দেশে ২০১৮-১৯ সালে ১১ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে উৎপাদিত আউশ, আমন ও বোরো ধান থেকে মোট ৩৬ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন টন চাল হয়েছিল, আর ২০১৯-২০ সালে ১১ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে মোট চাল হয়েছিল ৩৮ দশমিক ৬৯ মিলিয়ন টন। অর্থাৎ গত এক বছরে ধান চাষ বেড়েছে ১ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং চাল উৎপাদন বেড়েছে ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ। ধান চাষের জায়গা ও উৎপাদন দুটোর বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীতে চাল উৎপাদনে ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন এবং ভারত। দেশের আয়তন বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান নিঃসন্দেহে ঈর্ষণীয়। এ অর্জনের প্রকৃত দাবিদার প্রথমত, দেশের কৃষকসমাজ; দ্বিতীয়ত, কৃষিসংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিজ্ঞানীরা এবং তৃতীয়ত, সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি। তাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দায় রয়েছে।

দেশে চালের মোট চাহিদা আনুমানিক ৩৩ মিলিয়ন টন, যা মোট জোগানের চেয়ে ৫ দশমিক ৬৯ মিলিয়ন টন কম (ব্রির তথ্য মোতাবেক ৫.৫ মিলিয়ন টন)। সুতরাং অর্থনৈতিক বিচারে দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই, তবে বিষয়টি চালের বাজার ও বিপণন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত বলে মনে হয়।

সরকারি তথ্য মোতাবেক গত বছর মোটা চালের কেজিপ্রতি দাম ছিল ৪২ টাকা। এ বছর তা এখনই ৪৬-৪৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সরকার দাম বেঁধে দিলেও সরু বা মিনিকেট চাল স্থানভেদে ৫৫-৬২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দরিদ্রদের মধ্যে ট্রাকে করে চাল বিক্রি বন্ধ এবং খোলাবাজারে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রিও এখন পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, ২০২০ সালে লক্ষ্যমাত্রা বেশি থাকলেও চাল ক্রয় করা হয়েছে আট লাখ টন। সরকারের বর্তমান মজুদ ১১ লাখ টনের একটু বেশি, যা গত বছরের তুলনায় পাঁচ লাখ টন কম। ধানের দাম কেজিতে ৭ টাকা বেড়েছে, যা আগে ছিল ২০ টাকা। সে কারণে মিল মালিকরা কেজিপ্রতি ৪৬ টাকা দরে সরকারকে চাল দিতে চাইছে। সারা বাংলায় প্রকাশিত মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী চালকল মালিকরা মৌসুমে কম দামে ধান কিনে চাল তৈরিতে ২৭ দশমিক ৮৬ টাকা খরচ হয়। অন্য সময় সর্বোচ্চ দাম বিবেচনায় খরচ হয় কেজিপ্রতি ৩৫ দশমিক ৮০ টাকা। গড় হিসাবে চালকল মালিকদের কেজিপ্রতি চাল উৎপাদন খরচ ৩২ দশমিক ৩৪ টাকা। মিল মালিকদের কাছ থেকে সরকার ৩৬ টাকা কেজি দরে চাল কেনার কথা। সুতরাং গড় খরচ বিবেচনায় চালকল মালিকদের ৪৬ টাকা কেজিদরে সরকারকে চাল দেয়ার দাবি স্পষ্টতই অতিরিক্ত মুনাফার ইঙ্গিত দেয়।

