দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল ও মজবুত রাখা, নতুন নতুন শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা, সর্বোপরি আর্থসামাজিক তথা নাগরিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত প্রধানত গ্যাস ও কয়লার ওপর নির্ভরশীল, যার মজুদ অত্যন্ত সীমিত। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশকে আমদানিনির্ভর তরল পেট্রোলিয়ামের ওপর বহুলাংশে নির্ভর করতে হয়। বর্তমান বিশ্বে ঘনবসতিপূর্ণ ও স্বল্প জ্বালানি সম্পদের অধিকারী উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত রাষ্ট্রগুলো তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিতকল্পে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কর্মসূচিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করেছে। যদিও পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছে প্রায় অর্ধ-শতাব্দী আগে। ১৯৫১ সালের ২০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র ইবিআর-১ থেকে পারমাণবিক শক্তি দ্বারা উৎপন্ন বিদ্যুৎ দিয়ে বাল্ব জ্বালানো হয়। পরবর্তী সময়ে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অবনিস্ক শহরে ১৯৫৪ সালের ২৭ জুন বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে বাণিজ্যিকভাবে গ্রিডে সরবরাহ করে।
বর্তমানে পৃথিবীর ৩০টি দেশে ৪৫০টির মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। সেগুলো থেকে উৎপন্ন বিদ্যুতের পরিমাণ মোট উৎপন্ন বিদ্যুতের প্রায় ১২ শতাংশ। এসব বিষয় বিবেচনা করে বর্তমান সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপের অংশ হিসেবে দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০ শতাংশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ থেকে উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা নিয়েছে এবং তা অচিরেই বাস্তবায়নের পথে। এটা নিশ্চিতভাবে বর্তমান সরকারের উত্তম প্রয়াসগুলোর অন্যতম একটি উচ্চাভিলাষী ও জাতি হিসেবে বিশ্বে গর্ব করার মতো একটি প্রকল্প। যদিও পরমাণু বিশ্বে আবির্ভাবের চিন্তাভাবনাটি শুরু হয়েছিল সেই ১৯৬১ সালে। প্রকল্পের জন্য পাবনা জেলার রূপপুরকে নির্বাচন করা হয় এবং অনেক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর প্রকল্পটি অনুমোদিত হওয়া সত্ত্বেও তৎকালীন পাকিস্তান সরকার প্রকল্পটি বন্ধ করে দেয়। দেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ১৯৭৪ সালে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নানা রাজনৈতিক কারণে প্রকল্পটি আর আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুনরায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ লক্ষ্যে ২০১১ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ান ফেডারেশন সরকারের মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ২০১৩ সালের অক্টোবরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রথম পর্যায় কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এ প্রকল্পের কংক্রিট ঢালাইয়ের কাজ শুরুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিশ্ব পরমাণু ক্লাব’ (নিউক্লিয়ার নেশন)-এ ৩২তম দেশ হিসেবে যুক্ত হয়। রূপপুরের এ পারমাণবিক প্রকল্পটিতে দুটি চুল্লি নির্মিত হবে যা রাশিয়ার ৩+ প্রজন্মের ভিভিআর-১২০০ মডেলের পারমাণবিক চুল্লি। এর প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা হবে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।
জলবায়ু পরিবর্তনের কথা চিন্তা করে বর্তমানে বিশ্বে টেকসই শক্তি উৎপাদনে যেসব উৎসের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে পারমাণবিক শক্তি তার অন্যতম একটি উৎস। যদিও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুল্লির নিরাপত্তা নিয়ে সবসময় কিছুটা উদ্বেগ ও ভয়ের প্রবণতা আছে যা বিশ্বব্যাপী। সবশেষ জাপানের ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুর্ঘটনাসহ বিশ্বে এ পর্যন্ত তিনটি বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। পারমাণবিক কেন্দ্রে দুর্ঘটনায় তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়লে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব থাকে বলেই বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে আছে ভয় ও আতঙ্ক। তবে ফুকুশিমায় দুর্ঘটনার পর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দুর্ঘটনা ঝুঁকি কমাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক বাড়ানো হয়েছে। রাশিয়ার ভিভিআর-১২০০ মডেলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দুর্ঘটনা রোধে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। পারমাণবিক চুল্লির পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রথমটি হচ্ছে ফুয়েল পেলেট, যা অতি উচ্চতাপমাত্রায় তার জ্বালানি বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে পারে। ফুয়েল পেলেট সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করা হয়, ফলে তেজস্ক্রিয় ফিশন প্রডাক্টগুলো পেলেটের ভেতরে অবস্থান করে। ফুয়েল পেলেটগুলো জিরকোনিয়াম অ্যালয়ের তৈরি ফুয়েল ক্ল্যাডিং দিয়ে পরিবেষ্টিত থাকে, যা দ্বিতীয় প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। বিশেষ কোনো কারণে সামান্য পরিমাণ ফিশন প্রডাক্ট ফুয়েল পেলেট থেকে বের হয়ে এলেও তা এই ক্ল্যাডিংয়ে ভেদ করতে পারবে না। তৃতীয় বাধা হিসেবে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের জন্য বিশেষ মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পুরু ইস্পাতের প্রেশার ভেসেল তৈরি করা হয় যা, উচ্চ তেজস্ক্রিয় অবস্থাতেও দীর্ঘস্থায়ী হয়। চতুর্থ নিরাপত্তাবেষ্টনী হিসেবে রিইনফোর্সড কংক্রিট দিয়ে ১ দশমিক ২ মিটার পুরুত্বের প্রথম কনটেইনমেন্ট ভবন তৈরি করা হয়, যা যেকোনো পরিস্থিতিতে তেজস্ক্রিয়তা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া থেকে বিরত রাখে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা অধিকতর জোরদারের জন্য আধুনিক নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টগুলোয় প্রথম কনটেইনমেন্ট ভবন-এর পর আরো শূন্য দশমিক ৫ মিটার পুরুত্বের আরো একটি কনটেইনমেন্ট ভবন যুক্ত করা হয় যা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিমান দুর্ঘটনা ইত্যাদি থেকে প্লান্টকে সুরক্ষা করে। এটি পারমাণবিক কেন্দ্রে দুর্ঘটনায় তেজস্ক্রিয়তা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া রোধে পঞ্চম প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। এ পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যের কারণে মনুষ্যসৃষ্ট ঘটনা/দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যেমন শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদির প্রভাব মোকাবেলায় সক্ষম থাকবে এ পারমাণবিক চুল্লি।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র অন্যসব প্রচলিত তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতোই, শুধু পার্থক্য তাপ উৎস। এক্ষেত্রে তাপ উৎস হিসেবে একটি পারমাণবিক চুল্লি ব্যবহার করা হয়ে থাকে যার প্রধান জ্বালানি হচ্ছে ইউরেনিয়াম ও প্লুটোনিয়াম। এগুলো সাধারণত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের খনি থেকে পাওয়া যায় যা পাথর বা কয়লার সঙ্গে লেগে থাকে। ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি ইউরেনিয়াম পাওয়া যায় কাজাখস্তানে, যা পৃথিবীর মোট সরবরাহের প্রায় ৪৩ শতাংশ। এছাড়া কানাডা, নামিবিয়া, অস্ট্রেলিয়া, উজবেকিস্তান, রাশিয়া, নাইজার, চায়না, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ আরো কয়েকটি দেশে পাওয়া যায়। খনি থেকে সরাসরি এগুলো ব্যবহার করা যায় না। মাইনিং, মিলিং, কনভারশন, ফ্যাব্রিকেশনসহ বিভিন্ন ধাপে অত্যন্ত উচ্চমানের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও যন্ত্রপাতির সাহায্যে ব্যবহারের জন্য উপযোগী করতে হয়। এ ধরনের প্রযুক্তি বিশ্বের খুব অল্পসংখ্যক দেশের কাছেই আছে। ইউরেনিয়ামের তৈরি জ্বালানিগুলো (ইউরেনিয়াম অক্সাইড) সিরামিকের ছোট ছোট সিলিন্ডার আকৃতির হয়ে থাকে যা একেকটি ৩/৮ ইঞ্চি ব্যাস ও ৫/৮ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের হয়। এই ইউরেনিয়াম পেলেটগুলোকে চিকন ধাতব পাইপের ভিতরে একটির ওপর একটি বসিয়ে পরে পাইপের দুই মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়। এ জ্বালানি ভর্তি পাইপগুলোকে বলা হয় ফুয়েল রড। কমবেশি প্রায় ২০০টি ফুয়েল রড একত্র করে বান্ডেল তৈরি করা হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষমতাভেদে কয়েকশ থেকে হাজার এ রকম বান্ডেল এসব পারমাণবিক চুল্লিতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এ চুল্লিতে একটি নিউট্রন পরমাণুর সাহায্যে যখন একটি ইউরেনিয়াম পরমাণুর ওপর আঘাত করে পারমাণবিক বিভাজন ঘটানো হয় তখন প্রচুর পরিমাণ তাপের উৎপন্ন হয়। এ প্রক্রিয়া অনবরত চলতে থাকে এবং প্রচুর তাপ উৎপন্ন হতে থাকে। ইংরেজিতে এ পারমাণবিক বিভাজনকে নিউক্লিয়ার ফিশন বলা হয়, নিউক্লিয়ার ফিউশন কিন্তু নয়। নিউক্লিয়ার ফিউশন কিন্তু কেবল সূর্যে ঘটে। এর ফলে সূর্য আমাদের সব সময়ের জন্য আলো দেয় আর এই নিউক্লিয়ার ফিউশনের জন্য প্রচুর পরিমাণ তাপের উৎপন্ন হয়। এই ফিশন প্রক্রিয়ার চেইন যদি কন্ট্রোল করা না যেত তাহলে বিশাল একটা বিস্ফোরণ হতো যা মূলত পারমাণবিক বোমা।
পরমাণু চুল্লিতে ফিশন বা চেইন রিঅ্যাকশন বন্ধ করতে কন্ট্রোল রড ব্যবহার করা হয়ে থাকে যা মূলত হাফনিয়াম, বোরন ইত্যাদি ধাতব দিয়ে তৈরি। এ রডগুলো চুল্লিতে উৎপন্ন নিউট্রন খেয়ে (অ্যাবজর্ব) ফেলে। যার ফলে ফিশন প্রক্রিয়াটি ধীরগতির হয় বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরমাণু চুল্লিটি পানি দিয়ে ভর্তি থাকে এবং নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন প্রচুর তাপ পানিকে বাষ্পে রূপান্তরিত করে। এখানে উল্লেখ্য, এ বাষ্প উৎপাদন প্রক্রিয়াটি বয়েলিং ওয়াটার রিঅ্যাক্টর (বিডব্লিউআর) প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চুল্লি বা কোরের ভেতরেই ঘটে। তবে প্রেশারাইজড ওয়াটার রিঅ্যাক্টর (পিডব্লিউআর) প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চুল্লি বা কোরের ভেতরেই না ঘটে এক্ষেত্রে আলাদা স্টিম জেনারেটর ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সৃষ্ট বাষ্প দিয়ে অন্যান্য তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতোই একটি বৈদ্যুতিক উৎপাদক বা জেনারেটরে সংযুক্ত স্টিম টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করা হয়ে থাকে। এভাবেই উৎপন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎ গিয়ে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। স্টিম টারবাইনের নিচে বাষ্প থেকে উৎপন্ন পানি পুনরায় ব্যবহারের জন্য কনডেনসার ও কুলিং টাওয়ার ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এই ঠাণ্ডা করার সময় জলাশয়ের পানি ব্যবহার করা হয় এবং এ পানির বড় অংশ বাষ্প আকারে উড়ে যায়। তাই কুলিং টাওয়ারের ওপরে সবসময়ই বিশাল আকারের বাষ্পকুণ্ডলী উড়তে দেখা যায়। যেহেতু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়, তাই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বড় জলাশয়ের তীরঘেঁষে নির্মাণ করা হয়ে থাকে। এখানে উল্লেখ্য, চুল্লিতে উৎপন্ন বাষ্প ও বাষ্প থেকে কনডেনসারে উৎপন্ন পুনরায় ব্যবহার করার পানি পাইপের মধ্যে থাকে। তাই বাইরের জলাশয়ের পানির সঙ্গে এর কোনো মিশ্রণ হয় না। তাই ঠাণ্ডা করার কাজে ব্যবহৃত পানি যা আবার জলাশয়ে ছেড়ে দেয়া হয়ে থাকে এবং কুলিং টাওয়ারের ওপরের বাষ্পকুণ্ডলী সম্পূর্ণ নিরাপদ। পরিশেষে, সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র একটি সফল, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্প হোক—এ প্রত্যাশাই করি।
মো. ইকবাল হোসেন: সহকারী অধ্যাপক, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পিএইচডি গবেষক, কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান










