দেশের পাঁচ জেলায় ভূমিহীন ও গৃহহীনদের ঘর ও জমি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী চলমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী এবং খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন। ব্যয় সংকোচনে সরকারের আট সিদ্ধান্ত, বিদ্যুতের লোডশেডিং, গ্যাস রেশনিংসহ কিছু ঘোষণা সাম্প্রতিক সময়ে এসেছে। উদ্দেশ্য বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা থেকে দেশের অর্থনীতি ও মানুষকে রক্ষা করা। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি নির্দেশনাই যথাযথ এবং দ্রুতই বাস্তবায়ন প্রয়োজন। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই প্রধানমন্ত্রীর তাগিদ বা নির্দেশনা আমলে নিয়ে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। বর্তমান বাস্তবতায় সেটি কাম্য নয়। প্রত্যাশা থাকবে, প্রশাসন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে দ্রুত সাড়া দেবে এবং মাঠপর্যায়ে তদারকি নিশ্চিত করবে।

খাদ্যদ্রব্যের দেশীয় উৎপাদন ও সরবরাহের দিকে নজর দিতে হবে প্রথমেই। বলাবাহুল্য, দেশের মাটি অনেক উর্বর। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশে উৎপাদন বাড়াতে হবে। দরকার হলে কৃষিতে ভর্তুকি দিয়ে কৃষকদের উৎপাদন ও বিপণনে উৎসাহ দিতে হবে। উন্নত বিশ্বের প্রায় সব দেশেই কৃষিতে ভর্তুকির ব্যবস্থা আছে, যদিও সেখানকার উৎপাদন ব্যয় উৎপাদিত ফসলের মূল্য থেকে বেশি। তবু সামাজিক নিরাপত্তা জাল হিসেবে বা কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখার নিমিত্তে কৃষিতে ভর্তুকির ব্যবস্থা আছে। আমাদের দেশে কৃষি এখনো একটি লাভজনক খাত এবং বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনে কৃষির অবদান এখনো উল্লেখযোগ্য। কৃষিকে টেকসই করার জন্য দরকার কিছু সংস্কার। শুধু ভর্তুকির ব্যবস্থা করলেই হবে না, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় নিশ্চিত করতে হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। তদুপরি বিশ্বব্যাংকসহ অনেক উন্নয়ন সংস্থার গবেষণায় প্রতীয়মান যে বাংলাদেশে কৃষিজমির মালিকানা সংস্কারের মাধ্যমে কৃষির উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সেচকালীন সার ও কীটনাশকের পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির সংযোজন কৃষিকে শিল্পের প্রধান ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রিতে রূপান্তর করতে পারে। এর সুফল পেতে হলে দরকার মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ। ভৌগোলিক দিক থেকে বাংলাদেশ খুব একটা বড় নয়, এখানে উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের এতটা উপস্থিতি অর্থনৈতিক নীতির মধ্যে পড়ে না বা কাম্যও নয়। এসব অন্তরায় চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নিলে খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিরাজমান মূল্যস্ফীতি লাঘবে দীর্ঘমেয়াদে সুফল দেবে।

দ্বিতীয়ত, জ্বালানি খাত যেকোনো অর্থনীতির জন্যই অপরিহার্য। বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানিকারক একটি দেশ। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, যেমন ১৯৭৪ সালের অয়েল শক এবং ২০১০ সালের জ্বালানি তেলের দামের অভাবনীয় উল্লম্ফন বিশ্বকে ভুগিয়েছিল। বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অবশ্যই জ্বালানি আমদানিকারক দেশকে বিপদে ফেলবে। যুদ্ধে রাশিয়ার প্রধান অর্থনৈতিক হাতিয়ার হলো জ্বালানি তেল ও গ্যাস। এ দুইয়ের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রাশিয়া পুরো ইউরোপকে তার বিরুদ্ধে এক হওয়া থেকে বিরত রাখতে পেরেছে এখন পর্যন্ত। ইউরোপীয় দেশগুলোও রাশিয়ার এ বলয় থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছে। তাই তারা জীবাশ্ম জ্বালানি ছেড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি ঝুঁকছে। এটা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় বার্তা। বাংলাদেশকেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথ খুঁজতে হবে। সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তি কাজে লাগিয়ে কীভাবে দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণ করা যায়, সে সম্পর্কে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। দরকার হলে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করার লক্ষ্যে অবকাঠামোর প্রয়োজনীয় উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে।

বিশ্বের যেসব দেশের সাধ্য আছে তারা তাদের খাদ্য মজুদ বাড়াচ্ছে। দেশবাসীর খাদ্য নিশ্চয়তা বাড়াতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের পাশাপাশি আমদানিও বাড়াচ্ছে অনেক দেশ। ফলে দেশে দেশে খাদ্যপণ্য আমদানির রেকর্ড সৃষ্টি হচ্ছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ছাড়াও বৈশ্বিক তাপমাত্রা খাদ্যনিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে আসার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ২০০৭-০৮ সালেও এমন সংকট তৈরি হয়েছিল। সে সময় অর্থ দিয়েও বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্য মিলছিল না। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বিশ্বের সচেতন দেশগুলো খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যের মজুদ গড়ে তুলছে। ভারত, চীন, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনামের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। ভারত ও চীন আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল কিনে রিজার্ভ গড়ে তুলেছে। শুধু তা-ই নয়, খাদ্যের মজুদ গড়ে তুলতে খাদ্যপণ্য রফতানিতে বিধিনিষেধও আরোপ করছে সময়ে সময়ে। দেশগুলো খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও মজুদ নিয়ে নিয়মিত তদারকিও জোরদার করেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে দেশগুলো জনগণকে নানা নির্দেশনা দিচ্ছে, যার মধ্যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি, অপ্রয়োজনে দিনের বেলায় বাতি জ্বালিয়ে না রাখা প্রভৃতি। বাসাবাড়ি আর অফিস-আদালতে এয়ারকন্ডিশন না চালানোয় মানুষকে উৎসাহিত করতে নতুন পোশাক পরিধান নীতি চালু করেছে জাপান। গ্রীষ্মের এ মৌসুমে এখন থেকে কেউই স্যুট, টাই কিংবা ভারী পোশাক পরতে পারবেন না। শর্ট টি-শার্ট (পোলো শার্ট) আর ঢিলেঢালা পোশাকে গরমের উত্তাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে বলে সরকার সারা দেশেই এ নীতিমালা চালু করেছে। বাংলাদেশ সরকারও অনুরূপ নির্দেশনা জারি করেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো জাপানের জনগণ ও প্রশাসন নির্দেশনা মানলেও বাংলাদেশে সেটি মানা হচ্ছে না। এক্ষেত্রে নির্দেশনা বাস্তবায়নে দেশে তদারকি জোরদার ও শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রীর অনেক নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ার প্রবণতা দেশে বিরাজমান। যেমন পরিপত্র জারি করে নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া সরকারি চাকুরেদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। কিন্তু সেটি থামানো যায়নি। আমরা দেখছি, দেশের অর্থ খরচ করে এখনো অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফরে যাচ্ছেন একশ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকারের নির্দেশনা খোদ সচিবালয়ে মানা হচ্ছে না বলে খবরে প্রকাশ। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যৌথভাবে পরিদর্শন টিম গঠন করতে পারে। তাদের কাজ হবে সরকারি অফিসগুলোয় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা তত্ত্বাবধান করা।

সরকার কিছুটা দেরিতে হলেও খাদ্য মজুদ গড়ে তুলছে। চাল ও গম আমদানি করা হয়েছে এবং আগামীতেও হবে বলে জানা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছর বাংলাদেশের জন্য খুবই চ্যালেঞ্জিং হবে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। হাওর ও উত্তরবঙ্গে বন্যা হওয়ায় খাদ্যপণ্য উৎপাদন বিঘ্নিত হয়েছে। বাজারে এর প্রভাবে পণ্যের দাম বেড়েছে, যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিয়েছে। এমন বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর যে তাগিদ দিয়েছেন তা যথাযথ। নির্দেশনা বাস্তবায়নে কৃষি মন্ত্রণালয়কেই উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে। বাজারে পর্যাপ্ত সার, বীজের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সেচসহ অন্যান্য উপকরণের সংকট তৈরি না হয়, সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। দেশে ক্রমেই মানুষ বাড়ছে, ফসলের জমি কমছে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে। সর্বোপরি জলবায়ু পরিবর্তনের কুপ্রভাব তো রয়েছেই। তাই সার্বিক দিক বিবেচনা করে দেশে কৃষির উৎপাদন হার দ্বিগুণ ও অপচয়-নষ্ট বন্ধ করতে হবে। নতুবা সুষম খাদ্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জন হবে না। বিদ্যুৎ-জ্বালানি সাশ্রয়ে একগুচ্ছ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।

করোনার ধাক্কা কাটিয়ে দেশের অর্থনীতি যখন চাঙ্গা হতে শুরু করেছে ঠিক সে সময় ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ নতুন বৈশ্বিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। করোনার সময় লকডাউনে বিপুলসংখ্যক মানুষ নতুন করে দরিদ্র হওয়ার খবর বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছিল। এবারে ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট বলছে, বাংলাদেশে নতুন করে ৫০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নামবে। এদিকে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব খাদ্য উৎপাদন ও জ্বালানিতে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিশ্বের জনসংখ্যা চলতি বছরই ৮০০ কোটিতে উন্নীত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে খাদ্য ও জ্বালানির চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও জ্বালানি সাশ্রয়ের বিকল্প নেই।