[গতকালেরপর]

স্বাধীনতা-উত্তর সময় থেকে এখন পর্যন্ত আমরা কি অথবা বিশ্ববিদ্যালয় দূরে থাক, আমাদের একেবারে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন কতটুকু করতে পেরেছি? এ উন্নয়ন বলতে আমরা একটা ‘মানসম্মত’ শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলছি এবং শিক্ষার গুণগত উত্কর্ষের বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিতে চাচ্ছি অতীত ও বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক বাস্তবতার ভেতর।

একটা সমাজ এবং রাষ্ট্রের দক্ষ জনশক্তি বৃদ্ধিতে সবার আগে তার শিক্ষা মান এবং শিক্ষার গুণগত উত্কর্ষ সহায়ক হয়। তাছাড়া দক্ষ জনশক্তি ছাড়া কোনো জাতির উন্নয়নের অগ্রগতিও কঠিন হয়ে যায়। কিছুটা উন্নতি হলেও সেটাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বলা যায় না, সেটা টেকসই হয় না। শিক্ষার প্রাথমিক উদ্দেশ্য সফল করতে হলে দেশের সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষার পরিবেশের সুরক্ষা প্রয়োজন। এটা দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমরা এখন পর্যন্ত একটা সর্বজনগ্রাহ্য শিক্ষা পদ্ধতি এবং শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়নও করতে পারিনি। প্রধানত পারিনি আমাদের নিজেদের নানা শ্রেণীদ্বন্দ্ব এবং শ্রেণীবিদ্বেষের রাজনৈতিক কারণে।

এরপর প্রশিক্ষণের ব্যাপার তো আছেই। শিক্ষার সঙ্গে যেটুকু নীতি-আদর্শের বিষয় সংশ্লিষ্ট সে ব্যাপারেও আমাদের আগ্রহ এবং ইতিবাচক ভূমিকা বলতে গেলে খুব সীমিত। শিক্ষকদের শিক্ষার মান থেকে শুরু করে তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক টানাপড়েন বিষয়ে আমরা শিক্ষকদের অস্তিত্ব সংকট থেকে তাদের সেভাবে মুক্ত করতে পারিনি। তাদের সঠিক প্রশিক্ষণ দিতেও না। তাই শিক্ষার্থীদের শুরুটাও যে সংকট এবং সমস্যার মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠেছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে সেটা একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে বর্তমান যুগে আশা করাও কঠিন।

শিক্ষ ক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় বাজেটের ব্যয় খুব সামান্য। অগ্রাধিকার তার চেয়েও সামান্য। এসব বাস্তবতার কারণে আমাদের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উত্কর্ষ দুর্বল। নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব এবং সমাজ এবং রাষ্ট্রের নাগরিকদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের আচার-আচরণ, প্রায়োগিক কৌশল, বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল্যায়ন প্রয়োজন। সেটা হয়নি। এর কিছু প্রতিফলন আমরা বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক চিত্রেই দেখতে পারি।

এসব সমস্যা ও সমস্যার সমাধানে আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের এবং শিক্ষকদের সঠিক কোনো দিক-নির্দেশনাও দিতে পারছি না। এর প্রভাব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ করে বর্তমান সময় খুব বেশিভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। একটা সমাজ এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে যে অরাজকতা এবং নানা ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি বাড়ছে এখন, সেখানে দাঁড়িয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটু গভীর দৃষ্টি দিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, এর বর্তমান অবস্থা খুবই জীর্ণ,  দুর্বল ও হতাশাপূর্ণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষার্থী প্রতি বছর আসছেন তাদের প্রত্যেকের সামাজিক স্তরবিন্যাস এবং শিক্ষার মান নিয়েও আলোচনা করি, মনে হয় না কেউ আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটা বিশ্ববিদ্যালয় মানের বলে স্বীকৃতি দিতে পারবেন। পাশাপাশি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শিক্ষার পরিবেশ’ কতটুকু বিরাজ করছে এতেও সন্দেহ আছে।

আমাদের তুলনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন বিভাগ, অনুষদ, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের সংখ্যার অনেক বড় পরিবর্তন হয়েছে। এ পরিবর্তনটাও স্বাভাবিক। আমাদের সময় দেশের সমগ্র জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি। বর্তমানে জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যাও স্বাভাবিক নিয়মেই বাড়বে। কিন্তু সে তুলনায় গুণগত কোনো পরিবর্তন হয়নি, বরং সেটা একটা বড় রকমের হতাশা এবং অন্ধকারের মধ্য দিয়েই চলছে বলা যায়।

আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম, শিক্ষার্থী সংখ্যা বড়জোর ১৬-১৮ হাজার হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা আনুমানিক ৪০ হাজার বলে অনেকেই ধারণা করেন। বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘অনুষদ’ সম্ভবত ১০টি হবে। বিভাগ ৮০’র ওপরে। শিক্ষক আছেন প্রায় ১৮০০-২০০০। এখন দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও প্রায় ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। সে তুলনায় আমরা ‘শিক্ষিত’ হতে পারছি কতজন! প্রাথমিক থেকে উচ্চ পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইংরেজির দাপট প্রচণ্ড। একটা রাষ্ট্র এবং সমাজের কথিত শিক্ষিত নাগরিকরা যদি তাদের নিজের ভাষায় চিন্তা করতে না শেখেন, নিজের ভাষায় ঘুমাতে না পারেন, নিজের সংস্কৃতিকে না চিনতে পারেন তাহলে সে শিক্ষার মান কতটা বা উন্নত হতে পারে তা বলা কঠিন। এখনো বিশ্বের অনেক দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে হলে সে দেশের নিজস্ব ভাষাও শিখতে হয় সবার আগে, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে। আমাদের বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান চিত্র ক্রমান্বয়েই দুর্বল এবং তার অতীত গৌরব ও গর্বকেও হারাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিজেদের শিক্ষার গুণগতমান থেকেও অনেক পেছনে পড়ে যাচ্ছেন। এখানে শিক্ষক থেকে শুরু করে উপাচার্য নিয়োগ হয় এখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সরকারের দলের ইচ্ছা-অনিচ্ছায়। রাষ্ট্রীয় রাজনীতির এক প্রাথমিক কুরুক্ষেত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কম-বেশি এটা আগেও ছিল কিন্তু এতটা ন্যক্কারজনক এবং নিম্ন পর্যায়ে ছিল না। অতীতের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের মুক্তি এবং স্বাধীনতাযুদ্ধে এর ছাত্র-ছাত্রীদের যে গৌরবময় ভূমিকা আছে সে রকম ছাত্র এবং শিক্ষক আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বলতে গেলে নেই।

লেখক এবং গবেষক আন্দালিব রাশদী। তার সদ্যপ্রকাশিত ‘সেঞ্চুরিয়ান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস ও স্মৃতি’ বইতে লিখেছেন, যাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্মৃতি ধারণ করে আমরা এখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ বলি অনেকেই, লেখক আন্দালিব বলতে চাচ্ছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার সার্বিক পরিস্থিতি, পরিবেশ এবং তেমন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ধরে রাখতে পারেনি।

‘আমাদের সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ সংঘটির অন্যতম উদ্যোক্তা আশুতোষ ভট্টাচার্য। ১৯৭৪-এ প্রস্তুতি সভায় সভাপতিত্ব করেন সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর রমেশচন্দ্র মজুমদার। তাদের প্রকাশনাটির সম্পাদক আশুতোষ ভট্টাচার্য। মেধাবী ছাত্র ও মেধাবী লেখক আশুতোষের জন্ম বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে। ১৯২৮ সালে আইএ পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি ও বাংলায় অনার্সে ভর্তি হন। তিনি ১৯৩১ সালে অনার্সসহ বিএ এবং ১৯৩২ সালে এমএ লাভ করেন। ‘আমাদের সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের’ সম্পাদক হিসেবে তখনই তিনি লিখেছেন, ‘ঢাকার রমনায় ছাত্র এবং শিক্ষক জীবনের যে নিরুত্তাপ পরিবেশ গড়িয়া উঠিয়া ছিল, কোলাহলময় এবং সমস্যাজর্জর কলিকাতা শহরে তাহার অবকাশ কোথায়..., একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাহা ছিল, তাহা আজ ফিরিয়া পাইবার উপায় নাই। আজ যেখানে ছাত্র এবং শিক্ষকের মধ্যে নিয়মিত হানাহানি চলিতেছে সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সে যুগের ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের কথা কাহাকেও বুঝাইয়া বলা যাইবে না’।

উল্লেখিত কথাগুলো বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একসময়ের কৃতী ছাত্র এবং ‘আমাদের সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘের’ অন্যতম উদ্যোক্তা আশুতোষ ভট্টাচার্য আজ থেকে অনেক বছর আগে। বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যেকোনো এর সাবেক এবং বর্তমান ছাত্রকেও যদি প্রশ্ন করা হয়, উল্লেখিত কথাগুলোর একটি ‘কমাও’ ভুল কিনা। কেউ সেটাকে ভুল বলতে পারবেন না।

এটাও না বললেই নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর, ফিলিপ হার্টগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, স্যার রমেশ চন্দ্র মজুমদারের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুদ্ধদেব বসুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কাজী মোতাহার হোসেনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ডক্টর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রফেসর রাজ্জাকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কবীর চৌধুরী, খোদেজা খাতুন, আজিজুন্নেসা, জাহানারা হক, সেলিনা বাহার জামান, মালেকা বেগম, বেগম শামসুয জাহান নূর, সরদার ফজলুল করিম, বদরুদ্দীন উমর, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, কবি শামসুর রাহমান, পাশাপাশি আমাদের সময়ের (১৯৭৬-৮১) সময়ের সঙ্গে এখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত এবং শিক্ষাগত মান, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক, শিক্ষক এবং উপাচার্যের শিক্ষাগত দক্ষতা ও যোগ্যতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এখনকার সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনা এ সবকিছুর গুণগত মানের বড় রকমের এক শূন্যতা এবং অভাব বিরাজ করছে।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র আমাদের জাতীয় জীবনের কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়। আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বলতে গেলে ‘ডাকসু’ অক্রিয়াশীল একটা প্রতিষ্ঠান। না আছে এখন এখানে কোনো সুস্থ আলোচনা এবং বিতর্কের ব্যবস্থা, না আছে ছাত্র-শিক্ষকদের সুসম্পর্ক, না  অগ্রজ এবং অনুজদের কোনো সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক। আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা মূলত রাষ্ট্রীয় রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হয়ে আছেন। চরম একটা হতাশা এবং অনিশ্চয়তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো পরিবেশ ও শিক্ষার ভবিষ্যেকও অন্ধকারের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে। এ অবস্থার কোন পরিবর্তন কখন ঘটবে বা কতটা দ্রুত ঘটতে পারে, রাষ্ট্র এবং সমাজের নীতিনির্ধারকরাই বলতে পারবেন। [শেষ]

 

মাহমুদ রেজা চৌধুরী: সমাজ ও রাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র (১৯৭৬-৮১)