বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় যুক্ত হবে ২০২৬ সালে। ফলে এখন যেসব শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা মিলছে, সেগুলোর অধিকাংশই আর বাংলাদেশ পাবে না। কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে রফতানিকারকদের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রফতানি আয় ধরে রাখতে এবং তা বাড়াতে পণ্য বহুমুখীকরণ ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। মঙ্গলবার আয়োজিত একটি সেমিনারে অংশ নেয়া আলোচকরাও একই কথার পুনরুল্লেখ করেছেন। আর এটি অর্জন করতে হলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণ ও মান তদারকির জন্য শক্তিশালী সংস্থা থাকা জরুরি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, বাংলাদেশ থেকে রফতানি হওয়া বা রফতানিতব্য সব পণ্যের মান এখনো নির্ধারণ করা যায়নি। এমনকি দেশে শক্তিশালী মান নিশ্চিতকরণ প্রতিষ্ঠানও গড়ে ওঠেনি। উন্নত দেশগুলোতে এখনো দেশের মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার সনদ গ্রহণ করা হয় না। ফলে রফতানিকারকদের বিপুল অর্থ ও সময় ব্যয় করে বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে উৎপাদিত পণ্যের মান নির্ধারণ করাতে হয়। এ পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকার বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড আন্তর্জাতিক মান যাচাইয়ের অনুমতি প্রদানের স্বীকৃতি পেয়েছে। দেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে এরই মধ্যে মান যাচাইয়ের সনদ প্রদানের অনুমতিও দেয়া হয়েছে। তার পরও তাদের সনদ নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন উঠছে। তবে আশার কথা হলো, ইউরোপের কিছু দেশ এ সনদ গ্রহণ করে আমাদের কৃষি ও অপ্রচলিত পণ্যও আমদানি করছে। কিন্তু সম্ভাবনার পূর্ণ সদ্ব্যবহারের জন্য এটি যথেষ্ট নয়।
বিশ্বব্যাপী চলছে বাণিজ্যযুদ্ধ। সেখানে বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে নতুনত্বের সংযোজন ঘটিয়ে উন্নত মান ও গুণ সংরক্ষণপূর্বক নতুন পণ্যদ্রব্য উদ্ভাবন এবং অনেক সময় নতুন উৎপাদন পদ্ধতি উদ্ভাবন করে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজেদের অবস্থান সুসংহত রাখার আয়োজনের শেষ নেই। এজন্য মান নির্ধারণ ও তদারকির জন্য বাংলাদেশেও চাই শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে শিল্পায়নের চলমান ধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) মান নির্ধারণী কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া যায়নি। উন্নত দেশে সর্বোচ্চ যেসব চর্চা চালু রয়েছে, সেগুলো আমাদের অনুসরণ করতে হবে। ভারতে পণ্যের মান নির্ধারণের জন্য একাধিক সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের সনদ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতও। পণ্যের মানোন্নয়ন নিশ্চিত করতে ভারতের প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করে। বাংলাদেশও একই পথ অনুসরণ করতে পারে। অনেক পণ্যের মান পরীক্ষার সক্ষমতাও নেই বাংলাদেশের। সেক্ষেত্রে রফতানি পণ্যের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে হলে বিএসটিআইকে প্রথমে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। বৈশ্বিক মান নিশ্চিত করতে আধুনিক টেস্টিং ইকুইপমেন্ট ও ল্যাব সুবিধা বাড়ানো জরুরি। উন্নত দেশে পণ্য পরীক্ষার যে রীতি রয়েছে, সেটা আমাদের দেশেও মানা জরুরি।
বিএসটিআইকে প্রতিনিয়ত সম্ভাব্য পণ্যের মানোন্নয়নের আন্তর্জাতিক চাহিদা মূল্যায়ন করতে হবে। উল্লেখ্য, ভারতের মান নির্ধারক সংস্থা যেমন আইএসও মান অনুসরণ করে, তেমনি কোডেক্স নীতিমালাও অনুসরণ করে। কিন্তু আমাদের সব ক্ষেত্রে এটি পুরোপুরি মানা হয় না। তাই বিভিন্ন সময়েই রফতানির পর পণ্য ফিরিয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটছে। এতে দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হচ্ছে। পরিস্থিতি উন্নয়নে তাই রফতানি পণ্যের আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণ এবং রফতানি পণ্য উৎপাদনকারীরা সেটি মানছেন কিনা, তা নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযোগ রয়েছে, একাধিক ধরনের মান কাঠামোর কারণে স্থানীয় উৎপাদকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান, যেটি সর্বজনস্বীকৃত, তা অনুসরণে পদক্ষেপ নিতে হবে। পণ্যের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ডাইজেশনের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে হবে, কেননা বিদেশী ক্রেতাদের আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে এটি একটি প্রতিযোগিতামূলক বিষয়। আইএসও, আইইসি এবং আইটিইউ নামের তিনটি মান নিরূপণকারী সংস্থা রয়েছে। এদের সঙ্গে সংযোগ করে দেশে উৎপাদিত পণ্য ও সেবা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণে উদ্যোক্তাদের মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে বিএসটিআইকে আরো শক্তিশালী করতে হবে।
প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গেলে ক্রেতার কাঙ্ক্ষিত মানের পণ্য উৎপাদন করতে হয়। ক্রেতা সবসময় আরো ভালো মানের পণ্য চায়। সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতার কাঙ্ক্ষিত মানে পরিবর্তন আসে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার জন্য প্রয়োজন পণ্যের গুণগত মান উন্নয়নের একটা ডায়নামিক ব্যবস্থা রাখা। পণ্য উৎপাদনে ভুলগুলো ট্র্যাক রাখা, উৎপাদনে জড়িত কর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পণ্যের গুণগত মান উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। তাছাড়া একটা কোয়ালিটি সার্কেলের ব্যবস্থা করা যায়, যেখানে কর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকবে এবং তাদের পণ্যের এবং পণ্য তৈরির পদ্ধতির ডিফেক্ট খুঁজে বের করবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানে এডওয়ার্ড ডেমিং এ পদ্ধতি প্রণয়ন করেন। এটা পণ্যের গুণগত মান উন্নয়নে বেশ কাজে দিয়েছে। তবে নিজের প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে তার সঙ্গে যায় এমন কোনো মান উন্নয়নের পদ্ধতি নির্বাচন করা যেতে পারে। আজ জাপানের মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা অন্যতম শক্তিশালী হিসেবে বিশ্বে বিবেচিত।
শিল্প-কারখানায় উৎপাদিত খাদ্যপণ্যের জন্য মান সনদ দেয় দেশের মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিএসটিআই। কিছু দেশ এ সংস্থার সনদ গ্রহণ করলেও অনেক দেশ তা করে না। এমনকি পার্শ্ববর্তী ভারতও সব ক্ষেত্রে এ সংস্থার সনদ গ্রহণ করে না। ইউরোপের অনেক দেশ বিএসটিআইয়ের সনদ থাকার পরও পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ রেখেছে। অতিরিক্ত সিসার উপস্থিতির অভিযোগে হলুদের গুঁড়ো আমদানি বন্ধ রেখেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো। এছাড়া কৃষিপণ্য ও ফলমূল রফতানির ক্ষেত্রে মান সনদ দেয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ শাখা। এ শাখার সনদও সব ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এ সংস্থার সনদে রফতানি করার পরও পান ও আলুর চালান ফেরত এসেছে। অন্যদিকে খাদ্যপণ্যের সনদ দেয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। সংস্থার নিজস্ব পরীক্ষাগার নেই। অন্য সংস্থার ল্যাব থেকে মান পরীক্ষা করে সনদ দিতে হয়। প্লাস্টিকসহ অন্যান্য পণ্যের আন্তর্জাতিক মান নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে পণ্যের মান সনদের জন্য পণ্যভিত্তিক স্বতন্ত্র ল্যাবরেটরি ও স্বয়ংসম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য প্রবেশের অন্যতম শর্ত নিরাপদ ও নিশ্চিত পরিবেশে পণ্য উৎপাদন। রফতানি বাজার সম্প্রসারণে সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়ন্ত্রণমূলক এবং বাজারসংশ্লিষ্ট গুণগত মান, নিরাপদ স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত শর্তগুলো পূরণে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধিতে কারখানার পরিবেশ এবং পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধি প্রয়োজন। বাংলাদেশী পণ্যে কী কাঁচামাল ব্যবহার করা হয় এবং কোন পরিবেশে উৎপাদন হচ্ছে, তা নজরদারির মূল দায়িত্ব পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর। দুর্বল কাঠামোর কারণে এখনো বাংলাদেশের মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর সনদ আন্তর্জাতিক বাজারে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। এ দেশের নামিদামি কারখানায় উৎপাদিত পণ্যও বিএসটিআইসহ বাংলাদেশের অনেক মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার সনদ নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বেশির ভাগ সময় প্রবেশের অনুমতি পায় না। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের বাণিজ্য বৃদ্ধিতে বিএসটিআই ও বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড (বিএবি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পাারে। এসব প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সক্ষমতা ও সামর্থ্যের ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এসব প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক কাঠামোর উন্নয়ন করতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে উপযুক্ত হয়ে আইএলএসি-এমআরএ, আইএএফ-এমএলএতে স্বাক্ষরদানকারী হওয়া প্রয়োজন। বিএসটিআইয়ের সব পরীক্ষাগারকে অ্যাক্রেডিটেড করাও প্রয়োজন। মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো এমনভাবে পরিচালনা করা উচিত, যাতে এ সংস্থাগুলোর প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারের আস্থা ও বিশ্বাস বাড়ে।










