আর্সেন ওয়েঙ্গার ফুটবলকে শিল্পের সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং তিনি বলেছেন ফুটবল একটি শিল্প, যেমন নাচ একটি শিল্প ঠিক তেমনি। শিল্পীরা মাধুর্য মিশিয়ে তাদের গান কিংবা নাচ পরিবেশন করে। কাতার বিশ্বকাপ ফুটবলের শিল্পী যদি মেসি, রোনালদো কিংবা নেইমার হয় তাহলে? নিশ্চয় বিশ্বব্যাপী উন্মাদনার অন্ত থাকে না। আশ্চর্যের বিষয় যে মেসির ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারীর সংখ্যা লাতিন আমেরিকার জনসংখ্যার থেকেও বেশি। অন্যদিকে রোনালদোর মেসির থেকে মোটেই কম নয়, বরং অনেক বেশি। ঘুমন্ত পৃথিবী ফুটবল বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক মাস আগেই জেগে ওঠে। জেগে ওঠে ফুটবল বিশ্বের প্রতিটি দেশ এবং স্বপ্ন দেখে আমরাও জিতব! বাগিবতণ্ডার মাধ্যমে নিজের দলকে চ্যাম্পিয়ন করতে ন্যানো সেকেন্ডও সময় নেয় না সমর্থকরা। শুধু সমর্থকদের মধ্যে এসব বিদ্যমান তা নয়, স্বয়ং কোচরাও সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের দলের খেলোয়াড় ও সমর্থকদের বুলি ফুটিয়ে একের পর এক আশায় রাখে। নিজ দলকে এগিয়ে নিতে একচুল পরিমাণ ছাড় দিতে নারাজ।
নিঃসন্দেহে ফুটবল বিশ্বকাপ বিশ্বের সব মানুষের জন্য অন্যতম একটি আয়োজন। এবারের বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে গত ২০ নভেম্বর ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ খ্যাত ফুটবলের ২২তম মহাযজ্ঞ। হ্যাঁ, মরুভূমি কাতার বিশ্বকাপের কথাই বলছি। মুসলিম দেশ হিসেবে প্রথম কাতারই এ দুঃসাহসের পরিচয় দিয়েছে। বিশ্বকে আমন্ত্রণ জানাতে তৈরি করেছে আটটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত খেলার মাঠ। খরচ করেছে বাংলাদেশের পাঁচটি জাতীয় বাজেটের সমতুল্য পরিমাণ অর্থ। পরাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা আর তাদের জগদ্বিখ্যাত ফুটবলারদের পদভারে মুখর পেট্রো-ডলারের দেশ কাতার। তাদের উপস্থিতিতে পারস্য সাগরে যে ঊর্মি তৈরি হয়েছে, আরব সাগর পেরিয়ে সেই ঢেউ লেগেছে বঙ্গোপসাগর পারের এই বাংলায়। বিশ্বকাপের জোয়ারে গা ভাসিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে উন্মাদনা ও উচ্ছ্বাস। শুধু যে আরবের দেশগুলোতে বিশ্বকাপ ফুটবলের উচ্ছ্বাস রয়েছে তা নয়, বরং বিশ্বব্যাপী চলছে ফুটবলের উন্মাদনা ও উত্তেজনা। সেক্ষেত্রে বাদ পড়েনি বাংলাদেশও। দেশের আকাশে-বাতাসে, আনাচকানাচে ফুটবলের জয়জয়কার ধ্বনি বইছে। মরুর উত্তাপে গা ভাসিয়ে দিয়েছে গোটা বাংলাদেশ। দেশের সব শ্রেণীর মানুষের মধ্যে বিশ্বকাপের নতুন আমেজ পরিলক্ষিত করা যাচ্ছে। অনেকেই কিনেছেন প্রিয় দলের জার্সি। লাল-সবুজের বাংলাদেশ যেন আকাশি-সাদা ও হলুদে পরিণত হয়েছে। চাঁদা তুলে বানাচ্ছেন পতাকা। কে কত বড় পতাকা বানাতে পারেন তার প্রতিযোগিতা চলছে। দোকানদারদের চলছে রমরমা ব্যবসা। ব্যক্তিপর্যায়ে কেনা পতাকা বাড়ির ছাদ, বারান্দা কিংবা কার্নিশ—সর্বত্র উড়ছে। কেউবা ব্যক্তিগতভাবে আর কেউ জোটবদ্ধ হয়ে বানাচ্ছেন প্রিয় দলের পতাকা। বানানো আর উড়ানোতেই সীমাবদ্ধ নন, তা নিয়ে করছেন শোভাযাত্রা। দেশের বিভিন্ন জায়গায় চলছে প্রিয় দলের মিছিল ও মোটরসাইকেল শোডাউন।
