নবনির্বাচিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় ফেরার পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে পুনরায় কার্যকর ও সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত দেশটির প্রধান তিনটি পররাষ্ট্র নীতিসংক্রান্ত বিষয়ের সঙ্গে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। গুরুত্ব ক্রমানুযায়ী সেগুলো হলো চীন, চীন এবং চীন।
বাইডেনের জন্য উভয়সংকট হলো, চীন এতটাই বড়, অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং এতটা সংযুক্ত যে একে বাদ দেয়া বা উপেক্ষা করা সহজ নয়। কাজেই চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পৃক্তির মূলনীতি কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে নতুন করে ভাবনা-চিন্তা করা জরুরি। দুই দশক আগে যুক্তরাষ্ট্র এবং বাকি বিশ্ব চীনকে বলেছিল যে ধনী রাষ্ট্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে দেশটিকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে উন্মুক্ত হতে হবে। ২০০১ সালে ডব্লিউটিওতে চীনের অন্তর্ভুক্তি বিষয়ক চুক্তির মাধ্যমে বিশ্ব চীনা রফতানির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বিপরীতে বলা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক নিয়ম-বিধি পরিপালনের মাধ্যমে চীন তার অর্থনীতিকে আরো উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ করবে। কিন্তু চীন তার প্রতিশ্রুতি তো রাখেইনি, বরং আরো রক্ষণশীল নীতি গ্রহণ করেছে। ফলে দেশটি কেবল ধনী নয়, আরো বড় ট্রেডারে পরিণত হতে সমর্থ হয়েছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের অধীনে চীন দেং জিয়াপিংয়ের তিনটি শাসন-পরিচালন নীতি প্রত্যাখ্যান করেছে। এক. অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সামষ্টিক নেতৃত্ব নিশ্চিত, দুই. স্থিত-ধীর অর্থনৈতিক উন্মুক্ততা ও বাজারশক্তির ওপর নির্ভরতা এবং তিন. বাকি বিশ্বের সঙ্গে নিবিড় সহযোগিতা। তার পরিবর্তে শির নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা অভ্যন্তরমুখী, রাষ্ট্রচালিত পুঁজিবাদের একটি নতুন ব্র্যান্ড উপস্থাপন করছে। একই সঙ্গে দেশটি তাইওয়ান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, জাপানসহ অনেক প্রতিবেশীর জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে।
অন্য কথায় বলা যায়, বিশ্ব চীনের কাছে হেরে গেছে। যেখানে বাণিজ্য চুক্তি (উদাহরণস্বরূপ মুদ্রা ও মেধাস্বত্ব সম্পর্কিত) মেনে চলার কথা, সেখানে দেশটি এর মর্মবাণী (স্পিরিট) লঙ্ঘন করেছে। কাজেই বাইডেন প্রশাসন এবং বাকি বিশ্বের উচিত পুরনো বাণিজ্য চুক্তির নবায়ন করা এবং এ বিষয়ে চীনের সঙ্গে পুনঃআলোচনা করা।
এটিও সত্য যে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যদের চীনের অর্থনৈতিক উত্থান বাধাগ্রস্ত করার কোনো অধিকার নেই। কেননা দেশটির ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন নাগরিক নিজেদের সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার পথ নিজেরা বেছে নেয়ার অধিকার রাখে। রাষ্ট্র ও বাজারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে একইভাবে নিজস্ব উন্নয়ন মডেল পছন্দ করার অধিকারও চীনের আছে।
এসব কারণে পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সংগতি রেখে যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য চীনের সঙ্গে তার কয়েক দশক পুরনো বাণিজ্য চুক্তি নবায়ন করতে পারে, হালনাগাদ করতে পারে। চীন যত বেশি নিয়ম-নীতি মেনে চলবে, এ ধরনের নবায়ন থেকে তার সঙ্গে বাণিজ্যে যুক্ত উন্নয়নশীল দেশগুলো তত লাভবান হবে।
স্টার্টারদের জন্য চীন আর কোনো দরিদ্র দেশ নয়, কিন্তু বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতির অধীনে চীন এখনো উন্নয়নশীল দেশের স্ট্যাটাস ভোগ করে, যার কারণে দেশটি এখনো বিশেষ কিছু সুযোগ-সুবিধা পায়। প্রথমত, এই স্ট্যাটাস অবশ্যই প্রত্যাহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিশেষ করে ২০০৪ থেকে ২০১০ পর্যন্ত অন্যের জন্য ক্ষতিকর বিনিময় হার নীতি গ্রহণের মাধ্যমে (যা কৃত্রিমভাবে দেশটির অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রেখেছে) মূল চুক্তির স্পিরিট থেকে চীন বিচ্যুত হয়েছে। সমস্যাটি কিছুদিনের জন্য দূরীভূত হয়েছিল, কিন্তু ফের সেটি শুরু হচ্ছে। বিশ্বকে অবশ্যই বিনিময় হার কারসাজির ওপর নীতিমালা বিধিবদ্ধ করা এবং তার সফল প্রয়োগের মাধ্যমে সেটি মোকাবেলা করতে হবে। তদুপরি যেখানে (যেমনটা চীনে) রাষ্ট্র ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেদরেখা অস্পষ্ট, সেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক বৈদেশিক মুদ্রা কেনার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে ‘অত্যধিক’ হস্তক্ষেপের সংজ্ঞা বিস্তৃত করা জরুরি।
তৃতীয়ত, ২০০১ সালের চুক্তিতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর (এসওই) বিষয়ে চীনের ওপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছিল। কিন্তু শি জিনপিংয়ের অধীনে চীনা রাষ্ট্র যেহেতু আরো বড় প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক ভূমিকা পালন করছে, সেহেতু এসব নীতিমালা সংশোধন, কঠোর ও আরো বেশি ন্যায়নিষ্ঠ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। বহির্মুখী চীনা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার থেকে এসওইগুলো পৃথক—চীনের এ দাবি বিশ্বের সন্দেহজনকভাবে বিবেচনা করা উচিত, কারণ শেষোক্তটি বাণিজ্যিক মূলনীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। এটা প্রমাণে সাক্ষ্য-সাবুদের ভার চীনের ঘাড়েই নিতে হবে। অভ্যন্তরমুখী বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য হতে হবে আরো বেশি সমান ক্ষেত্র নিশ্চিত করা। অতএব, নতুন নীতিমালায় কেবল প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রীয় নীতি নয়, এসওইগুলোর ব্যাপারে পদক্ষেপ, চীন সরকারের ক্রয়নীতি, চর্চা প্রভৃতি বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
তবে বাইডেনকে প্রথমে অবশ্যই চীনকে চুক্তি বিষয়ে পুনঃআলোচনায় রাজি করাতে হবে। চীনা আমদানির ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের একপক্ষীয় শুল্ক আরোপ তাত্ক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার এক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে। সংস্থাটির নতুন মহাসচিব নিয়োগে নিজস্ব পছন্দের অনুমোদন দিয়ে এবং এর আপিল বিভাগ পুনরায় ফিরিয়ে এনে বাইডেন প্রশাসন ডব্লিউটিওর দ্রুত সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা পেতে পারে। তদুপরি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো চীনের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় যোগ দেয়া এবং বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের নেতৃত্বে পশ্চিমা আধিপত্য অবসানের ইচ্ছা প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র পরিবর্তনের সংকেত দিতে পারে। পরিবেশ উন্নয়নের বাইরে বাইডেনকে অবশ্যই একপক্ষীয়, বহুপক্ষীয়, আঞ্চলিকসহ কৌশলগত সুযোগগুলো বিবেচনায় রাখতে হবে। এমনকি ট্রাম্পের কট্টর নীতির বাইরে গিয়ে বাইডেন চীনের সঙ্গে অধিকতর উদার নীতি গ্রহণ করতে পারে।
পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের চাদ বাউন যেমনটা দেখিয়েছে, ট্রাম্পের কৌশল ব্যর্থ হয়েছে প্রধানত চীনের ওপর বিশ্বের অত্যধিক নির্ভরতার কারণে। ফলে দেশটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞামূলক বাণিজ্য পদক্ষেপ তারা গ্রহণ করেনি। আর এ ধরনের পদেক্ষেপে সাফল্য এলেও তা হবে বিপুল ক্ষতির বিনিময়ে। অর্ধশতকের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় চিড় ধরিয়ে এ ধরনের পদক্ষেপ বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সংহতি-ঐকতান ধ্বংস করবে। ডব্লিউটিওকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে চীনের সঙ্গে পুনরায় আলোচনার জন্য বাইডেনের বহুপক্ষীয় সুযোগ আছে, যা আগে ব্যাপকতরভাবে ম্লান হয়েছে এর (পড়ুন ডব্লিউটিও) প্রতি ট্রাম্পের বিরাগের কারণে। আরো বড় ব্যাপার হলো, ডব্লিউটিওর তাত্পর্যপূর্ণ সদস্য হিসেবে চীনকেও যেকোনো পরিবর্তনের জন্য সম্মত হতে হবে।
অতএব, বাইডেন প্রশাসনকে অবশ্যই আঞ্চলিক পথও বিবেচনায় রাখতে হবে, ২০১৭ সালে আন্তঃপ্রশান্ত মহাসাগরীয় চুক্তি (টিপিপি) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করার মাধ্যমে যা ট্রাম্প পরিত্যাগ করেছিল। নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট কম্প্রিহেনসিভ অ্যান্ড প্রগ্রেসিভ এগ্রিমেন্ট ফর ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপে (সিপিটিপিপি) পুনরায় যোগ দিলে বাকি এশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র আরো গভীরভাবে একীভূত হতে পারবে। ফলে চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতাও অনেকাংশে কমানো যাবে। এ কৌশলের প্রধান কিছু সুবিধাও রয়েছে। এটি একটি বড় বাণিজ্য ক্ষেত্র সৃষ্টি করবে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য আরো সহায়ক হবে। আবার এ ধরনের পদক্ষেপ চীনের ভেটো প্রদানের কারণও হবে না। প্রকৃতপক্ষে এটি সম্ভবত আলোচনার টেবিলে চীনকে আনতে পারে। কারণ এ ধরনের বড় বাজার চীন হাতছাড়া করতে চাইবে না। কিন্তু সিপিটিপিপিতে যোগদান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুব একটা মসৃণ হবে না। এজন্য যুক্তরাষ্ট্রকে আরো বাণিজ্য উন্মুক্ততার নীতি গ্রহণ করতে হবে, যা দেশটির বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিবেশে সম্ভব না-ও হতে পারে।
রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ, প্যান-এশিয়ার ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টে চীনসহ কিছু দেশের কিছুদিন আগে শেষ হওয়া সই প্রদান অনুষ্ঠান এখানে প্রস্তাবিত অ্যাপ্রোচের চেয়ে মনে হয় ভিন্ন অ্যাপ্রোচের সংকেত দিতে পারে। তবে চীনের চেয়ে এশিয়ার অন্য দেশগুলোর সুযোগ আপেক্ষিকভাবে বেশ কম। তারা এর (পড়ুন চীন) সঙ্গে অধিক নির্ভরশীল এবং একীভূত। তদুপরি ২০১৭ সালে টিপিপিতে যোগ দিতে ট্রাম্পের আকস্মিক প্রত্যাখ্যান দেশগুলোকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সামলানোর ক্ষেত্রে বিপাকে ফেলে দিয়েছিল। ট্রাম্পের প্রত্যাখ্যানের পর এবং চীনের অব্যাহত ইতিবাচকতা বিবেচনায় নিয়ে এশিয়ার দেশগুলো দেশটির সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে কিংবা গোপনে হয়তো আশা করবে যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বিনির্মাণ করুক। চীনের ব্যাপারে বাইডেনের কোনো ধরনের বিভ্রান্তি থাকা উচিত নয়। দেশটি এত গুরুত্বপূর্ণ যে একে উপেক্ষা করা কঠিন হবে। কিন্তু দেশটি যে চ্যালেঞ্জ হাজির করেছে তা সমাধান করাটাও অত সহজ নয়। এ সমস্যার সমাধান করতে হলে যুক্তরাষ্ট্র এবং বাকি বিশ্বকেও দীর্ঘ সংস্কারের পথে হাঁটতে হবে বৈকি।
[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
অরবিন্দ সুব্রামানিয়ান: ভারত সরকারের সাবেক প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, অশোক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং “একলিপ্স: লিভিং ইন দ্য শ্যাডো অব চায়না’স ইকোনমিক ডমিন্যান্স”-এর গ্রন্থপ্রণেতা
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির










