পাট ও পাটজাত পণ্য বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রফতানি পণ্য। উপনিবেশোত্তরকালে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান পণ্য ও প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে দেশের শিল্প ও কৃষিতে একচ্ছত্র প্রভাব ছিল পাটের। দেশের কৃষক, পাটকল শ্রমিক এবং এর ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতে লাখ লাখ মানুষের সম্পৃক্ততায় পাট খাত হয়ে উঠেছিল অর্থনীতির মূলশক্তি। বিশ্বপরিমণ্ডলে সোনালি আঁশ খ্যাত পাট শিল্পের প্রভাব কমতে থাকে সত্তরের দশক থেকে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বর্তমানে পাট খাতের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এটি কাজে লাগাতে যে বিনিয়োগ ও সুযোগ-সুবিধা দরকার তা মিলছে না। এরই মধ্যে সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বেসরকারি পাটকলগুলো অপেক্ষাকৃত ভালো করলেও কভিড, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধসহ নানা কারণে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে তারাও। এ কারণে পাট খাত রক্ষায় রফতানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) মতো ২ শতাংশ সুদে ঋণ পেতে আলাদা তহবিল গঠনের দাবি জানিয়েছেন পাট খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। প্রস্তাবটি ইতিবাচক, তবে এ তহবিলের অপব্যবহার রোধে কঠোর তদারকিও প্রয়োজন। এক্ষেত্রে তহবিলের সুবিধা যেন প্রকৃত ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা পান, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বে পাট উৎপাদনকারী দেশের সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকটি মাত্র। এগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ এখনো এগিয়ে। পাটপণ্যের চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাজার কখনো এমন অবস্থায় উপনীত হয়নি, যে কারণে বাংলাদেশের পাটকল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার কারণে সিনথেটিক পণ্যের বিপরীতে পাটের মতো প্রাকৃতিক তন্তুজাত পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দুই দশক ধরে বিশ্ববাজারে পাট ও পাটপণ্যের চাহিদা বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশের বেসরকারি পাটকলের বেশির ভাগ এখনো লাভজনকভাবে টিকে আছে। তবে বিপুল পরিমাণ জমিসহ স্থাবর সম্পদ নিয়ে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর উৎপাদনশীলতা নিম্নমুখী হওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতি ও অপচয়ের কারণে বছরে শত শত কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়ে। করোনা মহামারীর সময় দেশের ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করে দেয় সরকার। পাট খাতের ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দেশীয় বেসরকারি বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনী প্রতিভাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগকেই প্রাধান্য দিতে হবে। পাট শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদন থেকে শুরু করে শ্রমিক, বিনিয়োগ ও রফতানি বাণিজ্যের পুরোটাই নিজস্ব সম্পদ ও অভিজ্ঞতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। অন্য কোনো রফতানিমুখী শিল্পে এমন আত্মনির্ভরতার উদাহরণ নেই। এ কারণে বিনিয়োগ ও পরিবেশগত সুরক্ষার দিক থেকে পাট শিল্প তুলনামূলকভাবে অধিক সম্ভাবনাময়। পাট খাতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও পাটের সোনালি ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সরকারের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়।
স্বল্প সুদে তহবিল থেকে ঋণ পেলে দেশের পাট খাত ঘুরে দাঁড়াবে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। ফলে সম্ভাবনার শতভাগ কাজে লাগানো সম্ভব হবে। এ সময় কাঁচা পাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে বাজেটে আরোপিত ২ শতাংশ উৎসে কর ও রফতানির বিপরীতে প্রণোদনায় ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর প্রত্যাহার, পাটপণ্যে ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং ডিউটি স্থায়ীভাবে প্রত্যাহার, বেসরকারি পাটকলের ব্যাংকঋণ মওকুফ ও উচ্চফলনশীল পাটবীজ উৎপাদনের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। পাট খাত চাঙ্গা করতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ খাতের বড় সমস্যা হলো, এর যন্ত্রপাতিগুলো অনেক পুরনো আমলের। এগুলো পরিবর্তন করা জরুরি। এক্ষেত্রেও প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। স্বল্প সুদের তহবিল থেকে এর অর্থায়ন