আজ পিকেএসএফ দিবস। কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য নিরসনের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৯০ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পিকেএসএফ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার ৩২ বছর পর ‘সাম্যের সাথে উন্নয়নের পথে’ স্লোগান ধারণ করে আজ উদযাপিত হচ্ছে ‘পিকেএসএফ দিবস ২০২২’। মহাকালের হিসেবে ৩২ বছর অতিসামান্য হলেও কাজের ব্যাপ্তিতে ও অর্জনে তা অসামান্য। পিকেএসএফ আজ প্রায় এক কোটি ৭৬ লাখ সদস্যের একটি পরিবার।

বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবসম্পদ উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, ১৯৯১ সালের ৫৯ শতাংশ দারিদ্র্য হার ২০১৮ সালে ২১ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৪৩ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ১১ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এ উন্নয়ন যাত্রায় পিকেএসএফ সরকারের পরিপূরক শক্তি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ১ কোটি ৭৬ লাখ পরিবারভুক্ত প্রায় ছয় কোটি নারী-পুরুষ, শিশু, কিশোর-কিশোরী ও প্রবীণ ব্যক্তি পিকেএসএফের জীবিকায়ন, প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, শিক্ষা, আবাসন, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলা, নারীর ক্ষমতায়নসহ নানাবিধ আর্থিক ও অ-আর্থিক সেবার আওতায় আছেন। দুই শতাধিক সহযোগী সংস্থা মাঠ পর্যায়ে এসব সেবা দেশের প্রতিটি জেলার মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে।

সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় পিকেএসএফের এ সুদীর্ঘ অভিযাত্রাকে স্মরণ করার জন্য এ বছর প্রথমবারের মতো ‘পিকেএসএফ দিবস’ পালিত হচ্ছে। ১৯৮৯ সালের ১৩ নভেম্বর পিকেএসএফ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবনা তত্কালীন রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অনুমোদনের মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠান জন্ম লাভ করে। ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য নিয়ে পিকেএসএফ প্রথম কর্মসূচি প্রণয়ন করে। দারিদ্র্য বিমোচনে পিকেএসএফই প্রথম বিশেষায়িত সংস্থা যা সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পিকেএসএফের আদলে বর্তমানে এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে দারিদ্র্য বিমোচন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে শুধু ঋণ কার্যক্রম দিয়ে শুরু করলেও বিগত তিন দশকে পিকেএসএফ একটি পরিবার ও মানবকেন্দ্রিক টেকসই উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, প্রতিটি মানুষের মানব মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা পিকেএসএফের মূল লক্ষ্য। যেখানে প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পুষ্টি, সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকরণ, উপযুক্ত ঋণ, বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কার্যক্রমসহ নানা মানবকেন্দ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দরিদ্র ও অতিদরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে জোর দেয়া হয়। ‘কাউকে বাদ দিয়ে নয়’—এটিই পিকেএসএফের উন্নয়ন দর্শন।   

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পিকেএসএফ একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি ইউনিট প্রতিষ্ঠা করেছে। ফসল, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদবিষয়ক চাষাবাদ এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এ ইউনিট গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করছে। পাশাপাশি একাধিক প্রকল্প কৃষিজ এবং অকৃষিজ খাতে ক্ষুদ্র-উদ্যোগ প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। দেশের প্রায় ২৩ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পিকেএসএফের আর্থিক ও কারিগরি প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন অ-আর্থিক সহায়তার আওতায় আছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় গড়ে তোলা হয়েছে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন ইউনিট। বিভিন্ন প্লান্টের মাধ্যমে উপকূলে সুপেয় পানি সরবরাহ, বন্যা ও খরাপীড়িত উত্তরাঞ্চলে টেকসই প্রযুক্তি নিয়ে পিকেএসএফ ভুক্তভোগী মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছে। একাধিক প্রকল্পের আওতায় চরাঞ্চলে ভিটা উঁচুকরণসহ নানা আর্থসামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। অত্যন্ত সীমিত সম্পদ নিয়ে নিজস্ব উদ্ভাবিত সমন্বিত পরিষেবার মাধ্যমে দেশের দারিদ্র্যপীড়িত ও ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন হাওড়, চরাঞ্চল ও দুর্গম পাহাড়ি জনপদে পিকেএসএফ ক্রমান্বয়ে কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ করে চলেছে। এ পথচলায় যুক্ত করা হয়েছে শিশু, কিশোর-কিশোরী, নারী, প্রবীণ এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে।

‘সাম্যের সাথে উন্নয়নের পথে’—এ প্রতিপাদ্যে নিহিত রয়েছে পিকেএসএফের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা। পিছিয়ে পড়া অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেয়ার মধ্যেই সাম্য নিহিত, কারণ উন্নয়নের পথে বড় বাধা আঞ্চলিক বৈষম্য। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে সুষম উন্নয়নের পথের বাধাগুলো দূর করতে হবে।

এসব বাধা দূর করতে এসডিজি বাস্তবায়ন শুরুর অনেক আগে থেকেই টেকসই উন্নয়ন ধারণা বাস্তবায়নে কাজ করছে পিকেএসএফ। এ উন্নয়ন ধারণার মূলে রয়েছে অন্তর্ভুক্তি, অংশগ্রহণ ও সমতাভিত্তিক উন্নয়ন। বর্তমানে এসডিজির ১২টি অভীষ্ট বাস্তবায়নের সঙ্গে পিকেএসএফের কর্মকাণ্ড সরাসরি জড়িত। বাংলাদেশ সরকারও এ বিষয়ে পিকেএসএফকে বিশেষ প্রাধান্য দিচ্ছে।

সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে পিকেএসএফকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়। বর্তমানে ১২টি উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ ও অনুদান সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক, ইফাদ, জাইকা, যুক্তরাজ্য সরকারের এফসিডিও, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশন। দেশের প্রথম উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে পিকেএসএফ আন্তর্জাতিক গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের সহায়তায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় কাজ করছে, যেটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে পিকেএসএফের সক্ষমতা ও স্বচ্ছতার কারণেই আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো নিজ উদ্যোগে এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে এগিয়ে আসে।

প্রকল্প সহায়তা দেয়ার পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখার সুযোগ দেয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে কৃতজ্ঞতা জানাই। পিকেএসএফের এ অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ সরকার, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি আমাদের অর্জনের অংশ হয়ে আছে দেশের গণমাধ্যম। তাদের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা।

পরিশেষে এ শুভলগ্নে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি পিকেএসএফ তথা বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার প্রধান সারথিদের, যারা পিকেএসএফের বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমের সদস্য, যাদের শ্রমে ও ঘামে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

 

ড. নমিতা হালদার, এনডিসি: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পিকেএসএফ