বাংলাদেশের সরকার এক নির্বাহী আদেশে গত ৬ আগস্ট জ্বালানি তেলের মূল্য এক লাফে প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দেয় এবং রাত ১২টা থেকেই তা কার্যকর হয়। সরকারের তরফ থেকে বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছিল, বিশ্ববাজারে দাম কমলে বাংলাদেশেও দাম কমানো হবে। সরকার যে সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় তখন বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতির দিকে। এটি নিয়ে সে সময় অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন। একবারে জ্বালানি তেলের এমন বৃদ্ধির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এর প্রভাবে বাজারে যেমন সব জিনিসের দাম বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে পরিবহন খরচও। ক্ষেত্রবিশেষে যতটুকু ব্যয় ও পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কথা, বেড়েছে তার থেকে বেশি। এভাবে দাম বাড়ানোর ব্যাখ্যা দিয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলেছিল, ১৩ নভেম্বর ২০২১ স্থানীয় পর্যায়ে ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য বৃদ্ধি করে পুনর্নির্ধারণ (ডিজেল ৮০ টাকা ও কেরোসিন ৮০ টাকা) করা হয়। সে সময় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির প্রবণতা সত্ত্বেও অকটেন ও পেট্রলের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়নি। এর আগে ২০১৬ সালে সরকার জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে পুনর্নির্ধারণ করেছিল। অর্থাৎ এরপর দীর্ঘদিন আর আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামার সঙ্গে সমন্বয় করা হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও করোনার অভিঘাত মোকাবেলায় দেশের অর্থনীতি যখন হিমশিম খাচ্ছে. সে সময় এমন সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক ছিল।

নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে সরকার ২৯ আগস্ট জ্বালানি তেলের দাম ৫ টাকা কমানোর ঘোষণা দেয়। বলা হয়, জ্বালানি তেলের ওপর সমুদয় আগাম কর অব্যাহতি এবং আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশের পরিবর্তে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করার পরদিন ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রলের দাম লিটারে কমানো হয়েছে ৫ টাকা করে। কিন্তু এর কোনো প্রতিফলন আমরা পরিবহন ভাড়া বা নিত্যপণ্যের দামের ক্ষেত্রে দেখতে পেলাম না। প্রশ্ন হলো, দাম কমিয়ে তাহলে কী লাভ হলো বা কার লাভ হলো? শুল্ককর ছাড় দেয়ায় সরকার ২-৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। পরিবহন মালিকদের মুনাফা স্ফীত হয়েছে। ব্যবসায়ীরাও লাভবান হয়েছেন। সাধারণ মানুষ এখান থেকে কোনো উপকার পায়নি। এ সমস্যাটি আমাদের সবসময়ই ছিল এবং থাকবে। কারণ পরিবহনের ভাড়া সরকার কোনো নিয়ম-কানুনের মধ্যে রাখতে পারে না। এর জন্য কোনো ফর্মুলাও তৈরি করা হয়নি, সরকারের কোনো নীতিও নেই। মালিক-শ্রমিক যদি মানে তাহলে নির্ধারিত ভাড়া কাজ করে, যদি তারা না মানে তাহলে নিজেদের ইচ্ছাখুশিমতো ভাড়া নির্ধারণ করে। সরকার শুধু মালিক পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ভাড়া নির্ধারণ করে। ভোক্তা বা যারা সেবা গ্রহণ করে তাদের কারো সঙ্গে ন্যূনতম আলোচনা করার প্রয়োজন বোধ করে না। শুধু তাই নয়, ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক কোনো প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হয় না।

