রেলের বরাদ্দ দফায় দফায় বাড়ছে,
কিন্তু বাড়ছে
না গতি ও কাঙ্ক্ষিত
সেবার মান। বর্তমান সরকারের
সময় রেলে অনেক উন্নয়ন
প্রকল্প নেয়া হয়েছে। তবে বাস্তবায়নে অনিয়ম-দুর্নীতি আর অদক্ষতার কারণে
সুফল মিলছে
না। রেলে আমূল পরিবর্তন
আনার লক্ষ্যে
৩০ বছর মেয়াদি (২০১৬-৪৫) রেলের
মহাপরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে
সরকার। ৬ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে
২৩০টি প্রকল্প
বাস্তবায়নের মাধ্যমে
রেলকে পরিবহনের
গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমে
পরিণত করতে কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়। কিন্তু প্রথম
ধাপে ২০১৬-২০ মেয়াদে
বাস্তবায়ন পরিকল্পনায়
থাকা ৮৩ প্রকল্পের একটিও
বাস্তবায়ন হয়নি।
ফলে রেলের
পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
দেশের যোগাযোগ
ব্যবস্থার অন্যতম
মাধ্যম হলো রেলওয়ে। অথচ দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অবহেলার শিকার
হয়ে আসছিল
রেলওয়ে। আওয়ামী
লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন
হয়ে রেলের
দিকে দৃষ্টি
ফেরায়। স্বতন্ত্র
মন্ত্রণালয় হয়েছে
রেলওয়ে, যা দেশবাসীকে খুবই আশান্বিত করেছে,
এ কথা বলতেই হয়। তবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে
শ্লথগতি, সংশ্লিষ্ট
উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিবন্ধকতায় পড়ার খবর স্বভাবতই
হতাশ করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী
সময়মতো প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে সত্যিকার
অর্থে রেল যোগাযোগে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন
ঘটবে। তার সুফল পড়বে দেশের সার্বিক
অগ্রগতিতে। সব দিক বিবেচনায়
নিয়েই প্রয়োজনে
প্রকল্পগুলো তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করা যেতে পারে।
এক্ষেত্রে সব সীমাবদ্ধতা অতিক্রম
করে রেল উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে গতি আসুক, এটাই সবার প্রত্যাশা।
গত কয়েক বছরে রেলওয়েতে বড় বড় বিনিয়োগ
হচ্ছে। কিন্তু
সেগুলোর মধ্যে
সমন্বয়ের একটা বড় ঘাটতি
আছে। কোন কাজটি আগে করতে হবে, কোনটি পরে হবে তা সঠিকভাবে নির্ধারণ
করা হচ্ছে
না। ফলে বিপুল বিনিয়োগে
রেলসেবার মান বাড়েনি। টিকিটসংক্রান্ত জটিলতা কমেনি। রানিং
টাইমেও উন্নতি
নেই। রেলে নতুন বগি, ইঞ্জিন দরকার।
রেলপথের সংস্কার
ও নিয়মিত
রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন।
নতুন বিনিয়োগ,
অবকাঠামোও দরকার।
কিন্তু সবার আগে দরকার
দক্ষ জনবল।
রেলে এখন জনবলেরই ঘাটতি
আছে। সেটা আগে পূরণ করতে হবে। আমরা এখন যে দুর্ঘটনাগুলো দেখি, সেগুলো মূলত পরিচালন কিংবা
রক্ষণাবেক্ষণ ঘাটতির
কারণে দুর্ঘটনা।
চালকের ভুল কিংবা সিগন্যাল
সিস্টেমের ত্রুটির
কথাও উঠে আসছে। এ সবকিছুই কিন্তু
পরিচালনাসংক্রান্ত বিষয়, অবকাঠামো নয়। তার মানে এখানে দক্ষ জনশক্তি দরকার।
কিন্তু সেখানে
বিনিয়োগ নেই। এ মুহূর্তে
রেললাইনের সংস্কার,
ঝুঁকিপূর্ণ সেতু মেরামত ইত্যাদি
কাজে নিয়মিত
ব্যস্ত থাকার
কথা। কিন্তু
রক্ষণাবেক্ষণের এসব কাজে বাজেট
কম। রেলের
আজকের এ অবস্থার জন্য প্রধানত তিনটি
বিষয় দায়ী।
প্রথমত, প্রতিষ্ঠান
হিসেবে রেলের
সক্ষমতার যথেষ্ট
ঘাটতি রয়েছে।
যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াতের জন্য সংস্থাটি
এখনো উপযোগী
হয়ে উঠতে পারেনি। দ্বিতীয়ত,
সরকারের ভুল নীতি। অতীতের
সরকারগুলো রেলের
উন্নয়নের বদলে সড়কপথে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
দীর্ঘদিন উন্নয়নবঞ্চিত থাকার একটা শূন্যতা
রেল খাতে তৈরি হয়েছে,
যা থেকে এখনো রেল বের হতে পারেনি। তৃতীয়ত,
উন্নয়ন সহযোগীদের
কৌশলগত ভূমিকাও
রেলকে পিছিয়ে
দিয়েছে। ব্যবসায়িক
স্বার্থের কারণে
তারা সড়কপথের
উন্নয়নের জন্য আমাদের সহায়তা
করেছে, বঞ্চিত
হয়েছে রেল খাত। এ অবস্থা থেকে রেলকে বের করে আনতে হলে যাত্রী
পরিবহনের জন্য নগরকেন্দ্রিক রেল যোগাযোগ উন্নয়নে
প্রাধান্য দিতে হবে। মেট্রোরেল,
সাবওয়ে, লাইট রেলের মতো অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। আর পণ্য পরিবহনের জন্য দেশের সামগ্রিক
রেল নেটওয়ার্ক
যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে
হবে, যেন দেশের সিংহভাগ
পণ্য রেলপথে
পরিবহন করা সম্ভব হয়।
বিপুল
বিনিয়োগের পরও ফেরানো যাচ্ছে
না রেলের
হারানো গৌরব।
উল্টো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, ভুল নীতি ও উন্নয়ন
সহযোগীদের কৌশলী
ভূমিকা দেশের
রেলওয়ে খাতকে
ক্রমেই খাদের
কিনারে ঠেলে নিয়ে গিয়েছে।
বিপুল ব্যয়ে
রেলের ইঞ্জিন
কেনা হলেও অনেকগুলোরই মান নিয়ে প্রশ্ন
উঠেছে। বছরের
পর বছর ব্যবহার না করেই নষ্ট করা হয়েছে
এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স
প্ল্যানিং (ইআরপি)
সরঞ্জাম। যেখানে
সরকার সিদ্ধান্ত
দিয়েছে পর্যায়ক্রমে দেশের মিটার গেজ রেলপথ তুলে দেয়া হবে, সেখানে কেনা হচ্ছে ৪৫০ মিটার গেজ ওয়াগন। রেলপথ
নির্মাণ ও সংস্কার, স্টেশন
ভবন আধুনিকায়ন,
রোলিং স্টক সংগ্রহসহ বেশির
ভাগ প্রকল্পেই
এমন সুষ্ঠু
পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। এখনো পুরনো ইঞ্জিন-কোচ, নড়বড়ে
রেলপথ, ঝুঁকিপূর্ণ
সেতু, লোকবল
সংকট, যাত্রীসেবায় অব্যবস্থাপনা-অনিয়ম-দুর্নীতিসহ
নানা সমস্যা
রেলওয়েতে প্রকট।
রেলের জন্য যেসব প্রকল্প
নেয়া হচ্ছে,
তার সবই অবকাঠামোগত উন্নয়ন।
তবে গতি বাড়াতে প্রয়োজন
পরিচালনগত উন্নয়ন।
বিষয়টির দিকে নজর দেয়া হচ্ছে না। অথচ রেলকে
জনপ্রিয় করে তুলতে এটিকে
আগে গুরুত্ব
দেয়া উচিত ছিল। তাছাড়া
পরিচালনগত উন্নয়নের
জন্য প্রকল্প
বাস্তবায়নে ব্যয়ও
তুলনামূলক কম। কোনো পদক্ষেপের
পেছনে যদি সুষ্ঠু পরিকল্পনা
না থাকে তাহলে তাতে অর্থেরই কেবল অপচয় হয় না, এর সুফলও পায় না জনগণ।
বাংলাদেশ রেলওয়ের
হয়েছে সেই দশা। গত এক যুগে নতুন রেলপথ
ও স্টেশন
ভবন নির্মাণ,
সিগন্যালিং ব্যবস্থার
আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন
খাতে বিপুল
পরিমাণ অর্থ খরচ করেছে
সরকার। দুঃখজনকভাবে এত বিনিয়োগ সত্ত্বেও
যাত্রীসেবার মান বাড়েনি। শিডিউল
বিপর্যয়, দুর্ঘটনা,
অবকাঠামোগত দুর্বলতার
বিষয়গুলো কাটিয়ে
উঠতে পারেনি
সংস্থাটি। এর অর্থ হচ্ছে
যে লক্ষ্য
নিয়ে বিনিয়োগ
করা হয়েছে
তা অর্জিত
হয়নি।
বর্তমানে
জাপানের বাইরে
চীন, তাইওয়ান,
দক্ষিণ কোরিয়া,
জার্মানি, স্পেন,
ইতালি, বেলজিয়াম,
নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র ও স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশগুলোয়
