কৃষকরা কষ্ট করে ফসল ফলান, এর ফলে আমাদের খাদ্যের জোগান হয়। বলতে গেলে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা কৃষির ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হয়। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করে শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠে, আধুনিক সভ্যতার চাকা ঘোরে। কিন্তু এই যে কৃষির এত অবদান, এর পেছনে যাদের মূল ভূমিকা সে কৃষক সমাজ বরাবরই অবহেলিত থেকে যায়। যে কারণে তারা ফসলের ন্যায্যমূল্য পান না, এমন অভিযোগ বারবারই উঠে আসছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়, কেননা ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সেহেতু রাষ্ট্র যদি কৃষকের কাছ থেকে বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে পণ্য কিনতে চায়, সেক্ষেত্রে বিষয়টি নিঃসন্দেহে পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। আমাদের দেশের প্রধান খাবার ভাত, সে হিসেবে চাল গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। এজন্য প্রতি বছর সরকারের পক্ষ থেকে কৃষকদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রার চাল কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়। এটি রাষ্ট্রের দায়িত্বের জায়গা থেকে অবশ্যই ইতিবাচক দিক। কিন্তু এক্ষেত্রে সরকার যে মূল্য নির্ধারণ করে দেয়, সেটি বাজারমূল্যের চেয়ে কম—এ অভিযোগ এবারো উঠেছে।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, কৃষক খোলাবাজারে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় প্রতি মণ ধান বিক্রি করছেন। অথচ সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ধান ২৮ টাকা ও চাল ৪২ টাকায় কেনা হবে। সে হিসাবে প্রতি মণ ধানের দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ১২০ টাকা, যা বর্তমান বাজারমূল্যের চেয়েও কম। কৃষিসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সার ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সরকার নির্ধারিত ধান-চালের দর পর্যাপ্ত নয়। এটি বহাল থাকলে কৃষক স্থানীয় বাজারেই ধান বিক্রি করতে আগ্রহী হবেন। এছাড়া সরকারি গুদামে ধান বিক্রিতে প্রক্রিয়াগত জটিলতা রয়েছে। তাই এবারো ধান-চাল ক্রয়ে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা প্রতিবারের মতোই অধরা থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এরই মধ্যে কৃষক খোলাবাজারে নতুন আমন ধান বিক্রি শুরু করেছেন। খোলাবাজারে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম পাওয়া যায়। আবার সরকারি গুদামে ধান-চাল বিক্রি করতে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, ধান শুকানোসহ বিভিন্ন শর্ত পূরণ করতে হয়, যা অনেক কৃষকের কাছেই ঝামেলা মনে হয়। এছাড়া কৃষককে সরকারি গুদামে নিজের খরচে ধান পৌঁছে দিতে হয়, এতে বাড়তি খরচ যোগ হয়। সবমিলিয়ে সরকারি গুদামের চেয়ে খোলাবাজারে চাল বিক্রি বেশি সাশ্রয়ী বলে কৃষক মনে করেন।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের আমন মৌসুমে সরকারিভাবে তিন লাখ টন আমন ধান ও পাঁচ লাখ টন সেদ্ধ চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। শিগগিরই ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু হবে। ধান ২৮ ও চাল ৪২ টাকায় কেনা হবে, গত বছর যা যথাক্রমে ২৭ ও ৪০ টাকা ছিল। এভাবে মাত্র ১ বা ২ টাকা বৃদ্ধি করে প্রকৃতপক্ষে কৃষককে আকৃষ্ট করা যাবে না। এটা গত বছরও দেখা গেছে। সর্বশেষ বোরো মৌসুমে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ লাখ ৫০ হাজার টন। নির্ধারিত সময় শেষে বোরো ধান সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯৭৪ টন। সে হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার ৫৯ ভাগই পূরণ হয়নি। তবে চালের ১১ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সংগ্রহ হয়েছে ১১ লাখ ২০ হাজার ৮৮ টন। ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রে চলতি বছর সার, ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় বিঘাপ্রতি এক-দেড় হাজার টাকা বেড়েছে। সে হিসাবে এ বছরও যে সরকারিভাবে বাজারমূল্যের চেয়ে কম মূল্যে ধান কিনলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রার ধান কেনা হবে না সেটি আগাম উপলব্ধি করা যাচ্ছে।

তাছাড়া সরকারি গুদামে ধান দিতে গেলে হয়রানির বিষয়টিও বারবার উঠে আসছে। এক্ষেত্রে ধান শুকানোর পাশাপাশি আর্দ্রতা রক্ষা করতে হয়। কৃষকদের মতে, এত প্রক্রিয়া অতিক্রম করলে প্রতি মণ ধান থেকে তিন-চার কেজি ওজন কমে যায়। সে হিসাবে স্থানীয় বাজারে ধান বিক্রি করাই কৃষকের কাছে সহজ মনে হয়। একটা বিষয় খুব সহজেই বোঝা যায়, কৃষক তো আর লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করবেন না। কারেন্ট পোকার কামড় এমনকি সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের ফলেও দেশের মোট ৩১টি জেলায় আমন ধানের আবাদি জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে চলতি আমন মৌসুমে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন পাওয়া নিয়ে কৃষি খাতসংশ্লিষ্টরা বড় ধরনের আশঙ্কায় রয়েছেন। সব মিলিয়ে কৃষকের স্বার্থ বিবেচনা করে ধান কেনার মূল্য পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এক্ষেত্রে কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের স্বার্থের বিষয়টি চলে আসে। সরকার দাম বাড়ালে খোলাবাজারে ব্যবসায়ীরা চালের দাম বাড়িয়ে দেন। তখন ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন। আবার বেসরকারি খাতে মজুদ বাড়লে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেন। তাই চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সরকারকে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে বৈশ্বিক সংকটের কারণে ভবিষ্যতে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। সে হিসাবে কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও বাজার নিয়ন্ত্রণ উভয়টিই গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সরকার কৃষকদের যত সুযোগ-সুবিধা প্রদান করুক না কেন, ন্যায্যমূল্যে ধান ও চাল ক্রয় না করলে এটি নেতিবাচক দিক হিসেবে গণ্য হবে। তাছাড়া সার্বিক বিবেচনায় সরকারি উদ্যোগে ধান কেনার পুরো প্রক্রিয়াও পুনর্বিবেচনা করতে হবে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে যদি কৃষকের অনীহা থাকে, তাহলে বর্তমানে বহুল প্রচলিত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে কৃষককে ধান ও চালের মূল্য পরিশোধ করা হোক। প্রয়োজনে সরাসরি ক্ষেত থেকে বা বাজারের নির্দিষ্ট একটি জায়গায় সরকারি উদ্যোগে ধান ও চাল সংগ্রহ করা যায় কিনা সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন। অর্থাৎ কৃষকরা সরকারি গুদামে চাল পৌঁছে দিতে যে অনীহা প্রকাশ করে সেটি বিবেচনা করা দরকার। সবার আগে কৃষকের স্বার্থ বিবেচনায় ধান ও চালের মূল্য পুনরায় নির্ধারণ করা যায় কিনা সেদিকেই এখন মনোযোগ দিতে হবে। অর্থনীতিবিদরা সম্ভাব্য খাদ্য সংকট মোকাবেলায় কৃষির ওপর গুরুত্ব দেয়ার কথা বলছেন। সে হিসাবে কৃষক যেন উৎপাদন খরচের তুলনায় ধানের ন্যায্যমূল্য পান, সে বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষকের স্বার্থে সরকারিভাবে ধান ও চাল কেনার মূল্য পুনর্বিবেচনা করা হোক, আমরা সেটিই প্রত্যাশা করি।