পরিবহন পরিচালনায় জ্বালানি ব্যয় একটি অংশ মাত্র। এছাড়া গাড়ির দাম, কর্মচারীপ্রতি ব্যয়, টিকিট কাউন্টার, সড়কে টোল, চাঁদা, সরকারের শুল্ক ইত্যাদি বিবেচনায় নিলে পরিবহন ব্যয়ে জ্বালানি খরচ ৫০ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা নয়। তাহলেও পরিবহনের ভাড়া এত বৃদ্ধি পাওয়ার কথা নয়। গেল বছর যখন জ্বালানি তেলের দাম সরকার ২৩ শতাংশ বাড়িয়েছিল তখন বাস মালিকরা ২৮ শতাংশ ও লঞ্চ মালিকরা আরো বেশি ভাড়া বাড়িয়েছিল। এক্ষেত্রে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। পরিবহন মালিকরা যা বলে সরকার সেটিই নির্ধারণ করে। আর সরকার পরিবহনের ক্ষেত্রে শুধু নন-এসি বাস ও ট্রাকের ভাড়াই নির্ধারণ করে, এসি বাসের ভাড়া মালিক পক্ষ যেমন খুশি তেমন আদায় করছে, দেখার কেউ নেই।

শুধু পরিবহনের ভাড়া নয়, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কথাই বলা যাক। এক কেজি আলু পরিবহনে বা উৎপাদনে জ্বালানির প্রভাব কতটা পড়ার কথা, কয়েক পয়সা মাত্র।  কিন্তু আমরা কী দেখলাম, আলুর দাম ৩-৪ টাকা কেজিপ্রতি বেড়ে গেল। সরকার কিছুই করল না, করার ক্ষমতাও নেই। চাল, ডাল, পেঁয়াজসহ অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। কোনো কিছুতেই সরকারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা খুবই দুর্বল সেখানে জ্বালানি তেলের দাম একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে রেখে দেয়াই উত্তম। এক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মূল্য বিবেচনায় নিয়ে একটি দাম নির্ধারণ করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলে সরকার মুনাফা করবে আর যখন দাম বাড়বে সরকার তখন মুনাফা থেকে ভর্তুকি দেবে। এতে বাজার স্থিতিশীল থাকবে। এমন একটি পরিষ্কার পরিকল্পনা তৈরি করে এগোতে হবে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর দামটি পুনর্নির্ধারণ করা যায়। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে দেশের বাজারে দাম ওঠানামা করানোর পরিস্থিতি বাংলাদেশে বিরাজ করে না। কারণ আমাদের এখানে জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমন্বয় করে যেভাবে অন্যান্য খাতে দাম বাড়া-কমা করার কথা সেটি হয় না। দাম বেশি বাড়ে, জনগণের ওপর বেশি প্রভাব পড়ে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য সম্পর্কে আগাম ধারণা করা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ ব্যবহার হয় পরিবহনে। আর বিশ্ব এখন ধীরে ধীরে বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে চলে যাচ্ছে। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমার সম্ভাবনা বেশি। তবে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে কী হবে, সেটি বলা মুশকিল। করোনার সময়ই জ্বালানি তেলের দাম অনেক কমেছিল। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানির বিশ্ববাজার বিপরীত আচারণ শুরু করে। ইউরোপে গ্যাসের জোগান বন্ধ করে দিচ্ছে রাশিয়া। ফলে জ্বালানির ওপর চাপ আরো বাড়বে। যুদ্ধকালীন এমন পরিস্থিতিতে তেলের দাম কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা অনুমান করা কঠিন। তবে যাই হোক না কেন তেলের দাম খুব বেশি বৃদ্ধির সম্ভাবনা কম। দাম বেড়ে ১১৫-১২৫ ডলারে চলে যেতে পারে, তবে সেটি যুদ্ধের অবস্থার ওপর নির্ভর করবে। যুদ্ধ কমে এলে দাম কমেও যেতে পারে। ইউরোপ গ্যাসের দামের ক্ষেত্রে প্রাইস ক্যাপিং করার উদ্যোগ নিয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তারা সেখান থেকে সরে এসেছে। রাশিয়ার জ্বালানি তেলের ওপর প্রাইস ক্যাপিং করার কথা তারা বলেছিল। কিন্তু রাশিয়া হুমকি দিয়েছিল, এটি করা হলে তারা জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেবে বা অন্যান্য ব্যবস্থা নেবে। সুতরাং ইউরোপ জ্বালানির প্রাইস ক্যাপিংয়ের পদক্ষেপ নিতে পারেনি।

