দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ক্রমেই বাড়ছে। তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে সাড়ে সাতশর বেশি পণ্য। পণ্য রফতানি অর্ধশত বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছুঁয়েছে। সদ্যসমাপ্ত অর্থবছর শেষে তা ছাড়িয়েছে ৫২ বিলিয়ন ডলার। সেবা রফতানি এখন সাড়ে ৮ বিলিয়ন ডলারের মতো। সব মিলিয়ে মোট রফতানি ৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। রফতানিতে এ উল্লম্ফন আমাদের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। তবে রফতানি আরো বাড়াতে হলে দরকার অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করা। উদ্যোক্তাদের দাবিও তাই। সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত্কালে এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে সহযোগিতা চেয়েছেন পোশাক শিল্পের মালিক সংগঠন বিজিএমইএর নেতারা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে নতুন সুযোগ ও বাজার অন্বেষণে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়নে দূতাবাসগুলোর আরো সচেষ্ট হওয়া জরুরি।

একসময় দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য তথা রফতানি কেবল পাট ও চা শিল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সময়ান্তরে রফতানি খাতের প্রসার ঘটেছে। কিন্তু এ খাতে যতটা বৈচিত্র্য আসার কথা ততটা আসেনি। পণ্য ও গন্তব্য উভয় দিক থেকে দেশে রফতানি বহুমুখীকরণে ঘাটতি প্রবল। আমাদের রফতানি ঝুড়ি এখনো গুটিকয়েক শিল্পপণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখনো রফতানি আয়ের প্রায় ৮২-৮৫ শতাংশই আসে পোশাক শিল্প থেকে। এরপর রয়েছে চামড়া, পাটজাত পণ্য ও ওষুধ পণ্য। একইভাবে বাজারের দিক থেকেও বৈচিত্র্য কম। রফতানির  বেশির ভাগই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকেন্দ্রিক। অল্পকতক পণ্য ও সীমিত বাজারের এই অতিনির্ভরতা রফতানি নৈপুণ্য এবং অর্থনৈতিক স্থায়িত্বশীলতা উভয় দিক থেকে দুশ্চিন্তার। রফতানির যে বর্তমান সাফল্য তাও অনেকটা সম্ভব হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে কিছু অগ্রাধিকারমূলক সুবিধার কারণে। অনেকদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব বাজারে জিএসপি সুবিধা দিয়েছিল। রানা প্লাজা ধসের পর সেটা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ইউরোপের বাজারে এখনো শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পাচ্ছে বাংলাদেশ। ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করলে এ সুবিধা পাবে কিনা, তা নিয়ে আছে সংশয়। শুধু তাই নয়, বিশেষ করে ওষুধের ক্ষেত্রে মেধাস্বত্ব ছাড়ের সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। এক হিসাব বলছে, তেমনটা হলে দেশের রফতানি বাণিজ্য বছরে ৪-৫ বিলিয়ন ডলার কমে যাবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তাই অর্থনৈতিক কূটনীতি গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থনীতির ভিত আরো শক্তিশালী করতে ভিয়েতনাম রফতানিতে বৈচিত্র্য এনেছে। পোশাকের বাইরে দেশটি ইলেকট্রনিক পণ্য (মোবাইল), যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রিক্যাল, পাদুকা এবং কৃষিপণ্য রফতানি বাড়ানোয় জোর দিয়েছে। অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে তারা অনেক দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করছে। বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তিতেও (আরটিএ) যুক্ত হচ্ছে। কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতেরও লক্ষ্য তাই। দেশগুলো সংহত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাণিজ্য সহযোগীর দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি করছে। ওইসব দেশের নীতি-উদ্যোগ ও কর্মপ্রক্রিয়া আমাদের জন্য শিক্ষাপ্রদ।

সরকার বলছে, দোদুল্যমান আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যের দৃঢ় ভিত্তি নিশ্চিত করতে চায় তারা। এজন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। গত জুনে বিশ্বের বিভিন্ন শহরে ‘অর্থনৈতিক কূটনীতি সপ্তাহ’ আয়োজন করা হয়েছে। মূলত রফতানিযোগ্য পণ্য ও গন্তব্যের বহুমুখীকরণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও এর বহুমুখীকরণ, দেশে-বিদেশে মানবসম্পদের লাভজনক কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি বিনিময় এবং বিদেশে বাংলাদেশী মিশনগুলোয় প্রবাসী ও বিদেশীদের সেবার মান বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক কূটনীতির এ পাঁচ বিষয় সামনে রেখে কাজ করছে। নেয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ। ইতিবাচক এসব পদক্ষেপ আরো বেগবান করা প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কৌশল অনেকটাই নির্ভর করে নির্ধারিত বাজারে ওই দেশটির রফতানি সক্ষমতা ও সম্ভাবনা, প্রাধিকারভুক্ত বাজারের বিবরণ, ওইসব বাজারে পণ্য সম্পর্কে তথ্যাদি উপস্থাপনের পদ্ধতি, প্রচার কৌশলের উন্নয়ন এবং লক্ষ্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা দেখা দিতে পারে সেসব শনাক্তকরণ। দূতাবাসের কাজ হচ্ছে ওই দেশের বাজার সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য নিজ দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানকে অবহিত করা। দুঃখজনকভাবে আমাদের দূতাবাসগুলোর নৈপুণ্য আশানুরূপ নয়। ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে বাংলাদেশকে তুলে ধরে মর্যাদা বাড়ানোর ক্ষেত্রে তেমন সাফল্য দেখাতে পারেনি বেশির ভাগ মিশনই। বিদেশে গণমাধ্যমগুলোয় বাংলাদেশকে ভালোভাবে তুলে ধরা যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে কূটনীতিক ও মিশনের সক্ষমতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। কাজেই বাণিজ্য বাড়াতে হলে কূটনীতিকদের সক্ষমতা উন্নয়নেও দৃষ্টি দিতে হবে।

বর্তমান যুগে কূটনীতির চিরায়ত ধরন বদলে গেছে। অর্থনৈতিক বিষয়গুলো রাজনীতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে কূটনীতিতে। বিশেষ করে কদর বাড়ছে অর্থনৈতিক কূটনীতির। বিশ্বের বড় বড় দেশ যেমন—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ভারত, রাশিয়া তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে দূতাবাসের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগসংক্রান্ত কাজগুলো দেখভাল করছে। চেনা কৌশলের বাইরে গিয়ে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে বৈদেশিক বাণিজ্যের আরো প্রসার ঘটাতে হবে। নতুন নতুন বাজার ও সুযোগগুলো অন্বেষণ করতে হবে। বেসরকারি খাতকেও এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। জোরদার করতে হবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। সরকারি-বেসরকারি সম্মিলিত প্রয়াসে অচিরেই ১০০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি লক্ষ্যও পূরণ হবে, এটাই প্রত্যাশিত।