আগামী বছর থেকে সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বছরে দুটি সেমিস্টার চালুর নির্দেশনা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। এর আগে ইউজিসি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বছরে তিন সেমিস্টার পদ্ধতির লাগাম টানার উদ্যোগ নিয়েও অনেকটা ব্যর্থ হয়েছে। কমিশন দুই সেমিস্টার পদ্ধতির নির্দেশনা দিয়ে এর আগে কয়েক দফা সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চিঠি পাঠিয়েছিল, কিন্তু তাতে সাড়া মেলেনি। তবে এবার কমিশন এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে জানানো হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও নির্দেশনা বাস্তবায়নে ইতিবাচক বলে খবর মিলছে। তাদের সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে এ অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে অবশ্যই শিক্ষার্থীদের সুবিধা-অসুবিধার দিকটি প্রাধান্য পাবে বলে প্রত্যাশা।
বিশ্বের নামকরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বছরে দুটি সেমিস্টার পড়ানো হয়। এগুলো হয় সাড়ে চার মাস করে। বাকি তিন মাস থাকে ফ্রি টাইম। এ সময় শিক্ষকরাও ফ্রি, ছাত্ররাও ফ্রি। তখন শিক্ষকরা অন্য কাজ করেন। লেখালেখি করেন। গবেষণা করেন। বই লিখেন, নিবন্ধ লিখেন। বাংলাদেশে ইঞ্জিনিয়ারিং ও ফার্মেসির মতো কয়েকটি বিষয়ের সেমিস্টার ছয় মাস করে। বাকিগুলোর চার মাস। বিরতিহীন একটার পর একটা সেমিস্টার। সেমিস্টারের তিন মাসের মাথায় পরীক্ষা। এরপর রেজাল্ট। নতুন সেমিস্টার শুরু। আবার পরীক্ষা। এভাবে চক্রাকারে চলছে। এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও পরীক্ষার বাইরে আর কিছু চিন্তার সুযোগ নেই। সবাই যেন অপেক্ষায় থাকে ১২ সেমিস্টার শেষ করে কখন সার্টিফিকেট হাতে পাওয়া যাবে। বড় কথা হচ্ছে, শিক্ষকরাও নিজেদের আপগ্রেড করার সময় পাচ্ছেন না। সারা বছর ক্লাস নিতে গিয়ে শিক্ষকদের কোনো গবেষণার সুযোগ থাকে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠদান একটি বড় সমস্যা। এমনভাবে কোর্স ডিজাইন করা হয় যেন শিক্ষার্থীরা খুব দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা প্রকৃত অর্থে তেমন কিছু শিখতে পারে না বলে অভিযোগ করেন অনেকে।
বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ই তিন সেমিস্টারে শিক্ষার্থী ভর্তি করে থাকে। বছরে তিনটি সেমিস্টার থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের টিউশন ও সেশন ফিসহ নানা খাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া তিন সেমিস্টারের ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থী মাত্র একটি সেমিস্টারের জন্য চার মাস সময় পায়। ফলে কোর্স নামে মাত্র শেষ হলেও শিক্ষার্থীরা চাহিদা অনুযায়ী শিখতে পারে না। সেশন চার্জ, উন্নয়ন, ল্যাবরেটরিসহ বিভিন্ন খাতের ফি হিসাবে ৯-১১ হাজার টাকা করে নেয়া হয়। বছরে দুটি সেমিস্টার হলে ১০ হাজার টাকা ব্যয় কমবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বছরে মাত্র একবার শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। সারা বছর শিক্ষার্থীকে ভালোভাবে বিষয়গুলো রপ্ত করার সময় দেয়া হয়। উন্নত দেশগুলোয় বছরে ‘স্প্রিং’ ও ‘ফল’ এ দুটি সেমিস্টার। আর আমাদের দেশে বছরে তিনটি—স্প্রিং, ফল ও উইন্টারে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে যার মতো করে পড়াচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে বিবিএ, এমবিএ, ইংরেজি ও সিএসই বিভাগে ভর্তীকৃত কোনো কোনো ছাত্রছাত্রী তাদের কোর্স তাড়াতাড়ি শেষ করার জন্য নিয়মবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত কোর্স নিয়ে থাকে, আবার কিছু কিছু ছাত্র তাদের রিটেক ও রিপিট কোর্সসহ পাঁচ-ছয়টি কোর্সও কোনো কোনো সেমিস্টারে নিয়ে থাকে। তাহলে এ পাঁচ-ছয়টি বিষয়ে পড়ার জন্য তারা প্রতি সেমিস্টারে নির্ধারিত বিষয়ের পড়াশোনা, অ্যাসাইনমেন্ট ইত্যাদিতে গড়ে সময় পাওয়া যায় তিন মাসেরও কম। সেমিস্টারের চার মাস থেকে এক মাস গেলে বাকি তিন মাসে তাদের সিলেবাস শেষ করতে হয়। এতে একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে ওইসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। মূলত বাণিজ্যিক কারণেই প্রাইম সেমিস্টার পদ্ধতি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ দেশে চালু করেছে। তারা বলেন, কেবল বাজার ও বাণিজ্যমুখী বিষয়গুলোকেই অধিক গুরুত্ব দেয়া হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশেষ করে যে বিষয়গুলো চাকরির বাজারে গুরুত্বপূর্ণ বা চাহিদাসম্পন্ন, সেগুলোই পড়ানো হয়। বাংলা, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, অর্থনীতি এমনকি পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিতের মতো বিষয়ও অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুরুত্বহীন। এসব কারণেও সেমিস্টার কমাতে চায় ইউজিসি। কারণ বাণিজ্যনির্ভর বিষয়গুলোর পাঠে কোনো নৈতিক ও আদর্শিক বিষয় থাকে না।
ইউজিসি একই সঙ্গে পূর্ণকালীন প্রোগ্রামে ন্যূনতম চারটি কোর্সসংবলিত বছরে দুই সেমিস্টার পদ্ধতি চালুর কথা বললেও অনেকে চারটি কোর্স পড়ানোর জন্য ইউজিসির প্রস্তাবটি ভুল। ছয় মাস একটি সেমিস্টার হলে প্রতি সেমিস্টারে কমপক্ষে ছয়টি কোর্স পড়াতে হবে। না হলে তো চার বছরে গ্র্যাজুয়েশন (অনার্স) শেষ হবে না। পাঁচ বছর লেগে যাবে। বিষয়টিকে বিবেচনায় রাখতে হবে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যারা তাদের কোর্স-কারিকুলাম ইউজিসি থেকে অনুমোদন নিচ্ছে, তাদের সবাইকে বছরে দুই সেমিস্টারের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ১৫-১৮ বছর একই কোর্স পড়িয়ে যাচ্ছে। যুগ বদলাচ্ছে। নিত্যনতুন জ্ঞানের সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ তারা বছরের পর বছর একই বিষয় পড়িয়ে যাচ্ছে। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় তিন বছর পরপর নতুন কোর্স-কারিকুলাম অনুমোদন না করিয়ে নিলে মোটা অংকের জরিমানা করা হয়। আমাদের আইনে এমন কোনো ব্যবস্থা নেই।
ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদনে কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেহাল চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত বোর্ড অব ট্রাস্টিজ, সিন্ডিকেট, অর্থ কমিটি ও একাডেমিক কাউন্সিলের সভা আহ্বান করা হয় না। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে চ্যান্সেলরের নিয়োগ করা উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নেই। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি বছর নিয়ম অনুযায়ী তাদের নিরীক্ষিত বার্ষিক হিসাব ইউজিসিতে দাখিল করে না। ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ অনেকাংশে লঙ্ঘন করা হয়, যা কাম্য নয়। বিষয়গুলো নিবিড় পর্যবেক্ষণের মধ্যে আনতে হবে। দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চালচিত্র তুলে ধরে ইউজিসি সরকারকে বলেছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০-এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশার বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই। বিশদভাবে উল্লেখ নেই ট্রাস্টি বোর্ড, একাডেমিক কাউন্সিল, উপাচার্য এবং সিনেটের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টনের বিষয়ও। এ কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ট্রাস্টি বোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে থাকে। ফলে মেধাবী শিক্ষকরা প্রায়ই অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যান। এছাড়া অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিক বিষয়গুলো স্বচ্ছভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসিতে উপস্থাপন করছে না। আয়-ব্যয়ের হিসাব দিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনাগ্রহ রয়েছে। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরীক্ষিত অডিট রিপোর্টে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০-এর যথাযথ অনুসরণ করা হয় না। মানসম্পন্ন উচ্চ শিক্ষা নিশ্চিতে প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতাও জরুরি।










