যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অর্থনৈতিক নীতির ধরন কেমন হবে তা নিয়ে বর্তমানে দুটি এজেন্ডা একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। এদের একটি দেশীয় বিষয়াবলি—যেমন অন্তর্ভুক্তিমূলক, সহনশীল, সমৃদ্ধ ও টেকসই মার্কিন অর্থনীতি বিনির্মাণকে গুরুত্বারোপ করছে। অন্যটি ভূরাজনীতি এবং চীনের ওপর মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখার গুরুত্বারোপ করছে। বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎও নির্ভর করছে এ দ্বন্দ্বের ফলাফল এবং বিরোধী অগ্রাধিকারগুলো সহাবস্থান করতে পারে কিনা তার ওপর।

দেশীয় উৎপাদন পুনরুজ্জীবিতকরণ এবং সবুজ রূপান্তর সহজ করতে উচ্চাভিলাষী শিল্পনীতি গ্রহণের মাধ্যমে পূর্ববর্তী ডেমোক্রেটিক প্রশাসন থেকে যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন আমূল সরে এসেছে, সেটি নির্দেশ করে। এমনকি চীন বিষয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ অন্য যেকোনো প্রশাসনের তুলনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে বর্তমান বাইডেন প্রশাসন। চীন সরকারকে প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা এবং সূক্ষ্ম প্রযুক্তি রফতানি ও বিনিয়োগে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে।

যদিও কিছুদিন আগ পর্যন্ত বাইডেন প্রশাসন এ ধরনের সুসংগত কোনো রূপরেখা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করেনি, যা বিভিন্ন উপাদানকে একত্র করার পাশাপাশি চীন ও অন্যান্য দেশকে আশ্বস্ত করে—মার্কিন এ অর্থনৈতিক কৌশল-সংঘাত, একতরফাবাদ ও সংরক্ষণবাদকেন্দ্রিক নয়। কিন্তু বর্তমানে এ সমস্যা মোকাবেলায় বাইডেন প্রশাসন পদক্ষেপ নিচ্ছে—মার্কিন অর্থমন্ত্রী জ্যানেট ইয়েলেন ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সুলিভানের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে এমন ইঙ্গিতই মিলছে। আর সেটি সম্ভাব্য নতুন ওয়াশিংটন ধারণার উত্থানকেও নির্দেশ করছে।

বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি বড় ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করে। জ্যেষ্ঠ মার্কিন নীতিনির্ধারকরা এখন মনে করছেন, ১৯৯০-পরবর্তী বিশ্বায়নের মডেল সুস্থ গণতন্ত্রের আর্থসামাজিক ভিত্তিকে ক্ষুণ্ন করেছে, যা জাতীয় নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন ও মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার চেয়ে মুক্তবাণিজ্য ও মুক্তবাজারকে অগ্রাধিকার দেয়।

নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুলিভান তার বক্তব্যে প্রশাসনের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক এজেন্ডার পাঁচটি স্তম্ভের কথা বলেছেন। তিনি এ পাঁচ স্তম্ভকে ‘মধ্যবিত্তের বৈদেশিক নীতি’ বলে অভিহিত করেছেন।

প্রথম স্তম্ভ হলো একটি ‘আধুনিক আমেরিকান শিল্প কৌশল’, যেটির লক্ষ্য হবে মার্কিন সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের অনুঘটক হিসেবে কাজ করা। দ্বিতীয়ত, অন্যান্য উন্নত গণতন্ত্র এবং উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে কাজ করা। যার লক্ষ্য হবে মার্কিন মিত্ররাও যেন ‘সক্ষমতা, সহনশীলতা ও অন্তর্ভুক্তি’ উন্নত করার ক্ষেত্রে একই ধরনের নীতি গ্রহণ করে তা নিশ্চিত করা।

তৃতীয়ত, বাজারে প্রবেশাধিকারে গুরুত্বারোপ করে এমন প্রথাগত বাণিজ্য চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে আসবে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, ডিজিটাল নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও করপোরেট কর প্রতিযোগিতার মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ‘নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব’-এর দিকে ঝুঁকবে দেশটি। পাশাপাশি উদীয়মান অর্থনীতিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে কোটি কোটি ডলার নিয়ে আসা এবং ঋণ নিয়ে সংকটে থাকা দেশগুলোকে সহায়তা দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

যদিও এসবের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যার কয়েকটি নিয়ে বিশেষভাবে বিতর্কও রয়ে গেছে। কারণ অন্যান্য দেশ কিছু নীতিকে, যেমন প্রশাসনের আমেরিকান দাবি-দাওয়া রক্ষাকে সংরক্ষণবাদী হিসেবে দেখে থাকে। কিন্তু সুলিভানের পঞ্চম স্তম্ভ বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যতের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে, যা ‘যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক প্রযুক্তি’ রক্ষায় গুরুত্ব দেয়। 

উন্নত সেমিকন্ডাক্টর (অর্ধপরিবাহী) মার্কেটে চীনের প্রবেশাধিকারে বাধা দিতে বাইডেন প্রশাসনের সুদূরপ্রসারী রফতানি নিয়ন্ত্রণ পঞ্চম স্তম্ভের সবচেয়ে স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। চীনা প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানে মার্কিন বিনিয়োগের ওপর আরো বিধিনিষেধের পরিকল্পনার কথাও শোনা যাচ্ছে। বিশেষত মাইক্রোচিপের মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খাতে।

চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রযুক্তিগত অবরোধ’ আরোপ করেছে বলে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংসহ চীনা কর্মকর্তারা অভিযোগ করে আসছেন। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের কলামিস্ট অ্যাডওয়ার্ড লুসের মতে, চীনের প্রযুক্তি খাতকে বিচ্ছিন্ন করে যুক্তরাষ্ট্র ‘পূর্ণমাত্রার অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ লিপ্ত হচ্ছে।

তবে এটিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করছেন সুলিভান। মার্কিন এ নীতিকে একটি ছোট উঠান ও উঁচু বেড়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন তিনি। প্রশাসনের পদক্ষেপগুলোকে তিনি ‘সতর্কতার সঙ্গে মানানসই বিধিনিষেধ’ বলেছেন, যা জাতীয় নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে গৃহীত এবং উন্নত প্রযুক্তির ‘ক্ষুদ্র একটা অংশ’কে লক্ষ্য করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

গত এপ্রিলের শেষ দিকে জনস হপকিন্স স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজে অর্থমন্ত্রী ইয়েলেনের বক্তব্য দেয়ার এক সপ্তাহ পর সুলিভানের বার্তা প্রত্যাশিতই ছিল। তিনি বলছেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ মোকাবেলা করতেই এ রফতানি নিয়ন্ত্রণ। আর এটি ক্ষুদ্র পরিসরে কয়েকটি জিনিসেই থাকবে। তিনি জোর দিয়েই বলেছেন, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে না যুক্তরাষ্ট্র।’

জাতীয় নিরাপত্তার নামে বড় ধরনের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিধিনিষেধ আরোপের যে ঝুঁকি রয়েছে, তা বাইডেন প্রশাসন বোঝে; সেটি সুলিভান ও ইয়েলেনের বক্তব্যই নির্দেশ করে। এ ধরনের পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে এবং সম্ভবত উসকানির ফলে চীন পাল্টা ব্যবস্থা নিলে বিপরীত ফলও বয়ে নিয়ে আসতে পারে।

স্থিতিশীল বিশ্ব ব্যবস্থা নির্ভর করে প্রতিটি দেশের জাতীয় স্বার্থরক্ষার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়ার নিয়ম ও অনুশীলনের ওপর। এসব স্বার্থরক্ষা সুচিন্তিত এবং অন্য দেশের ক্ষতি যেন না করে, তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনও রয়েছে। এটি অর্জন করা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে, তবে অসম্ভব নয়।

যখন কোনো সরকার অন্যান্য দেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এমন একতরফা নীতির মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করে তখন নীতিনির্ধারকদের উচিত তাদের লক্ষ্য স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা, যোগাযোগের উন্মুক্ত লাইন বজায় রাখা এবং সেই নীতির বিরূপ প্রভাব প্রশমিত করতে প্রতিকারের প্রস্তাব করা।

অন্য পক্ষকে শাস্তি দেয়া বা দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করার স্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে নীতি গ্রহণ করা উচিত নয় এবং কোনো ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছতে ব্যর্থ হলে এর সঙ্গে সম্পর্কহীন ক্ষেত্রে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে একে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করাও ঠিক নয়। যেমনটা স্টিফেন ওয়াল্ট ও আমি বলেছি, গ্রহণযোগ্য নীতিমালার ওপর এ ধরনের স্ব-আরোপিত সীমারেখা বৃদ্ধি রোধে সহায়তা করতে পারে। এমনকি অন্য পক্ষের অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনুমোদন পেতে সহায়তা করতে সক্ষম।

ইয়েলেন ও সুলিভানের সাম্প্রতিক বক্তব্য বলছে, বাইডেন প্রশাসনের বৈদেশিক অর্থনৈতিক নীতিমালা এসব নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হবে। তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। যেমন উন্নত চিপের ওপর রফতানি নিয়ন্ত্রণ কি যথাযথভাবে চিন্তাভাবনা করে নেয়া, নাকি মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তাকে পর্যাপ্ত সুবিধা না দিয়েই চীনের প্রযুক্তিগত ক্ষমতা ধ্বংসে তারা অনেক দূর এগিয়ে গেছে? যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পারমাণবিক ফিউশনের মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে এসব বিধিনিষেধ সম্প্রসারণ করা হয়, তখনো কি আমরা কেবল প্রযুক্তির ‘ক্ষুদ্র অংশকে’ লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলতে পারব?

এছাড়া সুলিভান ও ইয়েলেনের ‘সোজা-সাপ্টা’ জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগ প্রকৃত নাকি একতরফা পদক্ষেপের অজুহাতমাত্র তা এখনো স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্র কি বহুপক্ষীয় বিশ্ব ব্যবস্থা মেনে নিতে প্রস্তুত, যেখানে চীনের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শাসন কাঠামো গঠনের ক্ষমতা থাকবে? নাকি প্রশাসন এখনো যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যেমনটা বাইডেনের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল দেখে মনে হয়?

কথার চেয়ে কাজের আওয়াজ বেশি। এসব প্রশ্নের উত্তরও পাওয়া যাবে। কিন্তু যারা বিশ্বাস করেন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতি না করেও তার বৈধ জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগের সমাধান করতে পারে, ইয়েলেন ও সুলিভানের বক্তব্য তাদের কিছুটা হলেও আশ্বস্ত করে।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]


ড্যানি রড্রিক: হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সমিতির সভাপতি

ইংরেজি থেকে ভাষান্তরিত