বাংলাদেশে জ্বালানির দাম নির্ধারণে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কোনো ভূমিকা আমরা দেখি না। অথচ আইন অনুযায়ী বিইআরসির মাধ্যমে জ্বালানির দাম নির্ধারণের কথা। কিন্তু সরকারের যুক্তি হলো, যেহেতু আমরা জ্বালানিতে ভর্তুকি দিই, তাই এর দাম আমরাই নির্ধারণ করব, এখানে বিইআরসির কোনো ভূমিকা থাকতে পারে না। এখানেই প্রশ্ন নিহিত। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বিভিন্ন ব্যয় হিসাব করে জ্বালানির যে মূল্য নির্ধারণ করে সেটি পরিষ্কার নয়। বিপিসি মাঝেমধ্যে পরিপত্রের মাধ্যমে দেখাচ্ছে যে এ ব্যয় হলে জ্বালানির দাম এই হয় ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এসবের বিস্তারিত কোনো হিসাব আমরা পাই না। বিপিসি পরিবহন ব্যয়, শ্রমিক ব্যয়, অবকাঠামোগত ব্যয়, সিস্টেম লস প্রভৃতি হিসাব করে যে ব্যয় দেখায় সেটি নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। জনগণও বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত নয়। ওয়েবসাইটে সবকিছু কেন স্পষ্ট করে দেয়া হবে না? বিপিসি যা বলছে সেটি যে সঠিক, তাও আমরা যাচাই করতে পারি না। এ কারণে বিইআরসির মাধ্যমে জ্বালানির দাম নির্ধারণ উচিত। জ্বালানির সঠিক দাম কত হতে পারে, সেটি জানা জরুরি। জ্বালানির দাম বিইআরসির মাধ্যমে নির্ধারিত হলে ভোক্তারা সেখানে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাবে। সবচেয়ে বড় বিষয়, এটি একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। বিপিসি কয়েকদিন আগে বলল, গেল ছয় মাসে তারা ৮ হাজার কোটি টাকা লোকসান করেছে। তার মানে তারা প্রতিদিন গড়ে ৪৫ কোটি টাকা লোকসান করেছে। কিন্তু বলার সময় বিপিসি বলল তারা প্রতিদিন ৮০ কোটি টাকা লোকসান করছে। হিসাব তো মিলল না। এমন শত অসামঞ্জস্য তাদের হিসাব ও বক্তব্যে রয়েছে।

বিপিসির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বড় অভাব রয়েছে। যখন তারা মুনাফা করেছে তারা একদিনও বলেনি যে তারা মুনাফা করছে। এখন আমরা জানতে পারলাম বিপিসি ৭ বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। বিপিসি ৫ শতাংশ মার্জিন রেখে জ্বালানি তেল বিক্রি করে। অর্জিত ৪০ হাজার কোটি টাকা এ মার্জিনের বাইরে। ফলে পুরো অর্থটাই রয়ে গেছে। বিপিসি একক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয়। তারা এভাবে মুনাফা করতে পারে না। ৫ শতাংশ মার্জিন দিয়ে তাদের পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করতে পারার কথা। তাদের অর্জিত অতিরিক্ত মুনাফা ভর্তুকি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু সে টাকাটা সরকার আবার নিয়ে গেছে বলে জানা যাচ্ছে। যদিও তারা বলছে, এ অর্থ তারা বিভিন্ন জায়গায় বিনিয়োগ করেছে। কোথায় কী পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে সেটি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কারণ এ সময়ে বিপিসির সক্ষমতা খুব বেশি বেড়েছে বলে জানা যায় না। বিপিসি অতিরিক্ত মুনাফার ক্ষেত্রে সরকারের দ্বৈধতা দেখা যাচ্ছে। পণ্য ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফা করলে তাদের শাস্তি দেয়া হচ্ছে, জরিমানা এমনকি জেলও দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠানই মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা করছে, তা কোনো অবস্থাতেই যুক্তিসংগত নয়।

 

ড. ম তামিম: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ; বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেল রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক; সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানি বিষয়ক বিশেষ সহকারী