মোটরসাইকেল বর্তমানে দেশে যাতায়াতের অন্যতম জনপ্রিয় ও সহজ একটি বাহন। উচ্চ, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশে মোটরসাইকেলের বিক্রি বেড়েছে। নগরবাসী ও অফিসগামীরা রাস্তায় যানজট এড়িয়ে সহজে গন্তব্যে পৌঁছতে মোটরসাইকেল ব্যবহার করছেন। প্রান্তিক পর্যায়ে গ্রামের কাঁচা-পাকা রাস্তায় কৃষি উত্পাদন ও বিপণনকাজে এবং ব্যবসায়িক ও দাপ্তরিক কাজে যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম মাধ্যম মোটরসাইকেল। এমনকি ‘জরুরি প্রয়োজনে জীবন বাঁচাতে মোটরসাইকেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে’—এ ধরনের শিরোনামের খবর আমরা মাঝেমধ্যেই দেখতে পাই। মোটরসাইকেল যে শুধু ব্যক্তি নিজের প্রয়োজনে কেনে, সব সময় সেটা ঠিক নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের জন্য মোটরসাইকেল কিনে থাকে। বিশেষ করে ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য উত্পাদনকারী কোম্পানিগুলো তাদের বিপণন কর্মকর্তাদের মোটরসাইকেল সরবরাহ করে। করোনাকালে মোটরসাইকেলের ব্যবহারে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে করোনা ভ্যাকসিন প্রদানে যে সফলতা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে এটি পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে মোটরসাইকেল।

যানজট বৃদ্ধিজনিত কারণে ও মানসম্পন্ন গণপরিবহনের অভাবে রাইডশেয়ারিং জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় মোটরসাইকেলের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। রাইডশেয়ারিং থেকে দেশে লাখো বেকার ছাত্র-যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। মোটরসাইকেল কোনো বিলাসবহুল পণ্য নয়, বরং এটি এখন মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় বাহন।

সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সরকার মহাসড়কে মোটরসাইকেল চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। পবিত্র ঈদুল আজহার আগের তিনদিন, ঈদের দিন ও ঈদের পরের তিনদিন সারা দেশের মহাসড়কে যৌক্তিক কারণ ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো যাবে না। পাশাপাশি এক জেলায় রেজিস্ট্রেশন করা মোটরসাইকেল অন্য জেলায় চালানো যাবে না। তবে যৌক্তিক ও অনিবার্য প্রয়োজনে পুলিশের অনুমতি নিয়ে মোটরসাইকেল চালানো যাবে। এ কথা ঠিক, সাম্প্রতিক সময়ে মোটরসাইকেলের দেশীয় শিল্পের বিকাশের কারণে এর সংখ্যা বেড়েছে। সরকারও মোটরসাইকেল শিল্পকে এগিয়ে নিতে উদ্যোগী। উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে অন্তত নয়টি মোটরসাইকেল কারখানা করেছেন, বিনিয়োগ করেছেন প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। মোটরসাইকেল উত্পাদন, বিপণন ও অন্যান্য কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রায় দুই লাখ পরিবার। ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ছিল সাড়ে সাত লাখের মতো। বর্তমানে তা পৌঁছেছে সাড়ে ৩৭ লাখে। অর্থাৎ গত এক যুগে মোটরসাইকেল বেড়েছে প্রায় ৩০ লাখ। বিশেষ করে ২০১৬ সাল থেকে ভাড়ায় চালিত (রাইডশেয়ারিং) মোটরসাইকেল চলতে দেয়া ও ২০১৭ সালে সরকারের প্রগতিশীল মোটরসাইকেল নীতিমালার ফলস্বরূপ এ সংখ্যা বেড়েছে। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সংখ্যাও বেড়েছে। আমাদের ভাই, বন্ধু, নিকট স্বজন আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন, যার একটিও আমাদের কাম্য ছিল না। এ দুর্ঘটনার প্রতিটি ক্ষেত্রেই কি মোটরসাইকেল চালক দায়ী?

গত ঈদুল ফিতরে লাখ লাখ মানুষ মোটরসাইকেলেই গ্রামের বাড়িতে গিয়েছে। গত ২৭ এপ্রিল রাত ১২টা থেকে ৩০ এপ্রিল রাত ১২টা পর্যন্ত ৭২ ঘণ্টায় ২১ হাজার ৩৬০টি মোটরসাইকেল বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু পারাপার হয়। ১৯৯৮ সালের জুনে সেতুটি চালু হওয়ার পর তিনদিনের হিসাবে এত বিপুলসংখ্যক মোটরসাইকেল এর আগে কখনো পারাপার হয়নি। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিদিন এক-দেড় হাজার মোটরসাইকেল বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়। অন্যদিকে ২৬ জুন পদ্মা সেতু চালুর পর একদিনেই ৪৫ হাজারের মতো মোটরসাইকেল চলাচল করেছিল (অধিকাংশই সেতু দেখতে যাওয়া পর্যটক)। বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনায় দুজনের মৃত্যুর পর ২৭ জুন থেকে সেতু দিয়ে মোটরসাইকেল পারাপার বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, উত্সুক কয়েকজন জনতাকে রক্ষা করার চেষ্টার কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটে। আর এর পুরো দায় মোটরসাইকেল চালকের ওপর দেয়া হয়।

মূলত বাস মালিক-শ্রমিক সংগঠন ৩ জুলাই আন্তঃজেলা সড়কে মোটরসাইকেল বন্ধের দাবি করার পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত কিনা তা জনমনে এক বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোটরসাইকেল দূরপাল্লার যাত্রায় গণপরিবহনের তুলনায় ‘আকর্ষণীয়’ বিকল্প হয়ে ওঠল কেন? এ প্রশ্নের উত্তর গভীরে গিয়ে খুঁজতে হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, ঠিক যে যে মৌলিক কারণে আন্তঃজেলা যাতায়াতে মোটরসাইকেল বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে, সেসব সমাধান করা হয়েছে কি? মহাসড়কে কিংবা পদ্মা সেতুতে মোটরসাইকেল চলাচলের গতিবেগ ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ না করে, সেতুতে গাড়ি পার্কিং নিষিদ্ধকরণ বাস্তবায়ন না করে মোটরসাইকেল নিষিদ্ধ করলেই দুর্ঘটনার সমাপ্তি হবে? মোটরসাইকেল যে নগরে ও নগরের বাইরের দূরপাল্লার যাত্রায় যাত্রীবাহী গণপরিবহনের ‘আকর্ষণীয়’ বিকল্প হয়ে ওঠল, তার সমাধান না করে একতরফা মোটরসাইকেল নিষিদ্ধ করা একমাত্র সমাধান হতে পারে না।

সবার আগে খতিয়ে দেখা উচিত, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সড়কে দুর্ঘটনার কারণ এবং তা থেকে পরিত্রাণ পেতে কী করণীয়। নিরাপদ সড়কের দাবি এখন পুরো জাতির। আর তার জন্যই আমাদের কাজ করা উচিত। আমরাও চাই প্রতিটি মোটরসাইকেল চালক বৈধ লাইসেন্স ব্যবহার করুক। কিশোর/অপ্রাপ্ত বয়সের কাউকেই মোটরসাইকেল চালাতে দেয়া উচিত নয়। এসব বিষয়ে আমাদের সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। সেই সঙ্গে মোটরবাইকের মতো স্বাধীন যানবাহন নিয়ে যাতে মানুষ নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছতে পারে এবং দেশে এ শিল্পের ব্যবসায়িক সমৃদ্ধি ও প্রসার হয়, সে লক্ষ্যেই যথোপযুক্ত সিদ্ধান্তই সরকারের নেয়া উচিত। সরকার, গণমাধ্যম, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণ একযোগে কাজ করলেই কেবল দেশে নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়ন করা সম্ভব। নিয়ম মেনে ও নিজে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে মোটরসাইকেল চালালে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। এক্ষেত্রে মোটরসাইকেল চালকের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের রাস্তায় চলাচল ও অন্য পরিবহনের চালকদেরও সচেতনতা বাড়াতে হবে। কোনো কিছু বন্ধ করে দেয়া একমাত্র সমাধান হতে পারে না। আমাদের জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণে যেকোনো সিদ্ধান্তকে আমি সাধুবাদ জানাই। পাশাপাশি যাদের জীবন ও জীবিকার স্বার্থে এ মোটরসাইকেল ওতপ্রোতভাবে জড়িত সে বিশাল গোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে সামগ্রিকভাবে একটি সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা একটি সময়োচিত দাবি বলে আমি মনে করি।

লেখক: সিইও, টিভিএস অটো বাংলাদেশ লিমিটেড