বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি এখন ৯ শতাংশের বেশি। এত দিন শুধু খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি নিয়েই বেশি চিন্তা ছিল, এখন খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবার মূল্যস্ফীতি নিয়েও চিন্তা বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত—দুই ধরনের পণ্যেই মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের বেশি। বাস্তবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ আরো বেশি পড়ছে। এটি বড় উদ্বেগের বিষয়। ডলারের তুলনায় টাকার দামও নিম্নমুখী, রফতানির ক্ষেত্রে যা অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়েছে। অন্যদিকে জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিও সামগ্রিক মূল্যস্তরকে ওপরে তুলেছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। তার ওপর বিভিন্ন কারণে ফসল নষ্ট হয়েছে, মজুদদারিও হচ্ছে। আমদানিপণ্যের দামও বেড়েছে। সব মিলিয়ে সমস্যা বেড়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট আয় ও গরিব মানুষকে স্বস্তি দিতে পণ্যের ক্রয়মূল্য নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখতে সরকারকে সচেষ্ট হতে হবে। মূল্যস্ফীতির প্রভাব প্রশমনে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও পরিমাণ—উভয়ই বাড়ানো প্রয়োজন।

মূল্যস্ফীতির চাকা একবার গড়াতে শুরু করলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তবু কিছু পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব। দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার কমিয়েছে এবং করোনা থেকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে স্বল্প সুদে ঋণও প্রদান করা হয়েছে। সে সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক যুক্তি বিলক্ষণ ছিল, কিন্তু তাতে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সুদের হার নিয়ন্ত্রণে মূল্যস্ফীতির প্রসঙ্গটিকেও স্মরণে রাখা অবশ্যকর্তব্য। আর্থিক বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। অন্যদিকে জ্বালানি তেলের ওপর উচ্চ হারে রাজস্ব আহরণের ফলে জ্বালানি তেলের দাম বিপুল পরিমাণে বেড়েছে। তেলের ওপর যে হারে রাজস্ব সরকার আদায় করছে, তা অর্থনীতিকে চাপে ফেলছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ সময়ে বিষয়টি বিবেচনার দাবি রাখে। কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে যাতে মজুদদারির কারণে মূল্যস্ফীতি না ঘটে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। অতিমারীজনিত আর্থিক ধাক্কা থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছিল, তখন যেন মূল্যস্ফীতির সমস্যা ফের তাকে বিধ্বস্ত না করে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারেরই। এ কাজে গাফিলতি বা উদাসীনতা কাম্য নয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির চাপ সহনীয় পর্যায়ে রাখতে অর্থনীতির সব খাতে তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন এবং এ তদারকি নিশ্চিত করতে হবে কঠোরভাবে। সামনের দিনগুলোয় মূল্যস্ফীতির হার আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্বের সব দেশই পণ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে মূল কাজ ধরে নিয়ে কৌশল ঠিক করছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ অর্থ সরবরাহ খানিকটা কমিয়ে আনতে নীতিনির্ধারণী সুদহার বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে বাংলাদেশে বেসরকারি বিনিয়োগ এমনিতেই কম। ফলে সুদহার বাড়ানোর কথা ভাবতে পারছে না। বিনিয়োগের অন্যান্য বাধাও দূর করতে পারছে না। এর মধ্যে আবার আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে, বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। আবার সব পণ্য ঠিকমতো পাওয়াও যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদনও বিঘ্নিত হচ্ছে। বর্তমানের মূল্যস্ফীতি মূলত হয়েছে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার ফলে, চাহিদা বাড়ার জন্য নয়। আর গত কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতির হার বেশি হয়েছে খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে। গতানুগতিক পদ্ধতি ব্যবহার করে, অর্থাৎ সুদের হার বাড়িয়ে একে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে বলে মনে হয় না। খাদ্যের মূল্যস্ফীতি এতটা বেড়ে যাওয়া বিশেষ উদ্বেগের। কারণ এর ফলে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিবিএসের উপাত্তে দেখা যায়, ২০২১ সাল থেকেই মূল্যস্ফীতির হার মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি। ফলে শ্রমিকের প্রকৃত মজুরিতে ক্রমাগত পতন ঘটছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতার দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, এ ধরনের সমস্যা নতুন নয়। সত্তর ও আশির দশকে জ্বালানি তেলের মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বল্পতা এবং বিভিন্ন ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়েছে। আর এসব সমস্যার মূল চরিত্র হলো, তারা যুগপৎ ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। তবে অতীত অভিজ্ঞতার তুলনায় বর্তমানের বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ—দুই অবস্থার মধ্যেই কিছু পার্থক্য রয়েছে।

