বাংলাদেশের উপকূলে প্রতি বছর আঘাত হানে কোনো না কোনো ঘূর্ণিঝড়। ফলে জনজীবনে নেমে আসে চরম ভোগান্তি। বাংলাদেশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০-২০১৭ সাল পর্যন্ত মোট ৩৩টি বড় সাইক্লোনের ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়। ২০১৯ সালের ২ মে বিবিসি বাংলা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশে আঘাত হানা পাঁচটি সাইক্লোন নিয়ে। সে প্রতিবেদন থেকে পাওয়া যায়, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর সর্বোচ্চ ২২৪ কিলোমিটার বেগে চট্টগ্রামে আঘাত হানা প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে ১০-৩৩ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হয় এবং প্রবলতম ঘূর্ণিঝড়ে পাঁচ লাখ মানুষ নিহত হয়। ১৯৮৫ সালে উরিরচরের ঘূর্ণিঝড় নামে পরিচিত সাইক্লোনটির বাতাসের গতিবেগ ছিল ১৫৪ কিলোমিটার। ১৯৯১ সালের ২৯-৩০ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ের ফলে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল বলে জানা যায়। রেড ক্রসের হিসাবে, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর খুলনা-বরিশাল উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানা সিডরের কবলে পড়ে ১০ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। ২০০৯ সালের ২৫ মে পশ্চিমবঙ্গ-খুলনা উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানা প্রবল ঘূর্ণিঝড় আইলায় কম মানুষ মারা গেলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। এছাড়া গত কয়েক বছরে ঘূর্ণিঝড় নার্গিস, মহাসেন, ফণী, বুলবুলসহ নানা নামের ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে উপকূলীয় অঞ্চল। এ ঝড়গুলোর পরে ঝড়ের কারণে মৃত্যু, বাঁধ ভাঙনের ফলে লোকালয় প্লাবিত, বিভিন্ন স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু সিত্রাং একটু অন্য পথে হেঁটেছে। সিত্রাংয়ের কবল থেকে বাদ যায়নি রাজধানীও।

আধুনিকতার কারণে সারা বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার বেড়েছে চরমভাবে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশে কী পরিমাণ মানুষ শুধু ফেসবুক ব্যবহার করে তার সঠিক পরিসংখ্যান না জানা গেলেও পোল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নেপোলিয়নক্যাটের ২০২১ সালের মে মাসের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওই বছরের মে মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৮২ লাখ ৩০ হাজার, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ২৮ শতাংশ। মনে প্রশ্ন আসতে পারে, ফেসবুক ব্যবহারের সঙ্গে সিত্রাংয়ের সম্পর্ক কী? বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, ‘কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ’। কিছু কিছু মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কয়েক দিন ধরে সিত্রাং নিয়ে ফেসবুকে লাইভ করে। অনেকের ধারণা, এর ফলে সামাজিকভাবে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়তে পারে। সেটা হয়তো সত্যি হতে পারে। তবে এভাবে লাইভের মূল কারণই হলো রাতারাতি জনপ্রিয়তা এবং ভিউ বাড়ানোর দুরভিসন্ধি। ৪ জুন ২০২২ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের সময় অনেককেই দেখা গিয়েছে ভিডিও ও ছবি ধারণ করতে। অলিউর রহমান নামে তাদেরই একজন ডিপোর শ্রমিক নিরাপদ দূরত্বে না থেকে বরং দীর্ঘ সময় ধরে ঘটনাস্থলের অনেকটা কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ফেসবুকে লাইভ করছিলেন। তার লাইভের ৪০ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডের মাথায় ডিপোর কনটেইনারগুলোয় হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণের ফলে প্রাণ যায় অলিউর রহমান। কোথাও কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেও অনেক মানুষের মাঝে ফেসবুক লাইভের প্রবণতা এতটাই প্রকট যে, সে ভুলে যায় মৃত্যুর ঝুঁকি। অনেক মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠেছে অরক্ষিত ফেসবুক লাইভ। একটি টিভি চ্যানেলের সংবাদ চলাকালে ধরা পড়ে সমুদ্রের তীরে সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় একজনকে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় ছবি তুলতে, অনেকেই আবার ভিডিও তৈরি করছে। এ ধরনের ঘটনার কারণে প্রকৃত ভুক্তভোগীদের মনে বিষণ্নভাবে দাগ কাটে। অনেকেই বর্ষণের কারণে রোমান্টিক মনোভাবকে তুলে ধরেন। বর্ষা হলে বাঙালির মনে রোমান্টিকতার আবির্ভাব নতুন নয়। কিন্তু মনে রাখা দরকার, যেখানে লাখ লাখ মানুষের জীবন বিপন্নের মুখে, হাজার হাজার ঘরবাড়ি নিমেষেই হারিয়ে যেতে পারে সেই ধরনের আশঙ্কার মধ্যে এ রকম অনুভূতি প্রকাশ খুবই বেমানান। সংকটকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কতটা অপব্যবহার হতে পারে সেটা দেখা গিয়েছে সিত্রাংয়ের সময়। সংকটকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কীভাবে সঠিক ব্যবহার করা যেতে পারে সেটা নিয়ে এখন ভাবার সময় এসেছে।