উচ্চগতির রেল ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে কার্বন নিঃসরণ
কমিয়ে আনতে রেলসেবায় উন্নত
দেশগুলোও এখন ইঞ্জিনে ডিজেলের
ব্যবহার বাদ দিয়ে বৈদ্যুতিক
ইঞ্জিনে
রূপান্তরের পথে হাঁটছে।
কোনো দেশ গ্যাস ব্যবহার
শুরু করেছে।
বাংলাদেশও পরিবেশবান্ধব এমন পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে পারে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের
অধিকাংশ সেতুই
নির্মিত হয়েছে
ব্রিটিশ আমলে।
এসব সেতুর
বেশির ভাগই ঝুঁকিপূর্ণ-জরাজীর্ণ।
জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করা এসব সেতুর
ওপর দিয়েই
চলছে ট্রেন।
ফলে একটু উনিশ-বিশ হলেই ঘটছে দুর্ঘটনা। চলতি বছরের এ পর্যন্ত রেলওয়ের
দুটি অঞ্চলে
শতাধিক দুর্ঘটনা
ঘটেছে বলে জানা গিয়েছে।
অধিকাংশই লাইন মেরামতের অভাব, পুরনো বগি ও ইঞ্জিন
এবং মান্ধাতার
আমলের কাঠের
তৈরি স্লিপার
ভেঙে এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে
বলে তদন্ত
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ৭০-১০০ বছরের
কিংবা তারও বেশি পুরনো
সেতুগুলো শুধু ঝুঁকিপূর্ণই নয়, চরম আতঙ্কেরও
বটে। এছাড়া
স্টিল কিংবা
লোহার সেতুগুলো
আরো ঝুঁকিপূর্ণ। লাইনে পাথর না থাকা, সিগন্যাল
ব্যবস্থার ত্রুটি,
লাইন ক্ষয়, স্লিপার নষ্ট, লাইন ও স্লিপার সংযোগস্থলে
লোহার হুক না থাকাসহ
ইত্যাদি কারণে
দুর্ঘটনা বেড়েছে।
সারা বিশ্ব
রেলকে প্রধান
মাধ্যম হিসেবে
বিবেচনায় নিয়ে গড়ে তুলছে
যোগাযোগ ব্যবস্থা।
শুধু দীর্ঘ
লাইন নির্মাণই
নয়, পাতাল
রেল, রোপ ট্রেন, শাটল ট্রেনসহ নানা ধরনের ট্রেন
দিয়ে বিশ্বের
প্রায় সব দেশই ইন্টারসিটি,
ইন্টারপ্রভিন্স ও ইন্টারকান্ট্রি যোগাযোগ
ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। কোনো দেশে আবার বিমানের গতির সঙ্গে পাল্লা
দিয়ে চালু করা হয়েছে
দ্রুতগামী ট্রেন।
পৃথিবীর কোনো দেশেই রেল উপেক্ষিত নয়, বরং রেলের
অগ্রগতিতে বেশি মনোনিবেশ করা হয়েছে।
রেলের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে শুধু অর্থ ব্যয়কেই বড় করে দেখা হয়েছে। অধিকাংশই অবকাঠামোগত প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, ব্যবস্থাপনাগত বা জনবলগত উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হয়নি। এসব বিনিয়োগের অর্থ সুদে আসলে ফেরত দিতে হবে। সেটি দিতে গিয়ে যেন সরকারকে চাপে পড়তে না হয়, সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। এটি তখনই হবে যখন বিনিয়োগ থেকে দ্বিগুণ রিটার্ন আসবে। এটিও বিবেচনায় রাখতে হবে বাংলাদেশের সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। রেলে বিনিয়োগ করতে গিয়ে সরকারকে অন্যত্র বিনিয়োগ স্থগিত রাখতে হচ্ছে। ফলে বিনিয়োগের রিটার্ন কম হলে তা সরকারের বোঝায় পরিণত হবে। ভ্রান্ত পরিকল্পনার কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সরকারের বোঝায় পরিণত হয়েছে। রেলের ক্ষেত্রে একই অবস্থা হোক, তা কারো কাম্য নয়। এত বোঝা বাংলাদেশের অর্থনীতির পক্ষে বহন করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই সময় থাকতেই রেলের গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন, যেখান থেকে পর্যাপ্ত রিটার্ন আসবে।










