নিরাপদ ও স্বাধীন চলাচল দেশের প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, কিন্তু আমরা দেখছি প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ তার স্বজনকে চিরতরে হারাচ্ছে, কেউ বা প্রতিবন্ধিতা বরণ করছে সড়ক দুর্ঘটনায়। জনবহুল কিন্তু ছোট দেশ হওয়ার ফলে এ দেশে রাস্তার আয়তন প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তাছাড়া যথাযথ যাত্রীবান্ধব পরিকল্পনার অভাবে গণপরিবহনও রয়েছে অপর্যাপ্ত। সেক্ষেত্রে দেশের সড়ক অবকাঠামো, পরিবহন ব্যবস্থা ও দক্ষ কর্মী গড়ে তোলায় রাষ্ট্রের উদাসীনতার ফলে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী এ দেশের প্রতিবন্ধী মানুষ। প্রতিদিন সড়ক চলাচলে ক্রাচ, হুইলচেয়ার ও সাদাছড়ি ইত্যাদি সহায়ক উপকরণ ব্যবহারকারী যাত্রীদের কী পরিমাণ দুর্ভোগ পোহাতে হয় তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। বিশেষত প্রবেশগম্য গণপরিবহনের অভাবে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মানুষদের অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষে ব্যক্তিগত বা ভাড়া গাড়ি ব্যবহার করতে হয়। ফলে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের কাউকে পেছনে ফেলে নয়, নীতির অনুসরণ যেন সড়ক পরিবহন খাতে এসে থমকে দাঁড়ায়। 

সরকার প্রতিবন্ধী মানুষের উপযোগী কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিলেও কিছু ক্ষেত্রে শুভংকরের ফাঁকি থেকেই যাচ্ছে। দেশে মেট্রোরেল, পাতাল রেল চালু হচ্ছে। সেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিনা ভাড়ায় ভ্রমণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশের দেশের শহরগুলো যেমন দিল্লি, জাকার্তা বা ব্যাংককের মেট্রোরেলে প্রতিবন্ধী মানুষেরা বিনা ভাড়ায় ভ্রমণ করতে পারেন। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় গত ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২-এর এক ঘোষণায় মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মেট্রোরেলে ভাড়া ছাড়ের বিষয়ে বললেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য এমন কোনো নির্দেশনা দেননি। এতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ। এছাড়াও সরকার ২০২১ সালের ডিসেম্বরে শিক্ষার্থীদের জন্য গণপরিবহনে অর্ধেক ভাড়ার বিধান রেখে প্রজ্ঞাপন জারি করে। কিন্তু প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য গণপরিবহনে অর্ধেক ভাড়া বা বিশেষ ক্ষেত্রে বিনা ভাড়ায় গণপরিবহনে ভ্রমণের বিধান এখনো দেয়া হয়নি। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ৩০ ডিসেম্বর, ২০২২ একটি ডিও লেটার জারি করলেও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় বা অন্যান্য কর্তৃপক্ষ এখনো তার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। এছাড়াও বিআরটিএ থেকে বাস ভাড়ার বিষয়ে নির্ধারণী সভায় এখনো কোনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনকে ডাকা হচ্ছে না। এমনকি তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কোনো বিবেচনাতেই নেয়া হচ্ছে না। 

সম্প্রতি ঢাকায় সড়ক পরিবহনের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে ই-টিকিট ব্যবস্থাপনা শুরু হয়েছে, কিন্তু সেখানে কোনো সারি দেখা যায় না, নেই কোনো কাউন্টার, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোনো যাত্রী ছাউনি নেই, ফুটপাতের সঙ্গে বাসে ভ্রমণের কোনো কার্বর্যাম্প নেই, সেখানে বেশির ভাগ সময় সারির বাইরে গিয়ে বাসগুলো যাত্রী নেয়ায়, সারিতে দণ্ডায়মান যাত্রীদের বিশেষত প্রতিবন্ধী যাত্রীদের নিদারুণ বিপদে পড়তে হয়। কারণ তারা দৌড়ে গিয়ে বাসে উঠতে পারেন না। বেশকিছু ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দেখলে বাসের হেলপার বা কন্ডাক্টর তাদের বাসে উঠতে দেয় না বা বাধা সৃষ্টি করে। অনেক সময় বাসে উঠতে পারলেও সংরক্ষিত আসনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে বসার কোনো সুযোগ দেয়া হয় না। বাসমালিক সমিতির মৌখিক এক ঘোষণা অনুযায়ী শহরের অভ্যন্তরে প্রতিটি বাসে দুজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে বিনা ভাড়ায় বাস ভ্রমণের সুযোগ দেয়া হলেও সেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে বিনাভাড়ায় বা অর্ধেক ভাড়া দেয়ার সময় কিছু ক্ষেত্রে লাঞ্ছিত হতে হয়। তাছাড়া বাস থেকে নামার সময়ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির যে অতিরিক্ত সময় লাগে, বাস শ্রমিকরা তা বিবেচনায় নিতে চায় না। ফলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বাসে উঠে এবং নামে। আমরা জানি, মুক্তিযোদ্ধাদের গাড়ি নিবন্ধন ফি মওকুফ করা হয়েছে, যা অত্যন্ত সাধুবাদযোগ্য, কিন্তু প্রতিবন্ধী সন্তানের অভিভাবক এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আয়ের ওপর করছাড়ের বিধান থাকলেও তাদের উভয়ের ক্ষেত্রে গাড়ি নিবন্ধন, নিবন্ধন নবায়ন ফি মওকুফ করা হলে অন্তত কিছু প্রতিবন্ধী মানুষের স্বাধীন ও অবাধ চলাচল নিশ্চিত হতো।

সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ বাহনের মধ্যে রিকশার সঙ্গে প্রযুক্তির ছোয়া যুক্ত হয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা এসেছে, কিন্তু ভুল নকশা, নীতি ও ব্যবস্থাপনা এবং সচেতনতার অভাবে তা এখন মরণ ফাঁদ হিসেবে পরিচিত হচ্ছে। প্রায়ই রিকশা দুর্ঘটনায় মানুষ আহত-নিহত হয়। তাতে মিডিয়া, সরকার ও কোর্ট ব্যাটারিচালিত রিকশাকে ব্যান করে দিয়েছে। কিন্তু প্রতিদিন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় যত নাগরিক আহত-নিহত হন তাতে তো কেউ মোটরসাইকেল নিষিদ্ধ করার কথা উঠছে না। কেবল গরিবের বাহন হওয়ায় তাতে ধনী ও শক্তিমানদের খড়্গ গিয়ে পড়ে তাদের ওপর। অথচ প্রচুর প্রতিবন্ধী মানুষ যারা কাজ করে খেতে পারত না, পরিবারের ওপর নির্ভরশীল ছিল বা রাস্তায় হাত পাত তো তাদের এখন একটি সম্মানজনক আয়ের উৎস হয়েছে। অথচ স্থানীয় ক্ষমতাবান  মানুষ, পুলিশ ও প্রশাসনের উত্পীড়নের কারণে আয়ের উৎসটি বন্ধ হতে চলেছে। সরকারকে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের শোভন কর্মসংস্থানের উৎস নিশ্চিত না করা পর্যন্ত সম্মানজনক আয়ের স্বাধীন পেশাকে স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে। উন্নত বাংলাদেশে আমরা কোনো মানুষকে ভিক্ষাবৃত্তিতে দেখতে চাই না।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্য চেঞ্জ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান) ২০১২ সালে আয়োজিত হুইলচেয়ার শোভাযাত্রায় যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রবেশগম্য বাস আমদানির প্রতিশ্রুতি দিলেও তার কোনো বাস্তবায়ন ১০ বছরেও আমরা দেখতে পাচ্ছি না। বিগত ১০ বছরে বিআরটিসির সঙ্গে নিয়মিত অ্যাডভোকেসি, মিটিং-সেমিনার করেও একটি প্রবেশগম্য বাস আমদানি সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে ২০১৮ সালের ২৮ আগস্ট তত্কালীন বিআরটিসির চেয়ারম্যান ফরিদ আহমেদ লিখিতভাবে বি-স্ক্যানকে আমদানীকৃত প্রতিটি ২০টি বাসের একটিতে র্যাম্প যুক্ত করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিলেও আজো তার কোনো বাস্তবায়ন হয়নি। ন্যাশনাল ব্যুরো অব রেভিনিউর (এনবিআর)-কাছে বারবার চিঠি লিখে, সাক্ষাতে অনুরোধ জানানো হয়েছে প্রবেশগম্য বাস আমদানি উৎসাহিত করতে বাস মালিকদের করছাড় বা কর অবকাশের সুযোগ দিতে। চলতি বছরেও তার প্রতিফলন বাজেট বা এনবিআরের কোনো এসআরওতে দেখা যায়নি।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, দেশে মেট্রোরেল হয়েছে, নদীর নিচে টানেল হয়েছে, মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে, সর্বনাশা পদ্মা নদীর ওপর সেতু তৈরি হয়েছে, কিন্তু প্রতিবন্ধী মানুষের স্বাধীন চলাচলের অবলম্বন হিসেবে প্রবেশগম্য বাসের দেখা আজও মেলেনি যা আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘদিনের প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধিত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও স্বার্থান্বেষী চক্রের অসহযোগিতার কারণে বাস্তবায়ন হয়নি। অথচ ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত দেশের কাতারে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। আমাদের প্রশ্ন সে সময়েও কী প্রবেশগম্য বাস সোনার হরিণই রয়ে যাবে? উন্নত দেশের কাতারে উত্তীর্ণ হতে হলে গণপরিবহনকে অবশ্যই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সব প্রান্তিক নাগরিকের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।

 

সাবরিনা সুলতানা, সালমা মাহবুব ও ইফতেখার মাহমুদ যথাক্রমে  বি-স্ক্যান-এর সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সমন্বয়কারী