গত ৩০ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। মূল্যস্ফীতি এবং বিনিময় হারের চাপ নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে কিছুটা সংকোচনশীল ও সতর্ক নীতিগত অবস্থান অনুসরণ করা হয়েছে এবারের মুদ্রানীতিতে, যাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপগুলোয় তহবিলের প্রবাহ অব্যাহত থাকে। এ লক্ষ্য অর্জনে পলিসি রেট ৫ দশমিক ৫০ শতাংশে উন্নীতকরণ, ১২ দশমিক ১ শতাংশ হারে অর্থ সরবরাহের ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ১ শতাংশ নির্ধারণ, সরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে যথাক্রমে ৫ দশমিক ৬ ও ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। পাশাপাশি আমদানি বিকল্প শিল্পকে উৎসাহ দেয়ার লক্ষ্যে বিলাসী খাবার, ফলমূল, অ-সিরিয়াল খাবার এবং অন্যান্য পণ্য আমদানিতে এলসি মার্জিন বাড়ানো হয়েছে। এ পদক্ষেপ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষিত করতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে এমনকি বিনিময় হারের অবমূল্যায়নের চাপ কমাতে সহায়তা করবে।
ফাইন্যান্সের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আলোচ্য মুদ্রানীতির কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করার উদ্দেশ্যে এ নিবন্ধের অবতারণা।
প্রথমত, অর্থ সরবরাহের ঊর্ধ্বসীমা ১২ দশমিক ১ শতাংশ, পলিসি রেট ৫ দশমিক ৫ শতাংশ ও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ১ শতাংশ নির্ধারণ করা—এ ইঙ্গিত বহন করে যে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে আরো ঝুঁকি নেয়াকেই উৎসাহিত করছে। কেননা উচ্চসুদ সত্ত্বেও অর্থ সরবরাহের ঊর্ধ্বসীমা বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বিগত অর্থবছরের প্রকৃত হারের তুলনায় বাড়ানোর কারণে ব্যাংকগুলোকে অপেক্ষাকৃত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ গ্রাহককেই বেছে নিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবশ্য এটি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে যে তারা এমন শিল্পে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে চায় যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। তবে সাধারণ ব্যক্তিশ্রেণীর গ্রাহকের ঋণপ্রবাহের ব্যাপারে তাদের কর্মপরিকল্পনার বিষয়ে সর্বশেষ মুদ্রানীতি ঘোষণাপত্রে তেমন কিছু উল্লেখ করা হয়নি। ব্যক্তিশ্রেণীর ঋণ অবশ্যই সর্বনিম্ন স্তরে রাখতে হবে। অন্যথায় উচ্চতর এলসি মার্জিন সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি ও আমদানি নিয়ন্ত্রণের জন্য গৃহীত ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দিয়ে আমদানি ব্যয় বাড়তেই থাকবে। উপরন্তু রিজার্ভও ক্রমান্বয়ে কমতে থাকবে। ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা মাথায় রেখে ১২ দশমিক ১ শতাংশের ক্যাপ নির্ধারণ করাকেও অযৌক্তিক বলে মনে হয়। আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সাধারণত পূর্ববর্তী জিডিপি প্রবৃদ্ধির অভিজ্ঞতার অলোকেই নির্ধারিত হয়। আর বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার গণনার সত্যতা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। ১০ মে ২০২২ ইং প্রথম আলোয় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) একজন সাবেক সচিবের উদ্ধৃতি দিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়, যাতে বলা হয় যে বিবিএস প্রথমে ঠিক করে জিডিপি কত হবে এবং পরে ব্যাক ক্যালকুলেশন করে। তাই এ পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে বের করা কোনো লক্ষ্যকে গুরুত্বসহকারে নেয়ার কারণ নেই। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে অর্থিক প্রবৃদ্ধির ক্যাপ একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংস্থার বিশ্বাসযোগ্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা করা। বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকেও বিগত অর্থবছরের প্রকৃত প্রবৃদ্ধির সমান বা কিছুটা কম রাখাই বরং যুক্তিযুক্ত। কেননা এ বছর আমরা সংকোচন চাই, যাতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।
দ্বিতীয়ত, যদি বাংলাদেশ ব্যাংক বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির উচ্চতর লক্ষ্য নির্ধারণ করে, তবে ব্যাংকগুলো ঋণ দেয়ার জন্য আরো বেশি আগ্রহী হবে। বাংলাদেশে ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার মধ্যে তথ্য উপলভ্যতার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অসমতা রয়েছে, যার ফলে ব্যাংক সঠিক বা ভালো গ্রাহক নির্ধারণে প্রায়ই ব্যর্থ হয়। বেসরকারি খাতের উচ্চঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার কারণে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। উপরন্তু ২০২১ সালের ২১ ডিসেম্বর থেকে ২০২২-এর ২২ মার্চের মধ্যে মোট ঋণের সঙ্গে শ্রণীবদ্ধ ঋণের অনুপাত ৭ দশমিক ৯৩ থেকে ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। যদি ঋণ বৃদ্ধির জন্য একটি উচ্চতর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়, তবে কম নির্ভরযোগ্য বা খারাপ গ্রাহককে ঋণ দেয়ার ফলে অনুপাতটি আরো বেড়ে যাবে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক কীভাবে নন-পারফরমিং লোনের (এনপিএল) প্রবৃদ্ধি মোকাবেলা করতে চায়, সে সম্পর্কে কোনো কিছুই মুদ্রানীতিতে উল্লেখ করা হয়নি। পরিসংখ্যান বলছে, আগের বছর বাংলাদেশের মোট এনপিএলের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা বা জিডিপির ৩ শতাংশের সমান। এত বিপুল পরিমাণ এনপিএল দেশের মুদ্রাস্ফীতি এবং ব্যাংকগুলোর তারল্য সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। উপরন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মরাটরিয়াম বা স্থগিতাদেশ বাড়িয়েছে। যদি দীর্ঘসময় ধরে এ ধরনের স্থগিতাদেশের ক্রমাগত সম্প্রসারণ ঘটে, তবে ঋণদাতাদের মধ্যে খেলাপি হওয়ার একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। ভালো কোম্পানিগুলোও তাদের উত্পাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য এবং প্রতিযোগিতামূলক থাকার জন্য ঋণখেলাপি হতে শুরু করবে।
তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অবশ্যই টাকা ও ডলারের বিনিময় হার ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে, যাতে এটি বিনিময় হারের অতিদ্রুত পতনকে ঠেকাতে বিজ্ঞতার সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে পারে। বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে রিজার্ভ থেকে ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজারে ছেড়েছে। তবে এতে তাদের লক্ষ্য অর্জন হয়নি বললেই চলে। এটি উল্লেখ্য যে টাকার ধীর অবমূল্যায়ন আমাদের বরং উপকারই করে এবং রফতানি আয় বাড়ায়। কিন্তু টাকার মানের হঠাৎ উল্লেখযোগ্য ও ক্রমাগত পতন বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে। এটি কেবল রফতানিকারকদের ওপর চাপই সৃষ্টি করে না, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমদানি বিল পরিশোধের ব্যয়ও অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে তোলে। আমদানির ওপর আমাদের ব্যাপক নির্ভরতার ফলে অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতিও বাড়ে। রফতানিকারকরাও এক্ষেত্রে অতিদ্রুত বাজার হারাতে পারেন, কারণ তাদের কাঁচামালের অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির কারণে (কেননা বাংলাদেশের বেশির ভাগ রফতানিকারকই তাদের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করেন) তাদের অবশ্যই পণ্যের বিক্রয়মূল্যও অস্বাভাবিক হারে বাড়াতে হয়। সুতরাং রফতানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলকতা বজায় রাখা এবং কার্যকরভাবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য টাকার ধীর অবমূল্যায়ন আবশ্যক।
সবশেষে বলতে চাই যে বড় ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে কভিডের প্রভাব থেকে নিজেদের ব্যবসা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এসএমইগুলো পারেনি। প্রণোদনা প্যাকেজের বেশির ভাগই ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেয়ার কারণে অনানুষ্ঠানিক এসএমইগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হয় ঋণ নেয়নি নতুবা ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় ঋণ পায়নি। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ আবশ্যক। এতে অনানুষ্ঠানিক এসএমইগুলো কভিডের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সমর্থ হবে। এতে দেশে কর্মসংস্থান বাড়বে। অন্যথায় প্রণোদনা প্যাকেজও দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহিত না করে কেবল মূল্যস্ফীতিকেই উসকে দেবে।
মো. কামরুল বারী, এমআইপিএ এএফএ: ব্যবস্থাপনা পরামর্শক, স্বাধীন গবেষক এবং অস্ট্রেলিয়া ও ইউকের প্রত্যয়িত হিসাবরক্ষক; বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে ডক্টরেট করছেন










