চলতি বছর আর্থিক খাতের বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য যে তিনজন অর্থনীতিবিদ নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তারা সবাই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের ব্যবস্থাপনার সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেছেন। অর্থনীতিবিদ বেন এস বার্নেঙ্কি, ডগ্লাস ডব্লিউ ডায়মন্ড ও ফিলিপ এইচ ডিগবিগের বয়সই সত্তরের কাছাকাছি এবং এ বিষয়ে তাদের গবেষণার শুরু আশির দশকের প্রথম থেকে। শুধু উন্নত দেশের জন্যই নয়, স্বল্পোন্নত দেশের ব্যাংকিং খাতের ব্যবস্থাপনার নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও তাদের গবেষণা থেকে দিকনির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে।
এর আগেও আর্থিক খাতের বিশ্লেষণের জন্য ১৯৯৭ সালে দুজন এবং ২০১৩ সালে তিনজন অর্থনীতিবিদকে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তাদের সবারই গবেষণা ছিল শেয়ারবাজারের গতি-প্রকৃতি ও উত্থান-পতন নিয়ে। ওইসব বিশ্লেষণ শেয়ারবাজারের বিপর্যয় ঠেকাতে বা এ নিয়ে সঠিক পূর্বাভাষ দিতে খুব কাজে দেয়নি বলে মনে করা হয়। কারণ শেয়ারবাজারের কেনা-বেচার ধরন শুধু অর্থনীতির যৌক্তিক আচরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, যে কারণে স্নায়ু অর্থনীতি বা neuro-economics নামে নতুন ধারার অর্থনীতি নিয়ে এখন গবেষণা হচ্ছে।
কিন্তু এবারের নোবেল বিজয়ীদের কাজ আর্থিক খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে এবং তাদের বিশ্লেষণ অনেক বেশি বাস্তবমুখী, যা ব্যাংক ব্যবস্থার সম্ভাব্য ধস ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তারা যে বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন তার মধ্যে আছে ব্যাংক ব্যবস্থার প্রতি আমানতকারীদের আস্থার সংকট, ঋণ মঞ্জুর করার ব্যাপারে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার গুরুত্ব, ব্যাংকের তারল্য ও মূলধন ঘাতটির বিষয়ে সতর্কতা, সংকটাপন্ন ব্যাংককে বাঁচিয়ে রাখতে আমানতের ওপর যথেষ্ট অংকের বীমার ব্যবস্থা, এবং যথাসময়ে সতর্ক না হওয়ার খেসারত হিসেবে পরবর্তী সময়ে দেউলিয়া ব্যাংককে বাঁচাতে সরকারের বড় অংকের ব্যয়ের বোঝা বহন।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের জন্য এসব বিষয়েই সতর্কতা জরুরি। যতদূর মনে পড়ে আমাদের ব্যাংকগুলোয় গচ্ছিত আমানতপ্রতি মাত্র ১ লাখ টাকা বীমাকৃত। এরই মধ্যে ব্যাংকের দেউলিয়া হওয়া থেকে উদ্ধার করার ঘটনা দেখা গেছে, অনেক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার দক্ষতার ঘাটতি নিয়েও অনেক আলোচনা হয়েছে ও হচ্ছে, কিন্তু অবস্থার খুব উন্নতি হচ্ছে বলা যাবে না। ব্যাংকে টাকা আমানত রাখার তেমন কোনো বিকল্প নেই বলে ব্যাংক খাতের সমস্যা সহজে দৃষ্টিগোচর হয় না; কিন্তু যখন কোনো বিপর্যয় ঘটে, তখন তার জন্য পুরো অর্থনীতিকে অনেক মূল্য দিতে হয়। এবারের নোবেল পুরস্কার অনেক দেশের ব্যাংক ব্যবস্থাপনার জন্য হুঁশিয়ারি বার্তা বহন করে এনেছে।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ: অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা










