সরকারের ব্যয় সংকোচনের আভাস মিলেছিল বাজেট অধিবেশনের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণেই। অর্থবছর শুরু হতেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মেনে কৃচ্ছ্রতার পথ বেছে নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। রোববার অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ তিনটি আলাদা পরিপত্র জারি করেছে। সব ধরনের নতুন গাড়ি কেনা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন কমিটি বৈঠকে অংশ নিলে সরকারি কর্মচারীরা এত দিন যে সম্মানী পেতেন, তাও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিভুক্ত প্রকল্পের ব্যয় করতে হবে গুরুত্ব অনুযায়ী। পরিপত্রগুলোয় কিছু খরচ স্থগিত ও কিছু সীমিত করতে বলা হয়েছে। আর এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে। আলোচ্য সিদ্ধান্তগুলোকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন সবাই। এক্ষেত্রে শুধু নির্দেশনা বা পরিপত্র জারি করলেই হবে না, বাস্তবায়নেও সদিচ্ছার পরিচয় দিতে হবে।
দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা করোনার প্রকোপে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়েছে। দেশে দেশে মূল্যস্ফীতি প্রকট হয়েছে। করোনা মহামারীকালে দেশের আর্থিক খাত কিছুটা চাপে পড়লেও সরকারের নানামুখী পদক্ষেপে অর্থনীতির চাকা আবার সচল হতে শুরু করে। এরই মধ্যে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ব নতুন করে মহামন্দার কবলে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এদিকে দেশে দুই বছর ধরে ভোগ্যপণ্যসহ জিনিসপত্রের দাম অল্প অল্প করে বাড়লেও গত তিন মাসে তা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর মধ্যে বড় ধাক্কা এসেছে ভোজ্যতেল সয়াবিনের ওপর। ২০-৩০ শতাংশের মতো বেড়েছে চাল, ডাল, আটা, ময়দা, দুধসহ প্রায় প্রতিটি ভোগ্যপণ্যের দাম। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে শুধু আমদানিনির্ভরই নয়, দেশে উৎপাদিত পণ্যের দামও বাড়ছে। এর মধ্যে ডলারের দাম কয়েক টাকা বাড়ায় সবার মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলংকা মূল্যস্ফীতিতে হিমশিম খাচ্ছে। শ্রীলংকার মতো যেসব দেশ বিদেশী ঋণনির্ভর বড় বড় প্রকল্প নিয়েছে সেসব দেশে আতঙ্ক বাড়ছে। পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতি ডবল ডিজিট অতিক্রম করেছে। ভারতেও মূল্যস্ফীতির হার ঊর্ধ্বমুখী। ছোট দেশ ছাড়াও বড় দেশগুলোও বৈশ্বিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতির চাপে ব্যয় সংকোচন নীতিতে যাচ্ছে। মূলত কৃচ্ছ্রসাধনের এ সময়ে সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে। সরকারি কিংবা ব্যক্তি পর্যায়ে গাড়ি আমদানি একেবারেই বন্ধ করা যেতে পারে। বন্ধ করা যেতে পারে সোনা আমদানি। প্রসাধনসামগ্রী বা বিদেশী মদ আমদানিতেও কৃপণতার আশ্রয় নেয়া হোক। সরকারিভাবে আয়োজিত বিভিন্ন দিবসকেন্দ্রিক অনুষ্ঠানগুলোর আনুষ্ঠানিকতা সাময়িক সময়ের জন্য প্রায় বন্ধ করে দেয়া যেতে পারে। আপাতত কমানো যেতে পারে পর্যটনকেন্দ্রিক বিদেশ ভ্রমণ। এছাড়া সম্প্রতি চালু করা যাবে না কিংবা কাজ মাত্র শুরু হয়েছে, সুফল পেতে সময় লাগতে পারে, সরকারি এমন প্রকল্পের কাজও বন্ধ করা যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, কৃচ্ছ্রসাধন মানেই সবকিছু স্থবির করে ফেলা নয়, অর্থনীতি সচল রাখতে হবে। কেবল অপ্রয়োজনীয় কিংবা বিলাসী ব্যয়গুলোকে বাদ দিতে হবে। সর্বাগ্রে দরকার দুর্নীতি বন্ধ করা।
সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনের উদ্যোগগুলোর অধিকাংশই স্বল্পমেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করা যাচ্ছে না। অর্থ মন্ত্রণালয় উল্লিখিত খাতেই সরকার অপ্রয়োজনীয় ব্যয় করে বিষয়টি তেমন নয়, অনেক অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় আছে, বর্তমান সময়ে যার উপযোগিতা নেই। অন্যদিকে যুগের চাহিদা অনুযায়ী নতুন নতুন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ প্রয়োজন, অর্থের অভাবে সেগুলো খোলা যাচ্ছে না। ফলে প্রশাসনিক ব্যয় কমিয়ে আনতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। মাঝে প্রশাসনিক সংস্কারের লক্ষ্যে কমিটি গঠন করা হলেও পরবর্তী সময়ে তা বাতিল হয়ে যায় নানামুখী চাপে। উন্নত দেশগুলো এমনকি উন্নয়নশীল দেশগুলোও ব্যয় সাশ্রয়ে প্রশাসনিক ব্যয় কমিয়ে এনেছে, বাংলাদেশে এমন উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে এবং সে সুযোগও আছে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ব্যয় সংকোচনের এমন পদক্ষেপ এবারই নতুন নয়। এর আগে ২০০৯ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব মোকাবেলায় সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের আওতায় বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছিল। তখন বাজেটের বাড়তি খরচের জোগান দিতে অপ্রয়োজনীয় পদ পর্যায়ক্রমে বিলুপ্ত করে সরকারি কর্মচারীর মোট সংখ্যা ১০ শতাংশ কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এছাড়া যানবাহন কেনা, আপ্যায়নসহ সরকারি বিভিন্ন খাতে অপচয় কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে এক পরিপত্র জারি করা হয়েছিল। ওই সময় অর্থমন্ত্রী ছিলেন সদ্যপ্রয়াত আবুল মাল আবদুল মুহিত। জোরেশোরেই বেশকিছু ব্যয় কমানোর পদক্ষেপ নিতে পেরেছিলেন তিনি। তবে উদ্যোগ নেয়া হলেও বরাবরাই কৃচ্ছ্রসাধনের এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে গড়িমসি দেখা যায়। গত অর্থবছর দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এডিপির অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে পাঁচটি নির্দেশনা জারি করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব মোকাবেলায় চতুর্থ শ্রেণীর সরকারি কর্মচারীদের কাজগুলো তৃতীয় পক্ষের হাতে তুলে দিয়ে পদ কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। এছাড়া যানবাহন ক্রয়, আপ্যায়নসহ সরকারি বিভিন্ন খাতে অপচয় কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে অর্থ মন্ত্রণালয় পরিপত্র জারি করেছিল। করোনাকালে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার কথা বলা হলেও সরকারের সে সিদ্ধান্ত কার্যকর করা যায়নি। বিভিন্ন অজুহাতে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজে ব্যবহারের জন্য গাড়ি কেনা হয়েছে। তাছাড়া বিদেশ সফরের বিষয়ে নিরুৎসাহিত করা হলেও এটি অব্যাহত রয়েছে। এবারো কৃচ্ছ্রসাধনে সরকার পুরো সফল হবে, তা বলা যায় না। সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ থেমে নেই, সেই আলোচনাও সামনে এসেছে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ব্যয় কমানোর আলোচনার এ সময়ে প্রাসঙ্গিকভাবেই এসেছে অর্থ পাচারের বিষয়টিও। আমদানির আড়ালে অর্থ পাচার হচ্ছে কি না, তাও খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। দেশে অবৈধভাবে কেউ বিপুল পরিমাণ ডলার মজুদ করছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে হবে।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ব্যয় সংকোচনের বড় উদ্যোগ লক্ষ করা যায়। গত বছর সরকার এডিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রকল্পের প্রাধিকার তালিকা করেছিল। অর্থাৎ অধিক গুরুত্বপূর্ণ, মধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ও অল্প গুরুত্বপূর্ণ—এ রকম তিনটি শ্রেণীতে প্রকল্পগুলোকে বিন্যস্ত করতে প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে যে কাজটি সরকার ভালোভাবে করতে পারত বা যে কাজটি হয়নি, তা হলো বড় বড় অবকাঠামো খাতে যেখানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছিল, সেখানে পর্যাপ্ত মাত্রায় অর্থ ব্যয় হয়নি। এসব খাতে অধিক অর্থ বরাদ্দ দেয়ায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ অন্য কিছু খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দেয়া যায়নি। একদিকে ব্যয় সংকোচনের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের পরও তা ব্যয় না করার ব্যর্থতাও রয়েছে, যা সরকারের ব্যয় কাঠামো যথাযথ পরিচালনার ক্ষেত্রে অদক্ষতাকে ইঙ্গিত করে। এর সমাধান প্রয়োজন। নামসর্বস্ব প্রকল্পে সরকার যেন বরাদ্দ না করে। অনেক সময় রাজনৈতিক চাপে বা বিভিন্ন কারণে প্রচুরসংখ্যক প্রকল্প ছাড় দেয়া হয়। এ অর্থগুলো কোনো কাজে লাগে না, স্পষ্ট অপচয়। এর রাশ টেনে ধরতে হবে।
ব্যয় সংকোচনের ক্ষেত্রে সরকারের এক ধরনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছিল এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিছু উদ্যোগও আমরা দেখেছি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকার সফলও হয়েছে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যয় সংকোচন হয়নি। ব্যয় সংকোচনের কাঠামো আগামী অর্থবছরের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রাধিকারকেন্দ্রিক যে বিভাজন ছিল তা নতুন অর্থবছরেও সরকার কার্যকর রাখতে পারে, সে লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিতে হবে। আগামী অর্থবছরে প্রাধিকারে স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকার অগ্রাধিকার দিতে পারে। বিভিন্ন খাতে যে প্রণোদনা দেয়া হয় এ প্রণোদনা কাঠামোর সুস্পষ্ট পর্যালোচনা দরকার। কারণ, এ কাঠামোর অধীনে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে, সে তুলনায় এ খাতগুলো উন্নত হচ্ছে—এমনটি লক্ষ করা যায় না। এ অর্থ যদি উপযুক্তভাবে বিশ্লেষণ করে অন্যান্য খাতে ব্যয় করা হয়, তাহলে সংকটকালে বেশি পরিমাণ রিটার্ন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি প্রকল্প গ্রহণ থেকে প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যন্ত তিন স্তরবিশিষ্ট একটি প্রকল্প মূল্যায়ন কাঠামো কার্যকর রাখার ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অন্য মন্ত্রণালয়গুলোকে অবহিত করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কাঠামো উপস্থাপন করা প্রয়োজন, যেখানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেয়া, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত এবং কীভাবে দুর্নীতি রোধ করা যাবে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকবে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দাতা সংস্থা প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে ধরনের মনিটরিং, অ্যাকাউন্টিবিলিটি এবং ট্রান্সপারেন্সি সিস্টেম ব্যবহার করে, সে ধরনের গ্রহণযোগ্য কোনো আন্তর্জাতিক মনিটরিং সিস্টেম বাংলাদেশেও চালু করা আবশ্যক। ব্যয় সংকোচনের বিষয়টিকে আগামী দিনে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। সেক্ষেত্রে শুধু অর্থ ছাড়করণ কমানোর বিষয়টিই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং যেসব উদ্যোগে অর্থ বরাদ্দ হচ্ছে তা উপযুক্তভাবে ব্যয় হচ্ছে কিনা, যে হিসাব মতে অর্থ নেয়া হচ্ছে, সে হিসাবগুলো যৌক্তিক কিনা, যে সময়কালের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে তা নির্ধারিত সময়কালের মধ্যে শেষ হচ্ছে কিনা, যারা এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত, তারা পুরোপুরি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি অনুসরণ করছে কিনা, এর মধ্যে কোনো অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতি আছে কিনা—সে বিষয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা আগামী দিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত। খেয়াল রাখতে হবে, ব্যয় সংকোচন করতে গিয়ে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ খাতের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত না হয়। যেমন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় অব্যাহত রাখতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে অপ্রয়োজনীয় খাত র্যাশনালাইজেশন করতে জনপ্রশাসন সংস্কারের উদ্যোগও নিতে হবে।