এসব আয়োজন বিশেষ করে তারুণ্যের ক্যাম্পাসে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশি দেখা যায় এবং ক্যাম্পাসগুলোতে এসব প্রতিদিনের রুটিন হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিটি চায়ের আড্ডা যেন কাতারের এক একটি স্টেডিয়াম। বাগিবতণ্ডায় শুকনো গলা চায়ের চুমুকে ভিজিয়ে নিচ্ছে এবং আবার শুরু করছে। চলছে তো চলছেই। বিশ্বকাপের আগমনে হতাশার মোড় থেকে যেন হতাশা বিদায় নিয়েছে। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বন্ধুবান্ধব, সিনিয়র-জুনিয়রের মধ্যে চলছে কথার ফুলঝুড়ি। পদ্মরাগ, এসো বিদ্রোহ করি, বায়ান্ন ইত্যাদি যাত্রীছাউনি কাতারকে নিয়ে অনেক ব্যস্ত জীবন পার করছে। সেন্ট্রাল লাইব্রেরি যে বাগিবতণ্ডা থেকে দূরে আছে তা নয়, পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে নিজ দলের গুণগান করছে শিক্ষার্থীরা।
রাত যায় দিন আসে এভাবে মাহেন্দ্রক্ষণের উপস্থিতি। গোটা দুনিয়াকে তাক লাগানো কাতার বিশ্বকাপকে স্বাগত জানাতে ব্যস্ত ছিল বাংলাদেশও। দেশের আনাচকানাচে প্রিয় টিমের পতাকা টানানো, শোভাযাত্রা করা ইত্যাদি এখন নিত্যদিনের কাজ। বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থন বেশি হওয়ায় পাল্টাপাল্টিভাবে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থকগোষ্ঠীর কমিটি ঘোষণা করা হচ্ছে। কমিটিতে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক বাদে আরো কতগুলো পদ দেখা যায় যেমন চাপাবাজ নির্মূল সম্পাদক, স্লোগানবিষয়ক সম্পাদক, গোপন বৈঠকবিষয়ক সম্পাদক, পাল্টিবাজ প্রতিরোধবিষয়ক সম্পাদক, প্রতিপক্ষের কান্না থামানো ও টিস্যু বিতরণবিষয়ক সম্পাদক ইত্যাদি। এসব পদের মাধ্যমে নিজের দলের গুণগান এবং বিরোধী দলকে হেয় করছে ও আনন্দ নিচ্ছে। বাংলাদেশে শুধু যে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থক আছে তাই নয় জার্মানি, ফ্রান্স ইত্যাদি দেশের সমর্থকদের সংখ্যাও মোটামুটি দেখা যায়।
দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে স্টার টেকনো ভিশনের জায়ান্ট এলইডি স্ক্রিনে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষের সমাগম হচ্ছে এবং প্রিয় খেলোয়াড় ও দলের জন্য স্লোগানে মেতে উঠছে। আবার অনেকেই দোকানে এবং ঘরের কোণে পরিবারসহ খেলা দেখছে। বিশ্বকাপের খেলা দেখছে না এমন মানুষের সংখ্যা নেহাত কম। বেশির ভাগ ম্যাচ বিকালে শুরু হওয়ায় সারা দিনের বিভিন্ন কাজে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ফুটবলপ্রেমীরা বিকাল ৪টায় এলইডির সামনে আসতে একটুখানি দেরি করতে নারাজ। শত শত সমর্থকের পদচারণায় মুখরিত হচ্ছে স্পটগুলো। অনেক খেলা আবার রাত ১টায় শুরু হচ্ছে। নিজ দলের কিংবা প্রিয় খেলোয়াড়ের খেলা দেখতে বিকাল কিংবা রাত কোনো সময় মানছে না। বিশেষ করে গত ২২ তারিখের আর্জেন্টিনা ও সৌদি আরবের খেলার দর্শকের সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো। শুধু যে আর্জেন্টাইন সমর্থক ছিল তা নয়, আকাশি-সাদা জার্সিদের হেয় করতে ব্রাজিলদের উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি। আর্জেন্টাইন দলের প্রাণভোমরা মেসি ও অন্য খেলোয়াড়দের বল দেয়া ও নেয়া একটু ব্যতিক্রম হলেই ভুয়া ভুয়া স্লোগানে মুখরিত হয়েছিল। অন্যদিকে আর্জেন্টাইন যখন ভালো খেলছে সমর্থকদের মেসি মেসি স্লোগানে মুখরিত ছিল সারা দেশ। আক্রমণভাগে বল চলে এলেই ভয়ে শরীর কাঁপুনি দিয়ে ওঠে অনেকের। সবশেষে ২-১ গোলে আর্জেন্টিনা জয় থেকে ছিটকে গেলে ব্রাজিলরা স্লোগানে মুখরিত হয় এবং আর্জেন্টাইন ও ব্রাজিল সমর্থকরা বাগিবতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। বন্ধুদের আড্ডা আর চায়ের ধূমায়িত কাপে ঝড় তুলছেন তারা—কার প্রিয় দল কতটা শক্তিশালী। কারা এবার ফাইনাল খেলবে। শেষ হাসি ফুটবে কাদের মুখে। কোন খেলোয়াড় এবার কতটা মাঠ কাঁপাবেন। গোল্ডেন বুট বগলদাবা করবেন কে। মেসি, রোনালদো নাকি অন্য কেউ! ইত্যাকার নানা আলোচনা চলছে। ফেসবুক-টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রিয় দল আর খেলোয়াড়ের বন্দনামূলক পোস্ট দিচ্ছেন অনেকে। আনন্দ-আয়োজনের বর্ণনা তো আছেই।
ফুটবলের এই বড় আসরে খেলছে ৩২টি দেশ। কিন্তু যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা মূলত লাতিন আমেরিকার দুই ফুটবল পরাশক্তি আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলে বিভক্ত। ম্যারাডোনা থেকে মেসি। মাঝখানে এই টিমে এসেছেন আরো অনেকে। অন্যদিকে ফুটবলের জাদুকর পেলে থেকে এখনকার নেইমার। এসব খেলোয়াড়ের ফুটবল নৈপুণ্যই মূলত এ দুই দলের সমর্থক বাড়িয়ে দিয়েছে।
দেশের আনাচকানাচে সব জায়গা ছেয়ে গেছে প্রতিটি প্রিয় দলের পতাকায়। পাড়ার গলি থেকে শুরু করে অফিস, আড্ডা, চায়ের দোকানেও উপস্থিত বিশ্বকাপ। সব জায়গায় নান্দনিক ফুটবলের ছোঁয়ায় গা ভাসাচ্ছে মানুষ। উচ্ছ্বাস, উত্তেজনা, প্রত্যাশা বা হতাশায় পার হচ্ছে একেকটি দিন। এ আনন্দ-উত্তেজনা চলবে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। রাত জেগে খেলা দেখা, প্রিয় দলের পতাকা টানানো, প্রিয় খেলোয়াড়ের জার্সি গায়ে পরা কোনো কিছু বাদ যাচ্ছে না।
তারুণ্যের ফ্যাশনেও পড়েছে বিশ্বকাপের প্রভাব। মেসি-নেইমারের চুলের স্টাইল করছেন অনেকেই। পোশাকেও এসেছে বিশ্বকাপের ছোঁয়া। প্রিয় দলের জার্সি তো রয়েছেই, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা রঙের টি-শার্ট, যেগুলো প্রিয় দলের বার্তা বহন করছে। ক্যাম্পাসের চায়ের দোকানগুলো হয়ে উঠেছে বিতর্কের মঞ্চ। সবাই নিজ নিজ প্রিয় দলের গুণগান গাইছেন। একজনের সঙ্গে আরেকজনের মতের অমিল হলেই শুরু হয়ে যাচ্ছে তুমুল বিতর্ক। তাতে যোগ দিচ্ছেন অন্যরাও। প্রতি চার বছর পর বিশ্বকে জাগাতে আগমন ঘটে ফুটবল বিশ্বকাপের। একে অন্যের মধ্যে বাগিবতণ্ডা হলেও যেন হাতাহাতি না ঘটে। ফুটবল বিশ্বকাপকে আবেগের জায়গায় না রেখে আনন্দের জায়গায় রাখাটাই শ্রেয়। বিশ্বকাপ ফুটবলের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক বিশ্ব গড়ে উঠুক।
মো. মমিনুর রহমান: শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়










