্যস্ত সড়কে ওভারটেকিং, ওভারলোডিং তদারক না করা সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। ত্রুটিপূর্ণ মহাসড়কের কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়ক দুর্ঘটনায় বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর কারণে প্রধানমন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পাঁচ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেগুলো ছিল চালক ও সহকারীদের প্রশিক্ষণ প্রদান, দূরপাল্লার বাসযাত্রায় বিকল্প চালক রাখা ও ৫ ঘণ্টা পরপর চালক পরিবর্তন, চালক ও যাত্রীদের সিটবেল্ট বাঁধা বাধ্যতামূলক, চালকদের জন্য মহাসড়কে বিশ্রামাগার নির্মাণ এবং সিগন্যাল মেনে যানবাহন চালানোর ওপর কড়াকড়ি আরোপ; যা তেমন বাস্তবায়ন হতে দেখা যায়নি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

বিশ্বের প্রথম সারির উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার কথা বলতে গেলে সিঙ্গাপুরের নামটি সামনে চলে আসে। সিঙ্গাপুরে পরিবহন ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে ল্যান্ড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি গঠিত হয় ১৯৯৫ সালে। এক দশকের ব্যবধানে সংস্থাটি দেশটির পরিবহন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনে। গ্রাহক সন্তুষ্টির দিক থেকে সিঙ্গাপুরের পরিবহন ব্যবস্থা বিশ্বে প্রথম সারিতে। এশিয়ার মধ্যে চীন, জাপান, দুবাই, ইউরোপের সুইডেন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি প্রভৃতি দেশের পরিবহন ব্যবস্থা বিশ্বে আদর্শ। প্রতিটি দেশই নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। দেশগুলোয় সংশ্লিষ্ট আইনটি অত্যন্ত শক্তিশালী। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আইন বাস্তবায়নে তাদের প্রশাসন খুবই কঠোর, কোনো ছাড় দেয়া হয় না। শুধু তাই নয়, সড়কের কারণে দুর্ঘটনার হার সিঙ্গাপুর সর্বনিম্নে নামিয়ে এনেছে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী যানবাহনের অতিরিক্ত গতি ও চালকের বেপরোয়া মনোভাব। মহাসড়কে অপরিকল্পিত স্পিডব্রেকার বা গতিরোধকগুলোও দুর্ঘটনার জন্য অনেকাংশে দায়ী। এছাড়া ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, সড়কের পাশে হাটবাজার বসা, চালকের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব ইত্যাদি কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে। মহাসড়কে যান চলাচলের সর্বোচ্চ গতি বেঁধে দিয়ে এবং গতি পরিমাপক যন্ত্র ব্যবহার করে চালকদের ওই নির্দিষ্ট গতি মেনে চলতে বাধ্য করা হলে দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আইনের প্রয়োগ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ চালক এবং সড়কে চলাচল উপযোগী ভালো মানের যানবাহন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে জনগণকেও হতে হবে সচেতন। সড়কে দুর্ঘটনা হ্রাসে এরই মধ্যে পেশাদার চালকদের লাইসেন্স পেতে ও নবায়নের ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা ছাড়াও তাদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন, কিন্তু সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ১১১টি সুপারিশ করা হলেও আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে পুলিশ কর্তৃক চার্জশিট দাখিল এবং দ্রুত ন্যায়বিচারপ্রাপ্তির পথ সুগম করা হলে তা দুর্ঘটনা হ্রাসে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আমাদের বিশ্বাস। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যেভাবেই হোক, সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। সচেতন হতে হবে পথচারীদেরও। একই সঙ্গে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ চালক এবং সড়কে চলাচল উপযোগী ভালো মানের যানবাহন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারের পাশাপাশি পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হওয়া উচিত।

ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলাচল এবং চালকের বেপরোয়া হয়ে যাওয়া কীভাবে বন্ধ করা যায়, এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া দরকার। গোড়ায় গলদ রেখে শুধু বিশেষ অভিযান চালিয়ে আখেরে কোনো লাভ হবে না। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য একটি গাড়ির একাধিক মালিকের পরিবর্তে বড় কোম্পানির অধীনে পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে আসা প্রয়োজন। বিশ্বের অনেক দেশেই মালিকদের সমন্বয়ে বড় কোম্পানি গঠন করে পরিবহন ব্যবস্থা পরিচালনা করা হয়। এতে চালক ও শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ে। পরিবহন খাতেও শৃঙ্খলা ফিরে আসে। সারা দেশের চালকদের সমন্বিত ডাটাবেজ তৈরি করে, তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা জরুরি। এতে চালকের ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর এবং দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি সড়কের নিয়ম-কানুন মেনে চলার জন্য চালক ও যাত্রীদের বাধ্য করতে হবে। বাংলাদেশে শতকরা ৭০ ভাগ যাত্রী সড়ক পরিবহনে যাতায়াত করে। সড়ক পরিবহনে এত যাত্রী খুব কম দেশেই দেখা যায়। দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে সড়ক পরিবহনের ওপর থেকে চাপও কমাতে হবে।

বাংলাদেশ এরই মধ্যে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তীর্ণ হয়েছে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থার দিকে নজর দিলে মনে হয় এখনো সেই আদিম অবস্থায় রয়ে গেছে। নির্ধারিত সময়ে উন্নত দেশের মতো গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা কষ্টসাধ্য বলেই মনে হয়। কারণ হাতে সময় আছে আর মাত্র ১৮ বছর। এ সময়ে সবার জন্য উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত সম্ভব না হলে সব উন্নয়নই ম্লান হয়ে যাবে। বলা হয়, কোনো দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে উন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অপরিহার্য। আর্থসামাজিক অগ্রগতির পূর্বশর্ত উন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং উন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা এ দুটি বিষয় অঙ্গাঙ্গি জড়িত। এছাড়া উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা সভ্যতার পরিচয় বহন করে। সুতরাং উন্নত দেশের উপযোগী পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে পরিকল্পনা ও কাজ এখন থেকেই শুরু করতে হবে।