বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে রফতানি বাণিজ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক্ষেত্রে কভিড-১৯ মহামারী এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের ধাক্কা মোকাবেলায় দেশের রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর রফতানি কার্যক্রম বেশ চ্যালেঞ্জিং অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গতিশীল রাখার লক্ষ্যে দেশের রফতানি খাতে সরকারের সহায়তা প্রদান জরুরি। সব মিলিয়ে চলমান বৈশ্বিক বিরূপ অর্থনৈতিক অবস্থার বিপরীতে রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিকতর অভিঘাত সহনশীল করার পাশাপাশি দেশের রফতানিমুখী শিল্পের বিকাশ ও প্রসারের চলমান ধারা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে এ খাতের জন্য পর্যাপ্ত তারল্য নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সহজ শর্তে একটি রফতানি সহায়ক প্রাক-অর্থায়ন তহবিল (ইএফপিএফ) গঠন করেছে।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, দেশের রফতানিকারকদের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশেষ এ তহবিলের নাম দেয়া হয়েছে ‘রফতানি সহায়ক প্রাক-অর্থায়ন তহবিল (ইএফপিএফ)।’ এ তহবিলের পুরো অর্থই কেন্দ্রীয় ব্যাংক জোগান দেবে। রফতানিকারকরা ৪ শতাংশ সুদে তহবিল থেকে ঋণ পাবেন। তবে একজন রফতানিকারক সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। ১ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জারীকৃত প্রজ্ঞাপনে বিশেষ এ তহবিলের নীতিমালা প্রকাশ করা হয়।

এতদিন রফতানিকারকদের জন্য রিজার্ভ থেকে গঠিত ‘রফতানি উন্নয়ন তহবিল’ বা ইডিএফ ছিল। এ তহবিল থেকে ব্যবসায়ীরা ডলারে ঋণসহায়তা নিতে পারতেন। কভিডের অভিঘাত থেকে রফতানি খাতকে সুরক্ষা দিতে সরকার ইডিএফের আকার সাড়ে ৪ বিলিয়ন থেকে বাড়িয়ে ৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করে। এখন ইডিএফ তহবিলের ওপর নির্ভরতা কমাতে ইএফপিএফ গঠন করা হলো।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বৈশ্বিক বিরূপ অর্থনৈতিক অবস্থার বিপরীতে রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিকতর অভিঘাত সহনশীল করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রফতানিমুখী শিল্পের বিকাশ ও প্রসারের চলমান ধারা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে এ খাতের জন্য পর্যাপ্ত তারল্য নিশ্চিত করতে ইএফপিএফ গঠন করা হয়েছে। এ তহবিল থেকে স্থানীয় রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানি বা স্থানীয় সংগ্রহের বিপরীতে প্রাক-অর্থায়ন সুবিধা নিতে পারবে।

দৃশ্যত বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার দাবি রাখে। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতায় এ প্রশ্নটিও এসে যায় যে রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থাকতে কেন রফতানি সহায়ক প্রাক-অর্থায়ন তহবিলের (ইএফপিএফ) প্রয়োজন হলো? রফতানি বাড়াতে স্বাধীনতার পর বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় মাত্র ১ কোটি ৫০ ডলার নিয়ে ইডিএফ গঠন করা হয়। দেশের রফতানি আয় বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রিজার্ভ থেকে সেই তহবিলের আকারও বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বর্তমানে এ তহবিলের আকার ৭০০ কোটি ডলার। ব্যাক টু ব্যাক এলসির আওতায় কাঁচামাল আমদানি সুবিধা বাড়াতে তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ, বিটিএমএ, নিট পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএসহ অন্য রফতানিকারক সংগঠনের সদস্যরা ইডিএফ থেকে ঋণ পেয়ে থাকেন। বিশেষ করে করোনা মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা বাধা-বিপত্তির মধ্যেও পোশাক রফতানিতে ভালো প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার ক্ষেত্রে ইডিএফ বেশ ভালো অবদান রেখেছে বলে এ খাতের ব্যবসায়ীরা মত দিয়েছেন।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে উঠে আসে ইডিএফ থেকে প্রদত্ত ঋণ কিছু রফতানিকারক অপব্যবহার করছেন। নির্ধারিত তারিখে ঋণদাতারা অর্থ প্রদানে ব্যর্থ হওয়ায় সেগুলো বিশাল ঋণে পরিণত হয়। এক্ষেত্রে ক্রেতারা অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এসব ঋণ থেকে কোনো রফতানি আয় হয়নি। মূলত তখন থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইডিএফ ঋণ প্রদানের পরিবর্তে টাকায় একটি রিফাইন্যান্স স্কিমের প্রকল্প বিবেচনা করে। সে ধারাবাহিকতায় ইএফপিএফ গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এক্ষেত্রে ইডিএফে যে ঋণখেলাপির ঘটনা ঘটেছে, সেক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ রিজার্ভ সংকটের ফলেই ইডিএফের পাশাপাশি নতুন তহবিল গঠনের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়। এখন ইএফপিএফেও যদি একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হয়, তাহলে দেশের আর্থিক খাতে আরেকটি নেতিবাচক অধ্যায় তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমে আমরা আশাবাদী। বিশেষ করে দেশের সংকটকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু ভূমিকা সত্যিকার অর্থে প্রশংসনীয়, কিন্তু ব্যাংক খাতে সুশাসনের ঘাটতি বারবার পরিলক্ষিত হওয়ায় এবং আর্থিক অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির যেসব অভিযোগ আমরা নিকট-অতীতে দেখতে পেয়েছি তাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরো সতর্ক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এছাড়া ঋণখেলাপি হওয়ার যে প্রবণতা রয়েছে, সেটিকেও বিবেচনায় নিয়ে নতুন এ তহবিলের অর্থ বণ্টন করতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী কোনো খেলাপি গ্রাহক বা গ্রাহক প্রতিষ্ঠানকে এ তহবিলের আওতায় ঋণ সুবিধা দেয়া যাবে না বলে প্রজ্ঞাপনে যে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে সেক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। না হলে যে উদ্দেশ্যে এ তহবিল গঠন করা হয়েছে তা কাঙ্ক্ষিত সফলতা পাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে ঋণ গ্রহণ ও ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যেসব শর্তের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো যথাযথ মানা হলে নতুন তহবিলকে প্রকৃত অর্থে কাজে লাগানো সম্ভব হবে -এ আশা করা যায়। 

আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য দেশের রফতানি বাজার ধরে রাখতে হবে। এজন্য কাঁচামাল আমদানিসহ প্রাক-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য তহবিল গঠনের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তার সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা জরুরি। এক্ষেত্রে যদি খেলাপি ঋণ এবং তহবিলের অপব্যবহারের দিকটিই ফুটে ওঠে তাহলে এ উদ্যোগও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আমরা রফতানিকারকদের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিলের ঋণ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য দেখতে চাই। ইডিএফের ক্ষেত্রে যেসব অসংগতি ও অস্বচ্ছতা দেখা গেছে, সেগুলো যেন ইএফপিএফের বেলায় না হয় আমরা সেটিই প্রত্যাশা করব। প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে বর্তমান সময়টা যেকোনো আর্থিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতিবিদদের ভাষ্যমতে এ সময়ে সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ না ফেললে সংকট অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। সে হিসাবে রিজার্ভ সংকট এড়াতে ডলারের পরিবর্তে টাকা ব্যবহারের যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে তার সফলতাই আমাদের কাম্য। এর সঙ্গে নতুন তহবিল ব্যবহার করার পাশাপাশি ইডিএফ যেন ক্রমে সংকুচিত না হয়ে যায় সেদিকেও সংশ্লিষ্টদের সতর্ক দৃষ্টি প্রয়োজন। সব মিলিয়ে আমাদের রফতানি খাত ভালো থাকুক, রেমিট্যান্স প্রবাহ অব্যাহত থাকার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পাক—এটিই আমাদের প্রত্যাশা।