আমি ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই। আমরা মফস্বল শহরের মেয়ে, ঢাকায় এসেছি। মনের মধ্যে এক ধরনের ভয়-ভীতি কাজ করছে। রেজাল্ট ভালো থাকায় আমি খুব আশাবাদী ছিলাম। যখন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হতে গেলাম, তখন দাপ্তরিক ছিলেন নজরুল ইসলাম ভাই। আমি গিয়েছিলাম আমার ভাইয়ের সঙ্গে। তিনি আমার ভাইকে বললেন, আপনার বোন এমনিতেই ভর্তি হতে পারবেন। এরপর ভর্তি হয়ে গেলাম। তখন অনার্স কোর্স  ছিল তিন বছরের। আর এমএ এক বছরের।

আমরা যারা প্রথম বর্ষে পড়তাম, তাদের জন্য সবচেয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের ক্লাস নিতে দেয়া হতো। ওই সময় রাষ্ট্রবিজ্ঞানে দুটো সেকশন করা হলো, কারণ ছেলেদের চেয়ে আমরা মেয়েরা বেশি ভর্তি হয়েছিলাম। সে সময় একদিন আমরা শুনলাম যে অধ্যাপক রওনক জাহান আসবেন, যিনি আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। আমরা তো ভয়ে জড়োসড়ো। আমেরিকা কোথায় তা আমরা শুধু ম্যাপেই দেখেছি। তিনি সেখান থেকে পড়াশোনা করে এসেছেন। কী যে অবস্থা হবে—এসব ভাবছি। 

ক্লাস শেষে আমরা অপেক্ষা করছি। রওনক জাহান আপা এলেন। দেখলাম, তিনি একদম আমাদের মতোই, শাড়ি পরেছেন, চুলটা খোঁপা করা। ওই যুগে আমরা মেয়েরা বেশির ভাগই চুলে খোঁপা করতাম। আপা আমাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ তোমাদের কেমন লাগছে?’

একজন শিক্ষকের প্রধান কর্তব্য তার ছাত্রছাত্রীদের আপন করে নেয়া, তাদের সঙ্গে বন্ধুভাবাপন্ন আচরণ করা—আপা ঠিক এটাই করলেন। রওনক আপার প্রতি আমরা যে ধারণাটা করেছিলাম যে তিনি আমেরিকা থেকে পিএইচডি করে আসছেন, কত না জানি গম্ভীর হবেন, তার সঙ্গে কথা বলে সে ভয়টা আমাদের কেটে গেল। আমাদের তিনি বন্ধু করে নিলেন। আপা আমাদের বাংলাদেশ বিষয়ে পড়াতেন। শিক্ষকেরা ছিলেন আমাদের কাছে খুবই সম্মানীয়। মনে আছে, তারা যে পথ দিয়ে আসতেন, আমরা ওই পথে যেতামই না।

১৯৮০ সালে আমি বিলেত থেকে ফিরেছি। তখন আমরা রওনক আপাদের বাসার কাছাকাছি জায়গায় বাসা ভাড়া নিয়েছিলাম।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর একটি অনুষ্ঠানে আপা কথা বলবেন, সে আলোচনায় অংশ নেবেন আমার স্বামীও। আপা বললেন, আমি শওকতকে দেখব। তাঁর ছাত্রী হিসেবে এটা আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া। আমি আপার দীর্ঘায়ু কামনা করছি। আপা আরো বড় হোক। আপার নাম আরো ছড়িয়ে পড়ুক, এটাই আমার কামনা।

 

ড. শওকত আরা হোসেন: সাবেক অধ্যাপক

রাষ্ট্রবিভাগ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়