হতে পারে। এছাড়া রফতানি উন্নয়ন তহবিল থেকে পাট খাত অর্থ পায়, তাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্র এক্ষেত্রে উদাহরণ হতে পারে। যেমন দেশটি গম উৎপাদনে ভর্তুকি দেয়, যাতে গম উৎপাদনে দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে রফতানি বা সাহায্যের মাধ্যমে খাদ্য রাজনীতি করা যায়। ভারত বর্তমানে আমাদের চেয়ে বেশি পাট উৎপাদন করে অথচ রফতানি করে বাংলাদেশের চেয়ে কম, কেননা তারা অভ্যন্তরীণ বাজারে ভোগ করে সিংহভাগ অথচ আমাদের চিত্র পুরো উল্টো। পাটবীজের প্রায় ৯০ শতাংশ ভারত থেকে আমদানি করতে হয়, বাংলাদেশের বীজ উন্নত হওয়া সত্ত্বেও। এসবই পরিকল্পনাগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে বিশেষ করে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে পাট খাত পুনরুদ্ধারে যথাযথ উদ্যোগ নেয়ার অঙ্গীকার করেছিল। ক্ষমতায় বসার পরপর কিছু উদ্যোগও তারা নিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে ২০১০ সালে সরকারের সহায়তায় প্রয়াত বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের নেতৃত্বে একদল বাংলাদেশী বিজ্ঞানীর পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনের কথা বলা যায়। এরপর বাংলাদেশী আরেক বিজ্ঞানী মোবারক আহমদ খানের পাট থেকে সোনালি ব্যাগ তৈরির কথাও বলা যায়। সেখানেও সরকারের সহযোগিতা ছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে ওইসব আবিষ্কার পাটপণ্য বহুমুখীকরণসহ পরিবেশ রক্ষায় পাটের বহুমুখী ব্যবহারের যে আশার আলো জ্বেলেছিল, তা এখন পুরো নিভে না গেলেও নিভু নিভু করছে। অথচ শুধু সোনালি ব্যাগের প্রকল্পটি সফল করার মাধ্যমেই বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ রফতানি আয় পেত। উল্লেখ্য, ২০২০ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশ আইন করে প্লাস্টিকের শপিং ব্যাগ ব্যবহার বন্ধ করেছে। এ ২৭টি দেশে ৫০০ বিলিয়ন পিস শপিং ব্যাগের চাহিদা রয়েছে। অন্যদিকে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, চীন, আফ্রিকাসহ এশিয়ার আরো ৩২টি দেশ একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব দেশেও এমন পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রত্যাশা থাকবে সরকার অবিলম্বে পাট খাতের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করবে। প্রধানমন্ত্রী ও পাট মন্ত্রণালয় থেকে পাটের উন্নয়নে, বিশেষ করে বৈচিত্র্যপূর্ণ পণ্য উৎপাদনে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ উদ্যোগ ফলপ্রসূ হবে বলে আশা করি। পাট খাতের ব্যবসায়ীদের উচ্চহারে ব্যাংকঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে হয়। ফলে আয়ের সিংহভাগই ব্যাংককে দিতে হয়। এক্ষেত্রে পাট খাত উন্নয়নে স্বতন্ত্র তহবিল গঠনে সুফল মিলতে পারে।
প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার তৈরি পোশাক শিল্পের পাশাপাশি অন্যান্য রফতানিমুখী শিল্প গড়ে তুলতে কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে পাট খাতের সম্ভাবনা রয়েছে রফতানিতে ভিন্ন অবস্থান তৈরি করে নেয়ার। দেশের তৈরি পোশাক শিল্প বিকাশের পেছনে সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নানা সুবিধা বড় ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে বন্ডেড ওয়্যার হাউজ সুবিধা, উৎসে কর ছাড়, রফতানি প্রণোদনা ও স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান। পাট খাত উন্নয়নেও তেমনি স্বল্প সুদে তহবিল গঠন করা যেতেই পারে। কয়েক হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল এ খাতকে নতুন পথের দিশা দিতে পারে। একই সঙ্গে তহবিল ব্যবস্থাপনা হতে হবে যথাযথ। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, এসব তহবিলের অর্থ একবার কেউ নিলে তা আর ফেরত দিতে চান না। এ সংস্কৃতির পরিবর্তনে পাট খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের নিয়ে তদারক কমিটি গঠন করা যেতে পারে। প্রস্তাবটি ব্যাপক অর্থে ইতিবাচক। বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই, নারী উদ্যোক্তা, কৃষি, রফতানিমুখী শিল্প প্রভৃতি খাত উন্নয়নে বিভিন্ন সময়ে স্বল্প সুদে অর্থ সরবরাহে বিভিন্ন তহবিল ও ফান্ড গঠন করেছে। কিছু আবার আন্তর্জাতিক ঋণদানকারী সংস্থার অর্থেও পরিচালিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে পাট খাত উন্নয়নে স্বল্প সুদের তহবিল গঠন করা কঠিন কিছু নয়। অর্থের সংকট নেই এখন, প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা ও অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে পাট খাত সংশ্লিষ্টদের সুপারিশ আমলে নেয়া হবে বলে প্রত্যাশা।










