রাজধানীজুড়ে যতদূর চোখ যায় ব্যানার, ফেস্টুন, দেয়াল লিখন ও পোস্টারে ঘেরা। প্রধান সড়ক, ফ্লাইওভার, ফুটওভার ব্রিজ, ট্রাফিক পুলিশ বক্স, যাত্রী ছাউনি, সড়কের পাশের দেয়াল, প্রাচীর, ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক খুঁটি, গাছপালা ও স্মৃতিস্তম্ভ, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা— সবকিছুতেই পোস্টার সাঁটানো। ঢাকার সৌন্দর্য যেন ঢাকা পড়েছে পোস্টারে। হুড খোলা রিকশা কিংবা ট্রাফিক জ্যামে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে জানালার বাইরে দৃষ্টি দিয়ে চোখ যখন প্রশান্তি পাওয়ার কথা, তখন প্রশান্তির বদলে বিরক্তি ভাবটাই বেশি আসে। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণের পর নাগরিক জীবনে যুক্ত হয়েছে নতুন দূষণ ‘দৃশ্যদূষণ’। এ দূষণের হাত থেকে রক্ষা পায়নি মেট্রোরেলের পিলারও। মানুষের যাতায়াত, চলাচল রয়েছে এমন কোনো স্থাপনা নেই যেখানে পোস্টার নেই। একটি পোস্টারের ওপর পাঁচ-সাতটি পোস্টারও চোখে পড়বে। ইট, পাথর আর যান্ত্রিক শহরে চোখের প্রশান্তিও আজ হারিয়ে যাচ্ছে। শরীরের সুন্দর ত্বক যেমন সুস্বাস্থ্যের প্রতিফলন, তেমনি রাজধানীর চারপাশের পরিবেশও ঢাকার সৌন্দর্যের প্রতিফলন। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে এ সৌন্দর্য পুনরুদ্ধার করতেই হবে।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরা ঢাকার সৌন্দর্য এখনো রক্ষা করতে পারিনি, জোরালো পদক্ষেপও নিইনি। আইন থাকলেও কার্যকর হয়নি। ‘দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২’ গেজেট প্রকাশের এক দশকেও আইনের শতভাগ প্রয়োগ দেখা যায়নি কোথাও। সম্প্রতি পোস্টার লাগানো নিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসে ‘পোস্টার বয়’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠা জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রেসিডিয়াম সদস্য সাইফুদ্দিন মিলন। অবৈধভাবে যেখানে-সেখানে পোস্টার লাগানো থেকে বিরত থাকতে এবং লাগানো পোস্টার নিজ খরচে অপসারণ করার জন্য নোটিস দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।

রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিএনসিসির এ নোটিস খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। কারণ শহরজুড়ে যত পোস্টার চোখে পড়বে তার সিংহভাগই রাজনৈতিক পোস্টার। সম্প্রতি মেট্রোরেলের বিভিন্ন স্থাপনায় পোস্টার লাগানো নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে গণমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়। সেখানে ‘পোস্টার মিলন’খ্যাত এ জাপা নেতার পোস্টারসহ বিএনপি, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিজেপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও তাদের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের পোস্টার দেখা গেছে। রাজনৈতিক প্রচারণায় পোস্টার হয়তো ভ্যালু যুক্ত করে কিন্তু পরিবেশবান্ধব পরিচ্ছন্ন নগরী আর সৌন্দর্যের নিরিখে যত্রতত্র পোস্টর নগরবাসীর কাছে বিরক্তির কারণ হয়ে ওঠে। সরকার ২০১২ সালে ‘দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২’ প্রণয়ন করে। এ আইনের ধারা ৪ অনুযায়ী নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্য কোনো স্থানে দেয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাবে না, কিন্তু এ আইন মেনে কেউ পোস্টার লাগান না।

শুধু জাপা নেতা সাইফুদ্দিন মিলন নয়, ‘দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২-এর পূর্ণ বাস্তবায়নে অবৈধভাবে যেখানে-সেখানে পোস্টার লাগানো প্রত্যেক রাজনৈতিক নেতাকে এ নোটিস দিয়ে তার বাস্তবায়ন করা গেলে রাজধানীর সৌন্দর্য কিছুটা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এছাড়া চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, কোচিং সেন্টার, বাসাভাড়া, সিনেমার বিজ্ঞাপন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পোস্টারের পাশাপাশি রয়েছে দেয়াল লিখনও। সবাইকেই আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন সময় পোস্টার অপসারণ করলেও কয়েকদিনের মধ্যেই আবার ছেয়ে যায় পোস্টারে। তাই শুরুটা রাজনীতির মাঠ থেকেই করতে হবে, তাহলে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আইন মেনে চলতে উৎসাহী হবে। কারণ যারা জনপ্রতিনিধি তারাই যদি প্রচলিত আইন তোয়াক্কা না করেন, তাহলে সাধারণ মানুষও আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলতে চাইবে।

জনপ্রতিনিধিদের নিজ পোস্টার অপসারণে অন্তত একদিন হলেও সরাসরি সম্পৃক্ত করা উচিত। সেটা পোস্টার আইনের প্রয়োগ কিংবা জনপ্রতিনিধিদের নিজ ইচ্ছায়ও হতে পারে। এতে একদিকে যেমন সামাজিক চাপ তৈরি হবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও সাড়া ফেলবে। ভবিষ্যতে এ জনপ্রতিনিধি পোস্টার লাগানোর আগে অন্তত একবার হলেও ভাববেন যত্রতত্র পোস্টার লাগানো যাবে না। সতর্ক হবেন অন্যরাও। 

দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইনের ধারা-৪-এ বলা হয়েছে, কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দেয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানোর জন্য প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে স্থান নির্ধারণ করে দিতে পারবে এবং নির্ধারিত স্থানে দেয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাবে। তবে শর্ত থাকে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে, উল্লিখিত নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্য কোনো স্থানে বিধি দ্বারা নির্ধারিত শর্ত ও পদ্ধতিতে এবং নির্দিষ্ট ফি প্রদান সাপেক্ষে দেয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাবে।

এছাড়া অপরাধ ও দণ্ড বিষয়ে আইনের ধারা-৬-এর উপধারা-২-এ বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ধারা ৩ ও ৪-এর বিধান লঙ্ঘন করে দেয়াল লিখন বা পোস্টার লাগালে সে অপরাধের জন্য ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিম্নে ৫ হাজার টাকা এবং ঊর্ধ্বে ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হবে। অনাদায়ে ১৫ দিন পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ডও দেয়া হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া উপধারা-৩-এ বলা হয়েছে, কোনো সুবিধাভোগীর অনুকূলে ধারা-৩ ও ৪-এর বিধান লঙ্ঘন করে দেয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো হলে উক্ত অপরাধের জন্য ওই সুবিধাভোগীর বিরুদ্ধে নিম্নে ১০ হাজার টাকা এবং ঊর্ধ্বে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হবে। এছাড়া অনাদায়ে ৩০ দিন পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়ার বিধানও রয়েছে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে। 

গত শনিবার শহরের সৌন্দর্য রক্ষায় এবং স্মার্ট সিটি গড়ে তোলার লক্ষ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্রতিটি ওয়ার্ডে পোস্টার লাগানোর স্থান নির্দিষ্ট করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে নির্দিষ্ট স্থানেই কেবল পোস্টার লাগানো যাবে। অন্য কোনো স্থানে কেউ পোস্টার লাগাতে পারবে না। নির্দিষ্ট স্থানের বাইরে অবৈধভাবে পোস্টার ও ব্যানার লাগালে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন যদি এমন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারে তাহলে হয়তো খুব শিগগিরই পোস্টারের রাজধানী থেকে স্মার্ট নগরী গড়ার যে প্রত্যয়, তাতে এক ধাপ এগিয়ে যাবে এ শহর।

 

শফিকুল ইসলাম: সাংবাদিক