বাংলাদেশে যখন বন্যা হয় তখন জমিতে প্রচুর পলি মাটির আবির্ভাব ঘটে। পানি শুকাতে শুরু করে আর পলি মাটিতে ভরাট হয় জমি। আমার বাড়ি নহাটা—নহাটা মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার নহাটা ইউনিয়নের একটি গ্রাম। গ্রামের পাশে রয়েছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিল, নাম ইছামতী। আমাদের ইছামতী বিলের মাঝে আছে এক বড় পুকুর।

সীতারাম নামে এক রাজা রাজত্ব করতেন আমাদের এলাকায় কোনো এক সময় (১৬৫৮-১৭১৪)। মাগুরার প্রামাণ্য ইতিহাসের নায়ক ভূষণা তথা মহম্মদপুরের (বর্তমান মহম্মদপুর উপজেলা) রাজা সীতারাম রায়। বাংলার যেসব খ্যাতনামা জমিদার দেশের স্বাধীনতা রক্ষার্থে ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, তার মধ্যে রাজা সীতারাম রায় ছিলেন অন্যতম। রাজা তার প্রজাদের নিয়ে যখন কোথাও রওনা হতেন, শুনেছি চলার পথে তিনি অনেক আকস্মিক কাজ করতেন।

সীতারাম রাজার রাজত্বের মধ্যে ছিল এ ইছামতী বিল। রাজা মাঝেমধ্যে তার প্রজাদের নিয়ে বিলের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে যেতেন। হঠাৎ তিনি একদিন ইছামতীর বিল পাড়ি দিচ্ছিলেন। বিরাট বিল, পাড়ি দিতে সবাই ক্লান্ত, পথে পানীয়জলের কোনো ব্যবস্থা নেই। কী করা? শেষে সিদ্ধান্ত নিলেন যে তিনি বিলের মাঝখানে একটি বড় পুকুর খনন করবেন এবং যে চিন্তা সেই কাজ।

বিলের মাঝখানে তিনি একটি বড় পুকুর খনন করেছিলেন। সেই পুকুর সময়ের সঙ্গে পলি মাটিতে ভরাট হয়ে ধীরে ধীরে চাষের জমিতে পরিণত হয়ে যায়।

এ জমিতে যা ফলানো হয় তাই ফলে। কারণ পলি মাটি জমির উর্বরা শক্তি বাড়ায়। বন্যা যেমন জনজীবনের ক্ষতি করে, তেমনি উপকারও করে।

মজার ব্যাপার হলো, আমার বড় ভাই প্রফেসর ড. মান্নান মৃধা কয়েক বছর আগে সেখানে আরো বড় করে একটি পুকুর খনন করেন। উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশে একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় করার। যেখানে থাকবে আইসিটি রিলেটেড প্রযুক্তি, সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর গবেষণা কেন্দ্র—প্রোটিন, আমিষ, নিউট্রিশন, স্বাস্থ্য ইত্যাদির ওপর। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একত্র করে গবেষণা থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ দেয়া এবং তা বাস্তবে রূপান্তর করা ছিল এ বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য। শুধু থিওরি নয়, বাস্তবতার সঙ্গে অন দ্য জব ট্রেনিংয়ের মধ্য দিয়ে লার্নিং বাই ডুয়িং এবং লার্নিং ফ্রম লারনার্স কনসেপ্টের সমন্বয়ে গড়ে উঠবে এই বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়। তখন এর নাম প্রস্তাব করা হয় Nohata University of Health care and Agricultural Technology (NUHAT)।

প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনার সঙ্গে কাজের বেশ অগ্রগতি হতে থাকে। স্থানীয় অনেকেই ছোটখাটো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। কেউ আবার কিছু জমি অদলবদল করে। কেউ কিছু জমি বিক্রি করে এবং কিছু লোক জমি ডোনেশন দেয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম তত্কালীন থ্রিজিসহ ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করা হয় এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণে এবং সেটা সম্ভব হয় সুইডেনের রয়েল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি ও গ্রামীণফোনের সমন্বয়ে। পারিবারিক জমি ও ফান্ডিং থেকে পুকুর কাটা, বিভিন্ন মাছের চাষ, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল, নানা ধরনের শাকসকজির চাষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ধানের ওপর নতুন প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে পাইলট প্ল্যানের মাধ্যমে কাজ শুরু করা হয়।

টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে বিদেশী চিকিৎসকের সঙ্গে স্থানীয় চিকিৎসকের সমন্বয় করে নিয়মিত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশী প্রশিক্ষকও আনা হয়। কিন্তু দেখা গেল বাংলাদেশের প্রশিক্ষণের যে ধরন তা সেই পুরনো প্রথানুযায়ী চলছে, তাতে ওই ধরনের অর্থাৎ বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করার মতো পরিবেশ দেশে হয়নি তখন। এদিকে সরকার থেকে কোনো সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা তখনো ছিল না।

কোনো উপায় না দেখে যারা কিছু জমি দিয়ে সাহায্য করেছিল, তাদের অর্থ বা জমি ফেরত দিয়ে সব ঝামেলার অবসান ঘটাতে হয়। এছাড়া নানা বাধাবিঘ্নের সম্মুখীন হতে হয়। যেমন কম্পিউটার চুরি, গরু চুরি, মাছ চুরি, ধান চুরি। শুধু চুরি আর চুরি।

শেষে বড় আকারের অর্থনৈতিক ক্ষতিগ্রস্ত হই আমরা। কয়েক বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কাজের ইতি টানা হয়। তবে আমার বড় ভাই সুশিক্ষায় বিশ্বাসী বিধায় শুরু থেকে শিক্ষা, কী শিক্ষা, কেন শিক্ষা, কীভাবে শিক্ষা এর ওপর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

বর্তমানে তার একটি কিন্ডারগার্ডেন রয়েছে। যেখানে তিনি শিক্ষার বীজ বপন থেকে তার যাত্রা শুরু করেছেন। আমাদের সেই বড় পুকুরের আশেপাশে এখনো প্রতি বছর অন্যান্য ফসলের মতো প্রচুর ধান হচ্ছে নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে। ধান বাড়িতে এনে তা খড় থেকে ছাড়িয়ে রোদে শুকানো হয়। পরে ধান সেদ্ধ করা হয়। সেদ্ধ ধান রোদে শুকিয়ে ঢেঁকি ছাঁটা বা মেশিনে ছেঁটে তুষ-কুড়া ছাড়িয়ে চাল বের করা হয়। সেই চাল সেদ্ধ করে ভাত রান্না করা হয়। পরে পেট ভরে সেই ভাত খাওয়া সে এক মজার ব্যাপার।

কী পরিমাণ শক্তি বা পুষ্টি এ ভাতের মধ্যে আছে তা আজকের যুগে বের করা খুবই সম্ভব। এ ধানের বীজ বপন থেকে ভাত খাওয়া পর্যন্ত সময়ের মধ্যে রয়েছে নানা ধরনের পদক্ষেপ বা ধাপ। এখন এ ভাত পেটে ঢুকল। হজম হয়ে শরীরের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে গেল। বাকিটা বর্জ্য হিসেবে বের হয়ে জৈব সারে পরিণত হলো। খাবারের মধ্যে রয়েছে নানা ধরনের পুষ্টি, শক্তি এবং আরো কিছু—শরীর তার মতো করে রক্তের মধ্য দিয়ে যেখানে যা দরকার পৌঁছে দিচ্ছে।

বীজ বপন থেকে শুরু করে শরীরের শেষ পর্যন্ত ধাপকে ধরতে পারি একটি প্রসেস হিসেবে। এর শুরু থেকে শেষের মাঝখানে রয়েছে বিভিন্ন ধাপ এবং তার জন্য রয়েছে কিছু মাধ্যম, যেমন শ্রমিক, পানি, সূর্যের আলো, বাতাস, তাপমাত্রা, জায়গা এবং শরীরের বিভিন্ন অংশ ও তাদের সক্রিয় ভূমিকা। শুরু থেকে শেষ প্রসেস এবং বিভিন্ন ধাপের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সময়। সময় আবার দুই প্রকার। পুরো সময় এবং অংশবিশেষ সময়।

আমার উপরের বর্ণনা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার। তা হলো ইট-পাথর দিয়ে তৈরি বিশ্ববিদ্যালয় করে কী হবে যদি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য পূরণ না হয়! বিশ্ববিদ্যালয় হয়নি বলে শিক্ষা থেমে নেই। ডিজিটাল যুগে থেমে থাকতে পারে না সুশিক্ষা। তাই গ্রামের কৃষকের বীজ বপন থেকে শুরু করে ভাত পেটে যাওয়া পর্যন্ত ধাপগুলোকে যদি একত্র করি তাহলে হয়ে গেল সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট। কারণ এখানে রয়েছে ল্যান্ড, লেবার, অর্গানাইজেশন, ক্যাপিটালসহ অর্থনীতির মূল দিকগুলো। সাপ্লাই মানে কোনো জিনিস এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে দেয়া। চেইন মানে যুক্ত করা, যেমন স্টেপ বাই স্টেপের সমন্বয়। ম্যানেজমেন্ট মানে পুরো জিনিসগুলো যেন সিস্টেমের সঙ্গে চলে—শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। যিনি এ দায়িত্বে কাজ করেন তাকে বলা হয় ম্যানেজার। যারা কাজ করেন তারা কর্মচারী। ম্যানেজার পরিচালনা করেন এবং ম্যানেজার হতে পারেন অনেক রকমের, নির্ভর করছে তার দায়িত্ব ও কর্তব্যের ওপর।

এ বিষয় (সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট) পড়তে অনেকে যান হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন বিজনেস স্কুল বা স্টকহোম স্কুল অব ইকোনমিকসে। হ্যাঁ, শিক্ষার জন্য যেকোনো দেশে যাওয়া যেতে পারে। তবে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কিন্তু শেখা এবং জানা। তাই আমরা যে যেখানে আছি, যদি কিছু শিখতে চাই, তা অবশ্যই সম্ভব। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন বাধাবিঘ্নকে ভাবনায় ঢোকানো এবং তা থেকে সমাধান বের করাই কিন্তু আসল শিক্ষা।

আমার মনে হয় প্রশিক্ষণ এমন করে অনেক জটিল বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রকৃত জ্ঞানের আলো দিতে পারে। এজন্য দরকার মোটিভেশন ও ডেডিকেশন। একইভাবে আমরা যদি নিজেদের শরীরকে নিয়ে ভাবি তাহলে অনেক কিছুই শিখতে পারি। আমরা যারা আমাদের শরীরকে সুন্দর করে ম্যানেজ করতে শিখেছি, তারা সুস্থ রয়েছি। জীবনে বেঁচে থাকার জন্য সমাজের নানা অসুস্থ পরিবেশকে আমরা ইচ্ছা করলে উপেক্ষা করতে পারি। এই পারা না-পারার দায়িত্ব আমাদের নিজেদের ওপর নির্ভর করছে। জীবনের পাঠশালা থেকে যে দৈনিক শিক্ষা আমরা পেয়ে থাকি তা কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য শ্রেষ্ঠ শিক্ষা।

আমরা কি সত্যিকারার্থে আমাদের জানতে চেষ্টা করছি? এ প্রশ্নের উত্তর শুধু আমরাই জানি। ডিজিটাল যুগে স্মার্টফোনের মাঝে রয়েছে সেই বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে পেতে পারি সব অজানা তথ্য। শেখার শেষ নেই যেমন, কৌতূহলেরও শেষ নেই তেমন। সবার আগে সর্বশেষ শেখার যেন না হয় শেষ, আসুন নতুন করে শিখি।

 রহমান মৃধা: সাবেক পরিচালক (প্রডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন