বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান সংকটগুলোর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অন্যতম। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ পুনঃ পুনঃ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হয়, যার ফলে অনেক মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের জেলাগুলোয় বিশেষ করে শিশুদের জীবনমান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রায় ১৯ মিলিয়ন শিশু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে, যদিও বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে কম গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণকারী দেশগুলোর একটি। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও প্রভাবের দিক বিবেচনায় ইউনিসেফের তৈরি করা শিশুদের জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫তম। অভ্যন্তরীণ শরণার্থী-উদ্বাস্তু পর্যবেক্ষণকারী সেন্টারের মতে, বাংলাদেশে মোট অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ৯ লাখ ৪৬ হাজার এবং প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পাঁচ হাজারের মতো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। এসব গৃহহীন মানুষ জীবন ও জীবিকার সন্ধানে আশপাশের কোনো নিরাপদ জায়গায় কিংবা শহরের কোনো বস্তি অথবা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অনেকটা অস্থায়ী আকারে আশ্রয় নেয়। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার ফলে এসব পরিবারের সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে শিশুরা। 

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উদ্বাস্ত হওয়া এ মানুষগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত, যারা উদ্বাস্তু হয়ে নিজেদের এলাকাতেই কোনোভাবে আশ্রয় গ্রহণ করে। দ্বিতীয়ত, যারা নিজেদের এলাকা ছেড়ে শহরের বিভিন্ন বস্তি বা অন্যান্য পতিত খাস জায়গায় অস্থায়ী আবাসস্থল গড়ে তোলে। উভয় ক্ষেত্রেই শিশুদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পরিবারগুলো ব্যর্থ হয়ে পড়ে। এসব পরিবারে স্কুলচ্যুত শিশুদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ফলে মৌলিক শিক্ষার অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হয়। অভাবে তাড়িত এসব পরিবার শিশুদের বাধ্য করে শিশুশ্রমে যুক্ত হয়ে কিছু হলেও উপার্জন করতে। পরিবারে পিতৃহীন হওয়া শিশুরা পুরো পরিবারের দায়দায়িত্বের বোঝা নিতে বাধ্য হয়। ফলে এসব শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার সম্ভাবনা চরম আকারে বাধাগ্রস্ত হয়। নিজ এলাকায় আশ্রয় নেয়া উদ্বাস্তুদের একটি বড় সমস্যা হলো বিশুদ্ধ পানির সংকট, যার অভাবে তারা লোনা পানি ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগসহ পরিবাহিত রোগে তাদের জীবনযাত্রাকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। পুষ্টিহীনতা, শারীরিক পরিশ্রম, মানসিক চাপ, বাল্যবিবাহসহ নানা সমস্যার ফলে এসব শিশুর সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ চরম সংকটে রূপ নেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি বিরূপ প্রতিফলন দৃশ্যমান উদ্বাস্তু শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশে। অতীতের স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবন দুর্যোগের পর রূপ নেয় অনিশ্চয়তায়। এতে শিশুরা নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে না পেরে মানসিক সংকটে ভোগে যা তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলে। ইউএনএইচসিআরের রিপোর্ট অনুযায়ী, চিরচেনা পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া শিশুরা মানসিকভাবে চরম বিপদগ্রস্ত জীবনযাপন করে। পরবর্তী সময়ে এসব শিশু বিভিন্ন ধরনের অপরাধ কার্যক্রমে লিপ্ত হয়। উপরন্তু, এসব শিশুর অনেককে মানব পাচার চক্র তুলে নিয়ে যায়।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মেয়ে শিশুদের জীবন বিকশিত হওয়ার ক্ষেত্রে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত। ইউনিসেফের মতে, জলবায়ুসংক্রান্ত স্থানচ্যুতির ফলে প্রতি বছর পাঁচ হাজার থেকে ২০ হাজার মেয়ে শিশু বাল্যবিবাহের মতো ব্যাধিকে বরণ করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন তারা ভবিষ্যৎ জীবনে ন্যূনতম স্বাভাবিক জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে লালন করার ক্ষেত্রে এরা কোনোভাবেই মাতৃত্বের সক্ষমতা পুরোপুরিভাবে অর্জন করতে পারছে না। আমাদের আইনে বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ করা হলেও উদ্বাস্তুদের ক্ষেত্রে তেমন নজরদারি নেই বললেই চলে। পারিবারিকভাবে চরম সংকটে থাকার ফলেই তাদের অভিভাবকরা বাল্যবিবাহ চর্চায় বাধ্য হচ্ছে। একই সঙ্গে অনেক মেয়ে শিশুর পড়ালেখা ব্যাহত হয়। একসময় স্কুলে প্রতিনিয়ত যেতে পারলেও উদ্বাস্তু হওয়ার পর তাদের স্কুল জীবন শেষ হয়ে যায়। 

জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ২০ নং ধারায় রাষ্ট্রকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা প্রতিকূলতার কারণে চিরচেনা পরিবেশ থেকে স্থায়ীভাবে বা অস্থায়ীভাবে বিচ্যুত হয়ে পড়া শিশুদের দায়ভার নিতে বলা হয়েছে এবং তাদের মৌলিক অধিকারগুলো যথাযথভাবে নিশ্চিতের ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র অবশ্যই শিশুদের সুরক্ষা, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা এবং সহায়তা নিশ্চিত করতে বাধ্য থাকবে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে বিকল্প আশ্রয় দেয়া এবং শিশুদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এক্ষেত্রে শিশুদের ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ভাষা ইত্যাদি কারণে বৈষম্য করা যাবে না। বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উদ্বাস্ত হয়ে যাওয়া শিশুদের ভবিষ্যৎ জীবনযাত্রা নিশ্চিতের জন্য বিকল্প আশ্রয় ব্যবস্থাপনার যথাযথ সুযোগ-সুবিধা আছে কিনা? জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের অনুমোদনকারী রাষ্ট্র হিসেবে উল্লিখিত অধিকারগুলো বিশেষ করে সনদের ২০ নং ধারার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার বিষয়ে বাংলাদেশের আইনে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কিনা তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। 

উদ্বাস্তুদের জীবনযাত্রাকে ন্যূনতম স্বাভাবিক করতে প্রয়োজন সরকারি সহায়তা। দুঃখজনক হলেও সত্য যে রাষ্ট্রীয় বাজেটে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উদ্বাস্তু শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত প্রয়োজনীয় অর্থ নির্দিষ্ট করে দেয়া থাকে না। বেসরকারি পর্যায়ে প্রদানকৃত সাহায্য-সহযোগিতাও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে তাদের জীবনযাত্রা দিন দিন কঠিনতর হচ্ছে এবং অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বিবিসির রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রতিফলন হিসেবে বাংলাদেশে প্রতি সাতজনের একজন বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। এ অবস্থায় রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশাল এ জনগোষ্ঠীতে শিশুদের সংখ্যা অগণিত। ফলে এ শিশুদের কীভাবে ভবিষ্যৎ জীবনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে হবে তা রাষ্ট্রকে এখনই যথাযথ পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা নিশ্চিত করতে হবে। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সরকারিভাবে প্রতি বছর বাস্তুচ্যুত শিশুদের যথাযথ উপাত্ত রাখা এবং সে অনুপাতে মানোন্নয়নে পদক্ষেপ নেয়া। অঞ্চলভিত্তিক ঝুঁকিপ্রবণ এলাকার শিশুদের পর্যাপ্ত উপাত্ত সংগ্রহ রাখতে হবে। পরিশেষে, বর্তমানে উদ্বাস্তু শিশুদের যেসব সমস্যার কথা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলোকে যথাযথভাবে গুরুত্ব দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। শিশুদের বিকাশ, মানোন্নয়ন, নিরাপত্তা, শিক্ষা এবং চিকিৎসা, বাল্যবিবাহ রোধে সরকারের পাশাপাশি সামাজিকভাবে সচেতনতা বাড়াতে হবে। 

তানিয়া সুলতানা: সহকারী পরিচালক, এসওএস শিশুপল্লী