ইতিহাসকে টেনে আনলে কাতালান জাতির প্রধান কেন্দ্রভূমি আর স্পেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বার্সেলোনার ইতিহাসকে অনায়াসে ২০০০ বছর টেনে নেয়া যায়। ভূমধ্যসাগর তীরের এ বন্দর নগরীকে বলা যায় ইতিহাসের মেল্টিং পট। ভূমধ্যসাগরকে কেন্দ্র করে ইতালি, গ্রিস, উত্তর আফ্রিকা, মিসর, তুরস্কের বসফরাস হয়ে সমগ্র কৃষ্ণ সাগরের তীরবর্তী এলাকা ও অন্যদিকে সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, প্যালেস্টাইন হয়ে মধ্যপ্রাচ্য আর আরব উপদ্বীপের সঙ্গে সমগ্র স্পেন উপদ্বীপ ও মধ্য ইউরোপের বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক সমুদ্র সংযোগভূমি এ বার্সেলোনা। ১৯৯২ সালের অলিম্পিকের স্বাগতিক শহর আর আমার প্রিয় শিল্পী জোয়ান মিরো আর বিখ্যাত স্থপতি আন্তোনিও গাউদির শহর এ বার্সেলোনা, তবে বার্সেলোনা শহরের বর্ণনা দেয়ার জন্য আমি এ লেখা লিখিনি, তার জন্য বার্সেলোনা নিয়ে শত শত বই আছে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব আর্কিটেক্টসের (UIA) কনফারেন্সে এসে মাদ্রিদে থেকে লিসবন হয়ে গিয়েছিলাম বার্সেলোনা। বার্সেলোনার সবচেয়ে পর্যটক অধ্যুষিত এলাকা রামলা দে রাভাল। এ রাস্তা সারা রাত জেগে থাকে, এর কাছেই ছোট একটা প্লাজা, ‘প্লাজা পেদ্রো’। তবে বার্সেলোনার প্রায় ১৫ হাজার বাঙালি একে অন্য নামে ডাকে, এ প্লাজাকে তারা ডাকে ‘একুশে চত্বর’ বলে, কেননা অনেক চেষ্টার পর ২০১৮ সালে প্লাজা পেদ্রোতে একুশের শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটি খুব ছোট্ট শহীদ মিনার স্থাপন করেছে এখানকার বাঙালিরা। যদিও শহীদ মিনারটি খুবই ছোট তবে শহীদ মিনারের পেছনে অভিবাসী বাঙালিদের সম্মিলিত আবেগ কিন্তু মোটেই ছোট না, সেটা অনেক বড়। একুশে ফেব্রুয়ারিতে এখানকার বাঙালিরা শহীদ মিনারকে ঘিরে বড় অনুষ্ঠান আয়োজন করে, কাতালানিয়ার গভর্নর, অনেক দেশের কনস্যুলার ও আমাদের রাষ্ট্রদূতও জমায়েত হন শহীদ মিনারে।

এখানেই আলাপ হয়েছিল বার্সেলোনার মেয়র অফিসকে হরেক রকম ডকুমেন্টস সরবরাহ করে শহীদ মিনার স্থাপনের অনুমতিপত্র সংগ্রহ করা দলের অন্যতম টঙ্গীর মোহাম্মদ কামরুলের সঙ্গে। বহু বছর তিনি আছেন বার্সেলোনায়, তার আবেগ দেখে আমি অভিভূত হলাম। তিনি বললেন, আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে কয়েক বছরের মধ্যে এ প্লাজায় ঢাকার শহীদ মিনারের হুবহু ডিজাইনের শহীদ মিনার তারা এখানে বানাবেনই। আমি জানি না তারা সেটা পারবেন কিনা, তবে আমি আশ্চর্য হই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ৭০ বছর পরও বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার দূরের এক ইউরোপীয় শহরের শত শত বছর পুরনো এক প্লাজায় বাঙালির শহীদ মিনার স্থাপনের প্রতিজ্ঞা নিয়ে মাত্র চল্লিশোর্ধ্ব বয়সের মোহাম্মদ কামরুলের বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার আবেগের উচ্ছ্বাস দেখে। সমগ্র পরিকল্পনার পেছনে আছেন বেশ কয়েকজন স্থানীয় বাঙালি নেতা, ‘অ্যাসোসিয়েশন কালচারাল ই হুমানিতারিয়া দে বাংলাদেশ এন্ কাতালুনিয়া’ নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেছেন তারা এবং আরো বড় পরিসরে শহীদ মিনার নির্মাণের সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।

স্পেনে প্রায় ৫০-৬০ হাজার বৈধ-অবৈধ বাংলাদেশী আছে। স্পেনসহ ইউরোপে তাদের স্থায়ী হওয়ার ইতিহাস অনেকেরই খুব মধুর নয়। নানা বৈধ-অবৈধ পথে, নানা পাহাড়-পর্বত, সমুদ্র পাড়ি দিয়ে জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে তাদের অনেকেই এ দেশে এসেছেন। সেই দুর্গম ও দুঃসহ যাত্রায় অনেকেই সফল হননি, অনেকেই অসহনীয় কষ্ট সহ্য করে ভূমধ্যসাগরে নীল জলে ডুবে বা প্রচণ্ড শীতে জনমানবহীন পথেই মৃত্যু বরণ করেছেন, শুভ্র তুষারে ঢেকে গিয়েছে তাদের মৃতদেহ, তাদের অনেকেরই লাশ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। কোন দেশে বা কোন অচেনা মাটিতে তাদের সমাধি করা হয়েছে তাও কেউ জানে না। হয়তো কোনো প্রত্যন্ত মাটিতে তাদের গণসমাধি হয়েছে যেখানে তাদের জন্য কোনো এপিটাফ লেখা হবে না কোনো দিন। তাদের অনেকেরই মা হয়তো কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়ে গিয়েছেন, আবার অনেকের অবুঝ মা হয়তো এখনো তার আদরের পুত্রের অপেক্ষায় দিন গুনছেন, প্রত্যহ তার জায়নামাজ হয়তো ভিজে যাচ্ছে চোখের জলে। এ দেশ, এ জাতি তাদের বলতে গেলে কিছুই দেয়নি তবু দেশের প্রতি তাদের টান, দেশের প্রতি তাদের ভালোবাসার বিন্দুমাত্র কমতি নেই। আমি আশ্চর্য হয়ে ভাবি, এ দেশের শিক্ষিত আর সুবিধাভোগী অংশ দেশের সুযোগ-সুবিধা শুষে নিয়ে মানিলন্ডারিং করে এ দেশ থেকে টাকা পাচার করছে আর যাদের এ দেশ কিছুই দেয়নি তারা উলটো দেশে টাকা পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছে আর ভীনদেশে শহীদ মিনার বানানোর জন্য সংগ্রাম করছে আর অভাবনীয় সব স্বপ্ন দেখছে। তাদের এ সুগভীর দেশপ্রেম, তাদের এ পবিত্র আবেগকে কীভাবে সম্মান জানাব, আমি ভেবে পাই না।

যতই বিদেশ ঘুরি বড় জোর একবেলা ভীনদেশী খাবার খাওয়া যায়, তারপর যখন ক্ষুধা লাগে শরীর তখন দেশী খাবারের জন্য পাগল হয়ে ওঠে। বার্সেলোনায় এসেই দেশী খাবারের খোঁজ পেয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের হোটেল থেকে ১০ মিনিটের হাঁটা পথ, বিখ্যাত ট্যুরিস্ট কেন্দ্র লা রাম্বলার কাছেই এ রেস্টুরেন্ট। রেস্টুরেন্টের মালিক মাদারীপুরের শিক্ষিত যুবক শফিক খান। অমায়িক তার ব্যবহার। শুধু সুস্বাদু খাবারের জোগান দেয়া নয়, বিদেশবিভুঁইয়ে যেকোনো বাঙালির আপদ-বিপদে তিনি এগিয়ে আসেন সবার আগে। তার রেস্টুরেন্টের খাবার খুব সুস্বাদু তবে সবচেয়ে সুন্দর  তার রেস্টুরেন্টের নাম ‘মধুর ক্যান্টিন’। ছাত্রজীবনে বেশির ভাগ সময়ই কাটত তার মধুর ক্যান্টিনে আড্ডা দিয়ে। সে মধুময় স্মৃতি তিনি ভুলতে পারেননি কোনোদিন। তাই সুদূর বার্সেলোনায় এসেও নিজের রেস্টুরেন্টের নাম দিয়েছেন তিনি মধুর ক্যান্টিন। সেই কবে বিক্রমপুরের শ্রীপুরের আদিত্য চন্দ্রের ছেলে মধুসূদন দের প্রতিষ্ঠিত মধুর ক্যান্টিন, যাকে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নৃশংসভাবে হত্যা করে তার অস্তিত্ব পৃথিবী থেকে মুছে দিতে চেয়েছিল কিন্তু তারা তা মুছে দিতে পারেনি, বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন আজ শুধু ক্যান্টিন হিসেবেই টিকে নেই বরং এ দেশের সব ছাত্র ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে টিকে আছে। ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসে জহির রায়হান বলেছিলেন, ‘আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হবো।’ মজার কথা হলো, জহির রায়হানের কথা সত্য হয়েছে, মধুর ক্যান্টিন এখন দ্বিগুণ হয়েছে, আজ মধুদার সেই একই নামের আরো একটি ‘মধুর ক্যান্টিন’ সগর্বে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুদূর ইউরোপের বিশাল ভাইব্রেন্ট শহর বার্সেলোনায়, যেখানে বহু পাকিস্তানি সুস্বাদু খাবার খেতে ভিড় জমায়। সত্যিই আশ্চর্য ঘটনা, প্রকৃতির নীরব প্রতিশোধ কেউ ঠেকাতে পারে না। বোদলেয়ারের সঠিক বিলেছিলেন, ‘Truth is stranger than fiction.’

মহাকালের আবর্তে সত্য এক সময় বিস্ময়করভাবে রূপকথাকেও হার মানিয়ে প্রতিশোধ নেয়। যদি কেউ বার্সেলোনায় গিয়ে আমার মতো দেশী খাবারের ক্ষুধার গ্রম্যতায় আপনার পেয়ে বসে তবে অবশ্যই মধুর ক্যান্টিনে যাবেন, আমি নিশ্চিত আপনি খুব তৃপ্ত হবেন, শফিক খান সেখানে আপনার জন্য অপেক্ষায় আছেন।

স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের লাভা পিএস হলো বাংলাদেশী-অধ্যুষিত বিশাল এলাকা, এখানে রয়েছে অসংখ্য বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট আর আছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনও। শিশু ও কিশোরদের বাংলা ভাষা শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে স্কুল, আছে মাদ্রাসা আর মসজিদও। এখানে ‘দেশ রেস্তোরাঁ’ নামের বাংলাদেশী রেস্টুরেন্টে আমি যে অপূর্ব সুন্দর কাঁচকি মাছের ভুনা খেয়েছি আমার জীবনে আমি এত সুন্দর কাঁচকি মাছের রান্না আর কোথাও খাইনি। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনেও দেখেছি RUA DO BENFORMOSO আর মাত্রিমনি এলাকা হলো মোটামুটি আর এক ‘লিটেল বাংলাদেশ’, এখানকার কালো কোবাল্ট পাথরের সুন্দর সরু গলিগুলোতে বহু বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট, দোকান আর ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান অনেক রাত পর্যন্ত অগুনতি বাংলাদেশীদের পদচারণায় মুখর থাকে। এখানকার বাঙালি রেস্টুরেন্ট CHARCOAL এ RILL-এর রান্না অতুলনীয় কেননা এখানেই আমি প্রতিদিন খেয়েছি তবে আরো অন্যান্য অসংখ্য যেসব বাঙালি রেস্টুরেন্ট আছে তাদের অনেকেরই রান্না নিশ্চয়ই ভালো, তবে আমি দেখেছি CHARCOAL-এ RILL-এর অপূর্ব সুন্দর রান্নার টানে বাংলাদেশী ছাড়াও পাকিস্তানি, ভারতীয়, আফগানসহ অনেক দেশের মানুষও এখানে খেতে আসে। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে পাবেন শিমুল মিয়া ও তার দোকান যেখানে সব বাংলাদেশী খাবার ও জিনিসপত্র পাবেন আর বাঙালিদের যেকোনো সমস্যায় সবার আগে তিনি এগিয়ে আসবেন। প্যারিসের গার দ্য নর্থ আর এথেন্সের ওমানিয়া স্কয়ারও এমনিভাবে ধীরে ধীরে প্রাণবন্ত লিটল বাংলাদেশ হয়ে উঠছে। সুইডেনের স্টকহোমে এখন পর্যন্ত এমন বাংলা টাউন নেই তবে এখানে প্রায় ৫৫টি ইন্ডিয়ান নামের রেস্টুরেন্ট আছে যার ৫০টির মালিকই বাংলাদেশী, শুধু ব্যবসায়িক সুবিধার স্বার্থে নিজেদের ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট হিসেবে পরিচয় দেন তারা।

আজ থেকে প্রায় ২৬-২৭ বছর আগে যখন প্রথম ইউরোপ গিয়েছি  তখন একমাত্র লন্ডন আর ব্রিটেনের কিছু শহর ছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন শহরে গিয়ে একা একা নিজেকে খুব অসহায় মনে হতো কিন্তু এখন আর তেমন মনে হয় না। কেননা আজ আমি জানি ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার প্রায় সব প্রধান শহরেই আছে ‘লিটল বাংলাদশ’ বা বাংলা টাউন। সবচেয়ে বড় কথা, এ লিটল বাংলাদেশগুলো হলো বিদেশবিভুঁইয়ে ভীনদেশী খাবার খেতে খেতে ভ্রমণরত ক্লান্ত বাঙালিদের জন্য দেশী খাবারের মূল্যবান স্পট, অনেকটা রুক্ষ মরুভূমির বুকে ছায়া সুনিবিড় সুখময় মরূদ্যান খুঁজে পাওয়ার মতো। বিদেশে বাংলাদেশীরা এখন অনেক বুক ফুলিয়ে চলতে পারে কেননা আপদে-বিপদে ‘লিটল বাংলাদেশ’-এর বাংলাদেশীদের কাছ থেকে কোনো না কোনো সাহায্য নিশ্চিত মিলবেই, তাই এখন বুকে থাকে অনেক সাহস, অনেক ভরসা। (চলবে)

 

মাহফুজুল হক জগলুল: স্থপতি, ফেলো আইএবি