সিত্রাং যে শুধু উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবনে ভোগান্তি ডেকে এনেছে তা নয়, শহর জীবনেও এর প্রভাব পড়েছে। সিত্রাংয়ের ফলে অতিবৃষ্টির কারণে রাজধানীতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়, অনেক রাস্তায় গাছ ভেঙে পড়ে, বিভিন্ন এলাকার অলি-গলিতে পানি জমে যায়, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৮০ লাখ গ্রাহক বিদ্যুিবচ্ছিন্ন অবস্থায় পড়ে বলে মঙ্গলবার গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। জলাবদ্ধতার কারণে ঢাকা শহরের যানজটের ভোগান্তির চিত্রও ভেসে এসেছে। এ জলাবদ্ধতার বিষয়টি যে সিত্রাংয়ের সময়ে হয়েছে তা নয় বরং যখনই ভারি বৃষ্টিপাত হয় তখনই জলাবদ্ধতা গ্রাস করে শহরকে। সিত্রাং আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে, ঝড়ের কবল থেকে বিদ্যুতের কাঠামোকে রক্ষা করতে না পারলে সেটা মানুষের জীবনমান ও অর্থনীতির চাকার ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষার জন্য আধুনিক পানি নিষ্কাশন এবং নদীনালা ও খালের প্রবাহ বাড়ানো দরকার।

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং সব মিলিয়ে কেড়ে নিয়েছে ৩৮টি জীবন। বিধ্বস্ত হয়েছে প্রায় ১০ হাজার ঘরবাড়ি, উপড়ে পড়েছে গাছপালা, বিদ্যুতের খুঁটি, ক্ষতি হয়েছে ক্ষেতের ফসল, মাছের ঘের, যোগাযোগ ব্যবস্থা, মানবজীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি। এ ঝড়ের পূর্বাভাস ১ অক্টোবর দেয়া হলেও দুর্যোগ মোকাবেলায় যে ঘাটতি ছিল সেটা জীবননাশ ও ক্ষয়ক্ষতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়। আগামী ডিসেম্বরেও একটা ঝড় আঘাত হানতে পারে বাংলাদেশে, এ ধরনের একটি বার্তা প্রকাশ হয়েছে গণমাধ্যমে। এখনই সময় সিত্রাং থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামীর ঝড়গুলোকে মোকাবেলার জন্য সচেতনতা বাড়ানো, আধুনিক ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ, আশ্রয়ণ হাউজের পরিমাণ বৃদ্ধিসহ নানা ধরনের পরিকল্পনা হাতে নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যাতে করে প্রাণহানি না হয়, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানো সম্ভব হয়।

 

জিএম আরিফুজ্জামান: রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়