মূলস্ফীতির চাপ থেকে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষকে স্বস্তি দিতে এক কোটি ফ্যামেলি কার্ডের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে খাদ্য সরবরাহের পদক্ষেপ নিয়েছে। এটি ইতিবাচক বটে। তবে বর্তমানের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে এর আওতা ও পণ্য সরবরাহের পরিমাণ আরো বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি বাজার মনিটরিংও বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যটি তাত্পর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, নিত্যপণ্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে। বাজার তদারকি জোরদার এবং একই সঙ্গে বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত জোগান নিশ্চিত করতে হবে। যেসব পণ্যে বাংলাদেশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল সেগুলোর ওপর থেকে ভ্যাট-ট্যাক্স উঠিয়ে নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। সরকার বিষয়টি আমলে নিতে পারে। দেশের সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর কর্মসূচিগুলো মূলত গ্রামকেন্দ্রিক। শহরাঞ্চলের জন্য বড়জোর পাঁচটি প্রকল্প আছে। শহরের জন্য বিশেষ কর্মসূচি থাকা প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতি যে জায়গায় পৌঁছেছে, তাতে মাথাপিছু সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমলে নিলে বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি লাঘব করা সম্ভব হতে পারে। প্রথমত, খাদ্যদ্রব্যের দেশীয় উৎপাদন ও সরবরাহের দিকে নজর দিতে হবে। বলা বাহুল্য, দেশের মাটি অনেক উর্বর। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশে উৎপাদন বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের কৃষিকে টেকসই করার জন্য দরকার কিছু সংস্কার। শুধু ভর্তুকির ব্যবস্থা করলেই হবে না, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় নিশ্চিত করতে হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। তদুপরি বিশ্বব্যাংকসহ অনেক উন্নয়ন সংস্থার গবেষণায় প্রতীয়মান, বাংলাদেশে কৃষিজমির মালিকানা সংস্কারের মাধ্যমে কৃষির উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সেচকালীন সার ও কীটনাশকের পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির সংযোজন কৃষিকে শিল্পের প্রধান ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রিতে রূপান্তর করতে পারে। এর সুফল পেতে হলে দরকার মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি খাত যেকোনো অর্থনীতির জন্যই অপরিহার্য। বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানিকারক একটি দেশ। বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অবশ্যই জ্বালানি আমদানিকারক দেশকে বিপদে ফেলছে। ইউরোপীয় দেশগুলোও রাশিয়ার জ্বালানির বলয় থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছে। তাই তারা জীবাশ্ম জ্বালানি ছেড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি ঝুঁকছে। এটা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় বার্তা। বাংলাদেশকেও জীবাশ্ম জ্বালানি পরিহার করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথ খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে জ্বালানি বিশেষত প্রাকৃতিক গ্যাস আহরণ আরো জোরদার করতে হবে। তৃতীয়ত, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বৈদেশিক বিনিময় হার। ডলারের দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বর্তমানে দেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। মূল্যস্ফীতি যখন হয়, দেশীয় মুদ্রার (টাকা) ক্রয়ক্ষমতা কমে। অন্যান্য বাজারের মতো টাকার বিপরীতে ডলারের দাম তখনই বাড়বে যখন দেশীয় বাজারে এর চাহিদা বেড়ে যায়। বর্তমানে দেশে ডলারের চাহিদা বাড়ার প্রধান কারণ বিশ্ববাজারে প্রধান পণ্যদ্রব্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি। এটি কমিয়ে আনতে কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বটে, তবে তদারকির অভাবে সেটি ততটা কার্যকর হচ্ছে না, বিষয়টি দুশ্চিন্তার।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি ও কষ্টের সম্মুখীন হয় স্বল্প আয়ের মানুষেরা। সুতরাং তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বাজারের ওপর সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের করণীয় হওয়া উচিত পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে থাকা সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা এবং জটিলতা দূর করে সরবরাহের প্রবাহ মসৃণ করা। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে অভ্যন্তরীণ বাজারে যেন তার দ্রুত প্রতিফলন ঘটে, সে বিষয়ে সজাগ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতি থেকে দরিদ্র এবং নিম্ন আয়ের মানুষকে সুরক্ষা দেয়ার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে স্বল্প প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় আমদানিকে নিরুৎসাহিত করার লক্ষ্যে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে সেগুলো চলতে দেয়া, আমদানি ও রফতানিতে দাম বেশি করে বা কম করে দেখানোর প্রবণতা কার্যকর নজরদারিতে আনা এবং পুঁজি পাচার বন্ধের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ।