যদি রোগাক্রান্ত কোনো দেশ থেকে কেউ করোনা নিয়ে আসে, তবে তা থারমাল টেস্টে যেমন নিশ্চিত হওয়া যায় না, তেমনি তার কাছে রোগ নেই সনদ থাকলেও তা দিয়ে লাভ হয় না। একমাত্র উপায় হলো, অন্তত ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকা এবং করোনা টেস্ট করা। সারা বিশ্ব এ নিয়ম অনুসরণ করছে। কিন্তু বাংলাদেশ এক্ষেত্রে শিথিলতা দেখাচ্ছে বলে খবর মিলছে। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতসহ বিদেশ প্রত্যাগতদের কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করা হচ্ছে না। অথচ করোনাভাইরাসের নতুন ধরন শনাক্ত হওয়ার পর থেকে ভারতে সংক্রমণ বেড়েই চলছে। বিশ্বজুড়ে করোনা সংক্রমিতদের প্রায় অর্ধেকই ভারতের। সেখানকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বাংলাদেশে সংক্রমিতের সংখ্যা বেড়ে উঠলে তা সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশফেরতদের কোয়ারেন্টিনে শিথিলতা দেশের জন্য আত্মঘাতী।
মাসখানেক আগেই করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে মৃত্যু ও সংক্রমণের সংখ্যা বেড়ে উঠলে মানুষের চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। এতে সংক্রমণ ও মৃত্যু কমে এলেও আশঙ্কা রয়েছে তৃতীয় ও চতুর্থ ঢেউয়ের। কারণ দেশের অধিকাংশ মানুষকে এখনো টিকা প্রয়োগের মাধ্যমে সুরক্ষা বলয়ে আনা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের করোনা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি আমাদের ভাবিত করে তুলেছে। দেশটির সঙ্গে সীমান্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়, তবে বাণিজ্য চলছে। দেশের অভ্যন্তরে করোনা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সীমান্তে শিথিলতা দেখা যাচ্ছে। এতে করোনার ভারতীয় ধরনের প্রবেশ ঘটার শঙ্কা বাড়ছে। এরই মধ্যে দেশের ভেতরে কয়েকজনের দেহে করোনার সংশ্লিষ্ট ধরনের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য চলমান। সেক্ষেত্রে ট্রাকচালকসহ সংশ্লিষ্টদের কোয়ারেন্টিনে রাখা ও টেস্ট করা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। সে অনুযায়ী সীমান্ত এলাকায় প্রবেশে কড়াকাড়ি আরোপ, চিকিৎসাসেবা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত সুরক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করতে হবে। কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং ও টেস্ট বাড়ানোর ওপরও জোর দিতে হবে। খবর মিলছে, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয় করোনা সংক্রমণের হার বাড়ছে। তাই এখনই সতর্ক না হলে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে বাংলাদেশকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া করোনার মধ্যে ভারতীয় ধরনটি সবচেয়ে বেশি মারাত্মক। এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে ভারতীয় ধরনের ব্যাপক প্রবেশ এবং তা ছড়িয়ে পড়লে আমাদের বিদ্যমান চিকিৎসা ব্যবস্থায় সেটি সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে। দেশের প্রবেশপথগুলো করোনা প্রবেশের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাই প্রবেশের ক্ষেত্রে ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করছে। বিদেশফেরতদের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কোয়ারেন্টিনে থাকা বাধ্যতামূলক করেছে। আমাদেরও সেটি অনুসরণ করতে হবে। কারণ করোনা প্রতিরোধে এখন পর্যন্ত এটিই পরীক্ষিত বৈজ্ঞানিক পথ।
চীনে করোনাভাইরাস ছড়ানোর কারণে জরুরি অবস্থা জারির প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাইওয়ান বিদেশীদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেয়। এতে তাদের সংক্রমণের হার ছিল নিয়ন্ত্রণে। এ নিয়ে জনগণের মতো সরকারের মধ্যেও এক ধরনের আত্মতুষ্টি কাজ করে। পরবর্তী সময়ে দেশটির হাসপাতালগুলোয় ব্যাপকভাবে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, এমনকি সংক্রমণের স্বাভাবিক লক্ষণ জ্বর থাকলেও পরীক্ষা করা হয়নি। কভিডে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই শূন্য—এমন সাধারণ ধারণা সবার মধ্যে তৈরি হয়েছিল। চিকিৎসকরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি, হাসপাতালগুলো সতর্ক ছিল না, তারা কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংও করেনি। ফলে হঠাৎ করেই দেশটির অনেক মানুষের মধ্যে করোনার সংক্রমণ দেখা দেয়। সিঙ্গাপুরের ঘটনা অবশ্য ভিন্ন। দেশটিতে সংক্রমণের হার কম থাকলেও কড়াকড়িতে কোনো ছাড় দেয়া হয়নি। আটজনের বেশি জড়ো না হওয়া, ক্লাবগুলো বন্ধ এবং বিয়ের মতো অনুষ্ঠানে বড় জনসমাগমে কড়াকড়ি এখনো আছে। দেশটির বিমানবন্দরকর্মীদের উল্লেখযোগ্য অংশ এমন একটি জোনে কাজ করেছিলেন, যেখানে সংক্রমণের উচ্চঝুঁকির দেশগুলো থেকে লোকজন এসে জড়ো হতো। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর যাত্রীরাও ছিল। বিদেশী এ শ্রমিকদের কেউ কেউ বিমানবন্দরের উন্মুক্ত ফুডকোর্টে খাওয়াদাওয়া করেছেন, ফলে সেখানেও আরেক দফা সংক্রমণ ছড়িয়েছে। সিঙ্গাপুরের বিমানবন্দরে এখন সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা দেশ এবং কম ঝুঁকির দেশগুলো থেকে আসা যাত্রীদের আলাদা রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাছাড়া বিমানবন্দরের কর্মীরাও কাজ করবেন নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে থেকে। বাংলাদেশও সিঙ্গাপুরের এ মডেল অনুসরণ করতে পারে।
সীমান্তবর্তী এলাকায় সরকারি ব্যয়ে কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করা উচিত দ্রুত। অবশ্যই সেখানে মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারীদেরও কোয়ারেন্টিনে রাখতে হবে। দেশের প্রতিটি প্রবেশপথ স্থলবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও আকাশপথ—সব ক্ষেত্রে এ নীতি অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। আগের দুই দফায় সংক্রমণ বেড়ে ওঠার পেছনে ছিল কোয়ারেন্টিন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না করতে পারার ব্যর্থতা। কোয়ারেন্টিনের স্থানের স্বল্পতা, নিরাপত্তার অভাব, মানসম্পন্ন সেবার সংকট, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবের মতো সমস্যার সমাধান করতে হবে দ্রুত। কোয়ারেন্টিন শেষ হওয়ার আগে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এটি জোর করে বন্ধ করা যাবে না। মানসম্পন্ন সেবা ও কোয়ারেন্টিন স্থান নির্বাচনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের উৎসাহিত করার মাধ্যমে এ প্রবণতা রোধ করা যায়। আমাদের ইতালিফেরতদের কথা ভুলে গেলে চলবে না। যেভাবেই হোক ভারতফেরতদের বিজ্ঞানসম্মত ও বাস্তবসম্মত কঠোর কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে সীমিত ও মানবিক শব্দ দুটো পরিহার করা উচিত। যারা জটিল রোগী তাদের নিকটবর্তী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোয়ারেন্টিনের কথা ভাবা যায়। আর যারা তুলনামূলকভাবে সুস্থ, তাদের গত বছরের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন কেন্দ্রে রাখা যায়।
দেশে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না কড়াভাবে। অনেকটাই ঢিলেঢালা ভাব, মানুষ গাদাগাদি করে বাসে ভ্রমণ করছে। করোনা মহামারীর শুরু থেকেই ঢাকায় সংক্রমণ বেশি। এখনো সে ধারা অব্যাহত আছে। গত এক মাসে নতুন রোগী বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি রাজধানীতে। অথচ রাস্তাঘাট, হাটবাজার ও জনাকীর্ণ স্থানগুলোয় মানুষের চলাফেরা অনেকটাই করোনাপূর্ব স্বাভাবিক সময়ের মতোই। সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে নিয়ে একটা ভয়ের কারণ রয়েছে। একটা বিষয়ে খুব পরিষ্কার থাকা দরকার যে করোনার টিকা আগামী কয়েক মাসে বিশ্বের চাহিদা অনুযায়ী আসার সম্ভাবনা খুবই কম। এ অবস্থায় যদি যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ না করা হয়, তবে এ সময়ের মধ্যে করোনাভাইরাস সংক্রমণ আরো বাড়বে এবং তার বিরূপ প্রভাবও হবে বহুমুখী। ভাইরাসের বিস্তার রোধেই করোনাভাইরাস পরীক্ষার সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এটি সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। বিমানবন্দর, স্থলবন্দর বা সমুদ্রবন্দর—যে পথেই দেশে আসুক, সব জায়গায় এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সব জায়গায় কোয়ারেন্টিনেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের বরাত দিয়ে পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত মানা হলে এবং দেশের ভেতরেও স্বাস্থ্যবিধি মানা হলে করোনা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। ভুললে চলবে না, করোনা বিস্তার লাভ করেছিল প্রবাসীদের দ্বারা এবং মানুষের অবহেলার কারণে।










