উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো গত ৪০ বছরে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির সম্মুখীন হয়েছে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ১২ মাসের হিসাব সমাপ্তিতে এটি ৯ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থানে ছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাজারগুলোয় মূল্যস্ফীতির দিকটি যেভাবে প্রতিস্থাপিত হচ্ছে তাতে মূল্যবৃদ্ধি স্থির সমস্যা হিসেবে গণ্য হয়, যা গুরুত্বপূর্ণ এবং টেকসই আর্থিক নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাশা করে। বর্তমানে জাপান ব্যতীত বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার বাড়িয়েছে এবং আর্থিক হিসাবের প্রবৃদ্ধি স্থির অথবা বিপরীতমুখী করে দিচ্ছে।
এক্ষেত্রে কিছুটা দ্বিধা রয়েছে, ১৫ বছর পর নিম্ন সুদহারের এ নীতি পরিবর্তন করা কঠিন হবে। বিশেষ করে মন্দার কিনারে থাকা বৈশ্বিক অর্থনীতি এরই মধ্যে দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে। ধরে নেয়া হচ্ছে, চলতি বছরে বিশ্বের অর্থনৈতিক ঝুঁকি তীব্রতর হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ভূরাজনৈতিক উদ্বেগের বিষয়টি সামনে না এলেও এটি অনেকটা জটিল হয়ে যেতে পারে।
তবে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ কিছু চ্যালেঞ্জকে উদ্দীপ্ত করে, যা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিবেশ সংকটপূর্ণ হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার কারণ হিসেবে গণ্য হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে সুদহারের প্রায়োগিক নীতি বিশ্ব অর্থনৈতিক কেন্দ্র যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৮-০৯ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে অব্যাহতভাবে নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সুদহার ১৮০০ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কমপক্ষে চার বছর ধরে নেতিবাচক অবস্থানে ছিল। এক্ষেত্রে প্রথম দুই ভাগ বিশ্বযুদ্ধ চলার সময় এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৭৪-৮০ সালে ওপেকের তেল বাণিজ্যে ধাক্কার ফলে হয়েছে। এ তিন ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রে গড় মূল্যস্ফীতি ৭-১৫ শতাংশের মধ্যে ছিল এবং মূল্যস্ফীতি মোকাবেলার জন্য সুদহার পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছিল।
বর্তমানে সুদহারের অবস্থান আগের সময়ের চেয়েও দীর্ঘকালব্যাপী রয়েছে। এছাড়া অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির দেশেও সুদহার অনেক নেতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। ইউরোপ ও জাপানে দীর্ঘদিন ধরে সুদহার নেতিবাচক ছিল। এটি একটি ঐতিহাসিক নতুনত্ব ছিল বটে।
আরেকটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সম্প্রতি ‘দীর্ঘ সময়ের জন্য নিম্নমুখী’ সুদহারের সময়ে উন্নত অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো প্রচুর পরিমাণে সরকারি অথবা সরকারের মধ্যস্থতায় ঋণ নিয়েছে, যা নতুন শান্তিপূর্ণ সময়ের প্রমাণ বহন করে। যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবের স্থিতিপত্রগুলো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট শেষ হওয়ার পর কিছুটা সংকুচিত হয়েছে, সেগুলো সংকটের আগের সময়ের তুলনায় কভিড-১৯ মহামারীর সময় ফুলেফেঁপে উঠেছে।
উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও এ ব্যতিক্রম পদক্ষেপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ফান্ডের ক্ষেত্রে ১২ মাসের মূল্যস্ফীতির হার ৮ শতাংশের নিচে রয়েছে। ঠিক যেমন ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিহার যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ফান্ড রেটের নিচে থাকলেও ইউরো জোনের মূল্যস্ফীতি ডাবল ডিজিটের কাছাকাছি অবস্থানে স্থিতিশীল আছে।
এ পটভূমির বিপরীতে সুদহার পুনরুদ্ধার মূল্যস্ফীতিকে স্থিতিশীল রাখে। এক্ষেত্রে নীতিনির্ধারক ও বাজারে অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যাশার চেয়ে আর্থিক নীতি দীর্ঘমেয়াদে আঁটসাঁট রাখার প্রয়োজন হতে পারে। এটি এখনো স্পষ্ট হয়নি যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের প্রতিশ্রুতিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল হওয়ার মুখে আঁটসাঁট রাখবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সত্তরের দশকে মূল্যস্ফীতির অস্তিত্ব যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের অতিক্ষুদ্র ও অতিবিলম্ব এবং আঁটসাঁট প্রক্রিয়ার দোদুল্যমান প্রবণতাকে আংশিকভাবে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম।
এক্ষেত্রে পুরনো অভিজ্ঞতা অন্য এক ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। আর সেটা হলো নির্দিষ্ট আয় বা বন্ডের বাজারে অস্থিরতার প্রত্যাবর্তন। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্যে সংঘটিত অর্থনৈতিক অস্থিরতা এর একটি চাক্ষুষ উদাহরণ। ফলে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড বাধ্য হয়ে জরুরি ভিত্তিতে বন্ড কেনাকাটার কর্মসূচি চালু করেছিল।
বেপরোয়া সুদহার বৃদ্ধিতে বৈশ্বিক বাজারে দ্রব্যমূল্যের অস্থিরতার ঘটনা স্বাভাবিক। তবে বন্ডের বাজারে অস্থিরতা আগুনে ঘি ঢালার মতো ব্যাপার। মূল্যস্ফীতি বাড়াতে এর ভূমিকা আরো বেশি। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোয় মূল্যস্ফীতির হার ২০০৮-২১ সালের তুলনায় ১৯৭৪-৮৯ সময়ে প্রায় সাত গুণ বেশি ছিল।
এর মানে হলো, স্থির অতিনিম্ন সুদহারের যুগে বন্ডের বাজারে অস্থিরতা ক্রমান্বয়ে কমেছে। ২০০৮ সালের পর উন্নত অর্থনীতিতে নিম্ন ও স্থিতিশীল মূল্যস্ফীতির হার বিনিময়মূল্য কমানোর ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। যেমনটি কেনেথ রোগফ, ইথান ইলজেতস্কি ও আমি দেখিয়েছিলাম।
স্থির
অতিনিম্ন সুদহার
আর্থিক ভারসাম্য
তৈরি করে।
বেসরকারি খাত ও সরকারকে
ঋণ নেয়া
এবং মুনাফা
অর্জনের ক্ষেত্রে
বড় ধরনের
ঝুঁকি নিতে
উৎসাহ জোগায়।
কেননা এতে সম্পদের মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা বাড়ে। যদিও
অতিনিম্ন সুদহার
সরকারের আর্থিক
অবস্থাকে কৌশলগতভাবে শক্তিশালী করে তোলে।
তবে এ রকম পরিস্থিতি
পেনশন তহবিলের
সচ্ছলতা কমিয়ে
অফ ব্যালান্স
শিটের ক্ষতি
আরো বাড়াতে
পারে। বিশেষ
করে এতে স্থানীয় সরকার
পর্যায়ের আর্থিক
সক্ষমতা কমে যাবে। এছাড়া
দীর্ঘ সময় সুদহার কম থাকায় কিছু
কিছু ক্ষেত্রে
আর্থিক শৃঙ্খলা
দুর্বল ও পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াও বিলম্বিত হয়েছে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে ইতালির মতো উচ্চঋণগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য নেতিবাচক সুদহার সহায়ক হবে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাপক ঋণ ক্রয়ের মাধ্যমে ঋণ পুনর্গঠন প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে।
বার্তাটি স্পষ্ট, দীর্ঘস্থায়ী ঋণাত্মক সুদহার থেকে বেরিয়ে আসার ঝুঁকি মন্দা পরিস্থিতি তৈরির বাইরেও প্রভাব রাখতে পারে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যখন এ ঝুঁকিগুলো প্রকাশ্যে আসবে তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কীভাবে মোকাবেলা করবে?
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা কমেছে বলে মনে হচ্ছে। এর মানে এই নয় যে আইনত নেই, কিন্তু প্রায়োগিকভাবে বিদ্যমান হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, যেহেতু কর্মকর্তারা তাদের কর্মের ফলগুলো বিবেচনা করছেন। যদি উদ্দেশ্য সাধনের কারণে সরকারি ও বেসরকারি খাত ঝুঁকির সম্মুখীন হয় এবং এতে আর্থিক স্থিতিশীলতা সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি হয়, তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কি আবারো আবাসন খাতের দিকে ফিরে যাবে? এক্ষেত্রে যদি বাজারধসের সম্ভাবনা দেখা দেয় বা সার্বভৌম দেউলিয়াত্ব আসন্ন মনে হয় তাহলে কী করণীয় রয়েছে (যেমনটা ইউরো জোনে ঘটতে পারে)? এক্ষেত্রে দ্রষ্টব্য, নেতিবাচক সুদহার সত্তরের দশকে অপূর্ণ থাকা অবস্থা থেকে বের হওয়ার আগে দেশগুলোর অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতির বছরগুলো সহ্য করেছিল।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২০২৩ সালে আরো ঝুঁকি আবির্ভূত হতে পারে। চীন সর্বশেষ বৈশ্বিক সংকট-পরবর্তী বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালকের ভূমিকায় থাকলেও সেই চীন আর্থিক ও রাজনৈতিক ভঙ্গুরতার সঙ্গে লড়াই করছে। আঁটসাঁট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা স্বল্পমেয়াদে উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে। মূলত যাদের বড় আকারের ঋণ রয়েছে তারা আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি নিম্ন আয়ের দেশগুলো সংকটের ঝুঁকিতে রয়েছে বা সংকটের মাঝে অবস্থান করছে।
কিন্তু দীর্ঘ সময় নিম্নগামী থাকা সুদহারের ফলে সৃষ্ট ঝুঁকি থেকে উত্তরণে বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি দেশগুলোর মধ্যে অসমতা বাড়িয়ে দেয়। সব মিলিয়ে বলতে হয়, সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে এটি একটি চ্যালেঞ্জিং সময়, যা বিরাট অবমূল্যায়ন তৈরির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হতে পারে।
[স্বত্ব:প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
কারমেন এম রেইনহার্ট: বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম বিভাগের অধ্যাপক
ইংরেজি থেকে ভাষান্তরিত