সুতরাং চালকল মালিকদের মতে, চালের বাজারদর বৃদ্ধির কারণগুলো হচ্ছে: (ক) উত্তরবঙ্গ থেকে ধান কিনে আনায় পরিবহন খরচ বেশি; (খ) ধানের বাজারদর সরকারিভাবে নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে, যা অপেক্ষাকৃত বেশি; (গ) বন্যা, ঘূর্ণিঝড় আম্পান, করোনা পরিস্থিতিতে পরিবহন ও শ্রমিক খরচ বেশি; (ঘ) বর্তমানে ধানের বাজারদর মণপ্রতি ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা হওয়ায় কেজিপ্রতি ৫৪ টাকার নিচে চাল বিক্রি করলে চালকল মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন; (ঙ) কৃষক, পাইকারি, ফড়িয়া পর্যায়ে ধানের মজুদ বৃদ্ধি; (চ) কৃষকদের সরকারের সহায়তা কর্মসূচির আওতায় সুবিধা দেয়ার বিষয়টিকে দায়ী করা; (ছ) দাম বাড়তে পারে এমন আশঙ্কায় অনেকে ধান-চাল ধরে রেখেছে প্রভৃতি কারণে চালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ার কোনো বিশেষ যৌক্তিকতা পাওয়া যায় না।

চালের দাম বাড়ার অন্য যে কারণগুলো পরিলক্ষিত হয় সেগুলো হলো: ১. চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ হওয়ার কথা, কিন্তু সাপ্লাই চেইনের কোথাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে; ২. কৌশলে ধাপে ধাপে দাম বাড়ানোর প্রবণতা; ৩. ডিজিটাল পদ্ধতির বদৌলতে চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীদের ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে অতিমাত্রায় সংগঠিত হওয়ার প্রবণতা; ৪. সরকার গুদামের স্বল্পতা দেখিয়ে ধান মজুদ না করে চালকল মালিকদের কাছ থেকে চাল কিনে নির্ভরশীলতা বাড়ানো; ৫. করোনা, ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বন্যায় ত্রাণ হিসেবে মোটা চাল বিতরণ করায় বাজারে মোটা চালের ঘাটতি; ৬. বাজার, সাপ্লাই চেইন ও বিপণন ব্যবস্থাপনায় গবেষণার অপ্রতুলতা; ৬. কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দৌরাত্ম্যের প্রভাব প্রভৃতি।

চালের দাম সহনীয় পর্যায়ে আনতে মোটা চাল আমদানির প্রয়োজন হতে পারে এবং তার জন্য করণীয় বিষয়ে সরকার কাজ করছে বলে মন্তব্য করেছেন মাননীয় কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য মোতাবেক এবারের বন্যায় ৩৭ জেলায় আনুমানিক ১২ লাখ ৭২ হাজার ১৫১ জন কৃষকের প্রায় ১ হাজার ৩২৩ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। সরকার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আর্থিক সুবিধা দিয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের আবারো উপকরণ বা আর্থিক সহায়তা করা প্রয়োজন।

চালের বাজারদর নিয়ন্ত্রণে মোটা চাল আমদানির পরিকল্পনা একটি ভালো পদক্ষেপ, বাজারদর নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য চালকল মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে দাম বেঁধে দেয়ার পদক্ষেপও প্রশংসনীয়। তবে বাজেটে বরাদ্দকৃত ভর্তুকির টাকা সময়মতো ছাড় ও যথাযথ ক্ষেত্রগুলোয় প্রদান করা প্রয়োজন, যাতে কৃষি উৎপাদন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়। করোনার মহামারী প্রভাব ও চালের দাম কমিয়ে রাখতে কাজের বিনিময়ে (চালের মাধ্যমে) খাদ্য কর্মসূচির আওতা বাড়ালে দরিদ্রশ্রেণীর মানুষ উপকৃত এবং গ্রামীণ অবকাঠামোরও উন্নয়ন হবে বলে অনেক অর্থনীতিবিদের অভিমত।

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য হিসেবে চালের বাজারদর সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে যেসব পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে তা হলো:

