ভারি বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার পাঁচ উপজেলায় বন্যার সৃষ্টি হয়। পানিবন্দি হয়ে পড়ে অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ। তবে আশার কথা, এরই মধ্যে নামতে শুরু করেছে সেই পানি। ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পানি কমলেও বাসিন্দাদের সংকট ও দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, আকস্মিক এ বন্যায় প্রাণ হারিয়েছেন অনেকে। তলিয়ে গেছে লক্ষাধিক হেক্টর জমির আমন ধান, পচে গেছে সবজি খেতের ফসল। ভেসে গেছে খামারের মাছ। বিধ্বস্ত হয়েছে প্রচুর ঘরবাড়ি, অধিকাংশ বন্যার্ত মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি সংস্কার করতে পারছে না। পানির তোড়ে ভেঙে গেছে প্লাবিত গ্রামগুলোর অধিকাংশ সড়ক। এতে যোগাযোগেও বেগ পেতে হচ্ছে তাদের। দেখা দিয়েছে গো-খাদ্যের সংকটও। বন্যার কারণে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে ২৩৫টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। তবে এ বন্যায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সরকারের কোনো উপদেষ্টা দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে যাননি। এতে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন বন্যার্তরা। যদিও বন্যাকবলিত সব অঞ্চলকে ত্রাণসহায়তা প্রদান ও পুনর্বাসনে সরকারের সমান প্রাধান্য দেয়া দরকার। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টাদের জরুরি ভিত্তিতে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনে যাওয়া প্রয়োজন।
গত আগস্ট থেকেই টানা দেশের একেক অঞ্চল ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তরবঙ্গের রংপুর কুড়িগ্রামের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বন্যায় আর বর্তমানে ময়মনসিংহের তিন জেলা বিপুল ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের আকস্মিক বন্যা-পরবর্তী উপদেষ্টা পরিষদের এক বৈঠক শেষে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা বন্যার্তদের দুর্দশা প্রশমনে সহায়তা করতে সব বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করবেন বলে গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো উপদেষ্টাই সর্বশেষ বন্যাকবলিত জেলা পরিদর্শনে যাননি, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এমন দুর্যোগময় সময়ে সরকারের সশরীরে উপস্থিতি জনমনে আশা জাগাতে সহায়ক হয়। মানুষ আশস্ত হয় যে সরকার তাদের পাশে আছে। অন্তত বন্যার্ত মানুষের এ দুর্দিনে সরকারের উচিত তাদের সেই আস্থা বাড়ানো, মনোবল বাড়ানো। আর ত্রাণসহায়তা পৌঁছানো ও পুনর্বাসনে সরকারি তৎপরতার যে বিকল্প নেই তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু সেক্ষেত্রেও সরকারের ভূমিকা দৃশ্যমান নয়। আর সহায়তা প্রাপ্তির তালিকায় পিছিয়ে ময়মনসিংহ বিভাগের বন্যার্তরা।
প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা অবশ্য দাবি করেছেন যে সবার কাছেই ত্রাণ পৌঁছানোর জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন; কিন্তু যোগাযোগ সমস্যার কারণে কিছু এলাকায় যেতে সমস্যা হচ্ছে। তবে বাস্তব চিত্র তাদের দাবিকে নাকচ করে দিচ্ছে। বন্যাদুর্গতদের সহায়তার ক্ষেত্রে ময়মনসিংহের তিন জেলা তুলনামূলক অবহেলিত রয়ে গেছে। তুলনামূলক বলার কারণ, বন্যার্ত সেসব জেলায়ও ত্রাণসহায়তা ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে সরকারের সমন্বয়হীনতা ও ঘাটতি রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্যার সময় দুর্গতদের সহায়তায় সরকারের উদ্যোগ সেভাবে দৃশ্যমান হয়নি। এমনকি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ফেনী-নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়ার ক্ষেত্রে তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। যদিও এসব অঞ্চল প্রায় সব উপদেষ্টা পরিদর্শন করেন এবং বিপুল ত্রাণসহায়তাও দেয়া হয়েছে।
তবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আগস্টে পূর্বাঞ্চলের ১১ জেলায় বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ও পুনর্বাসন নিয়ে করা তাৎক্ষণিক এক গবেষণায় দেখিয়েছে, ত্রাণসহায়তার ক্ষেত্রে সরকারের বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা ছিল। এ বন্যায় মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নোয়াখালী জেলা। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ত্রাণসহায়তা পৌঁছেছে সিলেট জেলায়।
শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনায় নদ-নদীর পানি কমায় এবং নতুন করে বৃষ্টি না হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ না আসায় অনেকেই শুধু শুকনো খাবার খেয়ে সপ্তাহ পার করেছেন। রান্না করা খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে রয়েছেন ভুক্তভোগীরা। ফলে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন অনেকেই। পূর্বাঞ্চলের বন্যার সময় দুর্গতদের সহায়তার ক্ষেত্রে জনগণের ভেতরেও ব্যাপক উদ্যম পরিলক্ষিত হয়। গণত্রাণ সংগ্রহ ও বিতরণ কর্মসূচি পালন করা হয়, যা বর্তমানে একেবারে কম। ফলে বন্যার্ত মানুষের দুর্দশা ও ভোগান্তিও বেশি।
সিপিডির ওই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় ১৪ হাজার ৪২১ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে কৃষি ও বন খাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে, যার পরিমাণ ৫ হাজার ১৬৯ কোটি টাকা। নোয়াখালীতে ১৬ লাখ ৪৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ ৪ হাজার ১৯২ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। সে হিসাবে প্রতিজন মানুষ পেয়েছেন গড়ে ৯৩ টাকা। সিলেটে ক্ষতির পরিমাণ ২০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সেখানে ত্রাণ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। প্রতি জনে গড়ে ত্রাণ পেয়েছে ১৫ হাজার ৩২০ টাকা। আর কুমিল্লায় জনপ্রতি ১৩৬ টাকা ও লক্ষ্মীপুরে জনপ্রতি ত্রাণ পেয়েছে গড়ে ৬২ টাকা।
এদিকে ময়মনসিংহ বিভাগের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ লাখ ৩২ হাজারের বেশি মানুষ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কলমাকান্দা, দুর্গাপুর ও সদর উপজেলা। সদরের ৯৬৩টি ও কলমাকান্দায় ৩২২টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। এতে পুঁজি হারিয়ে পথে বসেছেন অনেকে। পানির নিচে ডুবে আছে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর আমন ধানের খেত। জেলার সড়ক বিভাগের তথ্যানুসারে, ৬৫০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক ডুবে গেছে বন্যার পানিতে। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, বন্যায় সবচেয়ে বেশি রোপা আমনের জমি নষ্ট হয়েছে ধোবাউড়া উপজেলায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৪৩ হাজার ২৫০ কৃষক। ১০ হাজার ৩১০ হেক্টর আমনের জমি নষ্ট হয়েছে হালুয়াঘাটে। এ উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২৫ হাজার ২৭৫ কৃষক। ফুলপুরে নষ্ট হয়েছে ৩ হাজার ৪০৫ হেক্টর জমি, ১৫ হাজার ৬০০ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
এত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্সের (এনডিআরএফ) প্রতিবেদন মতে, ১০ অক্টোবর পর্যন্ত বন্যাকবলিত মানুষের মাঝে নগদ ৭২ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া চাল বিতরণ হয়েছে ৪ হাজার ৪০০ টন, শুকনা ও অন্যান্য খাবার বিতরণ করা হয়েছে সাত হাজার প্যাকেট বা বস্তা। শিশুখাদ্য ১৫ লাখ টাকার এবং সমপরিমাণ অর্থের গো-খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ওই প্রতিবেদনে সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
২ লাখ ৩২ হাজারের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য এ বরাদ্দ ও সহায়তা যে অপ্রতুল তা সাদা চোখেই বোঝা যায়। আর স্থানীদের ভাষ্যেও এটি স্পষ্ট যে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতার ঘাটতি রয়েছে। সরকারের এ অভিযোগের প্রতি নজর দেয়া প্রয়োজন। সরকার তার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে শক্তভাবে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াবে এটিই প্রত্যাশা।