১. চালকল মালিকদের সঙ্গে চুক্তি মোতাবেক যথেষ্ট পরিমাণ চাল সংগ্রহ করে সে চাল ওএমএস বা খোলাবাজারে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিক্রির ব্যবস্থা করলে বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে; ২. মোটা চালের সরবরাহ বাড়িয়ে খোলাবাজারে চাল বিক্রির ব্যবস্থা করে দাম সহনীয় রাখা, যাতে কম আয়ের মানুষ তাদের প্রয়োজনমতো ভাত খেতে পারে; ৩. সরু বা মিনিকেট চালের দাম একটু বেশি বা বর্তমান বাজারমূল্যে থাকলে সমাজের অপেক্ষাকৃত বিত্তশালীরা তাদের আয়ের একটু বেশি অংশ ভাতের জন্য খরচ করলে গ্রামীণ এলাকার কৃষকদের শ্রমে উৎপাদিত ধান থেকে আয় বেড়ে যাবে। এটি এক ধরনের ট্রেড অব, তবে কৃষকরা বাড়তি দামের সুবিধাভোগী হলে তাতে কারো তেমন আপত্তি থাকবে না; ৪. কেউ কেউ পরিকল্পিতভাবে চাল মজুদ করছেন কিনা, সে বিষয়ে কঠোর পর্যবেক্ষণে রাখা। যদি কেউ তা করেন তাহলে এমন শাস্তির ব্যবস্থা করা, যাতে অন্যরা এ ধরনের কাজ করতে সাহস না করেন; ৫. চালের বাজারদরের ক্ষেত্রে স্টেকহোল্ডার হচ্ছে কৃষক, সরকারের নীতি, বিজ্ঞানী, চালকল মালিক, ব্যবসায়ী সমাজ, পরিবহন মালিক, বন্যা-অতিবৃষ্টি-খরা, উৎপাদনের পরিমাণ, রাজনৈতিক পরিবেশ ইত্যাদি। চালকল মালিক, চাল ব্যবসায়ী ও সরকারি সংস্থার সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা ব্যতীত অন্যান্য স্টেকহোল্ডারের কোনো বৈরী আচরণ চালের বাজারদরকে প্রভাবিত করছে বলে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। সুতরাং করোনা পরিস্থিতিতে চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ে জড়িতরা তাদের সেবাধর্মী ব্যবসায় পেশাদারিত্ব বজায় রাখবেন, এটা সমাজের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা; ৬. চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে যেন তারা ইচ্ছাপ্রসূত সংগঠিত হয়ে বাজারদরকে খুব বেশি মাত্রায় প্রভাবিত না করেন এবং ৭. সরকারিভাবে ধান-চাল ক্রয় ও সংরক্ষণে কোনো ধরনের শিথিলতা বা গাফিলতি অবলম্বন করলে চালের বাজারদর নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে।

পরিশেষে, সরকারের কৃষিবান্ধব নীতির মাধ্যমে চাল উৎপাদনে ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে বিশ্বে তৃতীয় স্থানে উঠে আসার সংবাদ অত্যন্ত আশাব্যাঞ্জক। উৎপাদন অব্যাহত রাখার জন্য কৃষক যেন ভালো দাম পান, তার দিকে বিশেষ নজর রাখা দরকার। তাদের নির্ভেজাল সাফল্য যেন কিছু অপেশাদার চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীদের কূট কৌশলের কাছে ভূলুণ্ঠিত না হয়, সেটা সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথ উদ্যোগে নিয়মিত বাজার তদারকির মাধ্যমে শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করবে—এ প্রত্যাশা সবার। এ দেশের মানুষের প্রধান খাদ্যের উৎস চাল, যার বাজারদর কয়েক বছর ধরে (২০১৭ সাল থেকে) খুব বেশি মাত্রায় অস্থিতিশীল হচ্ছে, ফলে কোনো কোনো সময় বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষক আবার কোনো কোনো সময় ভোক্তা ও কৃষক উভয়েই ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। সরকারের কৃষিসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোয় ধান-চাল উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজার ও বিপণন ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সমন্বিতভাবে নিবিড় গবেষণা কার্যক্রম আরো জোরদার করা প্রয়োজন এবং সে মোতাবেক সময়মতো যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার, যাতে চালের বাজারদর সর্বদা স্থিতিশীল থাকে।

 

ড. মো. সাইদুর রহমান: অধ্যাপক, কৃষি অর্থনীতি বিভাগ পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব এগ্রিবিজনেস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়