সাম্প্রতিক এক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা আগামী ছয় মাস অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জ্বালানি বলে মন্তব্য করেছেন। চলমান জ্বালানি সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে এ মন্তব্য করেছেন তিনি। বেশ কিছুদিন ধরে দেশে জ্বালানি সংকট চলছে। এর ফলে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও চাহিদা অনুপাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে পরিকল্পিত লোডশেডিং চালু করা হয়েছে। বাণিজ্যিক ভবনগুলোয় বিদ্যুৎ ব্যবহার সীমিত করার পাশাপাশি কর্মঘণ্টাও কমানো হয়েছে। কমানো হয়েছে দোকানপাট ও শপিংমল খোলা রাখার সময়সীমাও। পরিবহন খাতে দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে গ্যাস। দিনে কয়েক ঘণ্টা সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোয় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হচ্ছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের এতসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও সংকট সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি বজায় থাকলে সামনে অর্থনীতিতে যে বিপুল ক্ষতি হবে, তা সহজেই অনুমেয়। তাই সংকট নিরসনে দেশীয় জ্বালানি খাত উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।

আজকের এ সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। অনেক দিনের ভুল পরিকল্পনায় এটি তৈরি হয়েছে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে অনেক দিন ধরে প্রাথমিক জ্বালানির বড় উৎস স্থানীয় প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহূত হয়ে আসছে। এক সময় এর ওপর নির্ভরতা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু স্থানীয় গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসার পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানীকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রতি ঝোঁকার নীতি নেয়া হয়েছে। টার্মিনাল নির্মাণ, পাইপলাইন স্থাপনসসহ এলএনজি ঘিরে বিপুল বিনিয়োগ পরিকল্পনা  করা হয়েছে। এর মধ্যে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে গেলে সরকারের সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। এখন স্পটমূল্য এত বেড়ে গিয়েছে, এ দামে এলএনজি কিনে পোষানো সম্ভব হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারের উদ্বায়িতার যুক্তি দিয়ে বার বার বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে আগে থেকে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে। এলএনজির পরিবর্তে তারা দেশীয় গ্যাসের মজুদ, অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বেশি নজর দেয়ার কথা বলেছিল। এলএনজি আমদানি একান্ত প্রয়োজন হলেও তা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ভিত্তিতে ফরওয়ার্ড মার্কেট থেকে কেনার পরামর্শ দিয়েছিল কেউ কেউ; যেহেতু স্পট মার্কেটে ওঠানামা অনেক বেশি। বেশি ব্যয়ের দোহাই দিয়ে সে ধরনের চুক্তি করা হয়নি। আবার গ্যাসের স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতেও নেয়া হয়নি উদ্যোগ। সব মিলিয়ে আমাদের ভুগতে হচ্ছে জ্বালানি সংকটে।

আগে থেকেই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের একটা বড় অবকাঠামোগত দুর্বলতা ছিল নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ। চলমান জ্বালানি সংকট এ চ্যালেঞ্জ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে নিশ্চয়ই শিল্পোদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরা সীমাহীন ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। বিদ্যুিবভ্রাট বা অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান মালিকের ভাষ্যে উঠে এসেছে, তাদের একটি কারখানায় একবার বিদ্যুিবভ্রাট ঘটলে ৫২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। এ হিসাবে তাদের পাঁচটি কারখানায় ন্যূনতম একবার বিদ্যুিবভ্রাট হলেও তারা কমপক্ষে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। এছাড়া কম্পিউটারাইজড মেশিনগুলো চালু অবস্থায় হঠাৎ বিদ্যুিবভ্রাটের কারণে বন্ধ হলে সফটওয়্যার সিস্টেমও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ক্ষতির পরিমাণ আরো বেড়ে যায়। একে তো মানসম্পন্ন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি আছে। আবার অনেক সময়ই ভোল্টেজ ওঠানামা করে। তাতে উৎপাদন ব্যাহত ও পণ্যের ক্ষতি হয়। ফলে ব্যবসায়ীদের বিপুল পরিমাণ লোকসানও গুনতে হয়। আবার ভোল্টেজ ওঠানামায় কারখানার যন্ত্রপাতির ক্ষতি হয় এবং অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল কমে যায়। ফলে এককালীন ক্ষতিও কম নয়। শিল্প-কারখানার উৎপাদনে এ বাধা ও ক্ষতির কারণে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। যার প্রভাব খুচরা ভোক্তা পর্যায়েও পড়ে। আর রফতানিমুখী শিল্পে খরচ বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশের পণ্য। শিল্প মালিকরা সঠিক লোড ও ভোল্টেজে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে দীর্ঘদিন দেনদরবার করে চলেছে। কিন্তু আশানুরূপ ফল না পাওয়ায় দুই দশকের বেশি সময় বড় শিল্প-কারখানাগুলো ক্যাপটিভ বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করেই চলছে। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কারণে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনেও খরচ বেড়েছে। ফলে পণ্য উৎপাদন খরচও সমহারে বাড়ছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে মূল্য প্রতিযোগিতায় দেশের রফতানিমুখী পণ্যগুলোর সক্ষমতা কমছে। একইভাবে নজিরবিহীন জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তে জনজীবন, পরিবহন এবং কৃষিতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ভুগছে অর্থনীতি। বলা চলে, জ্বালানি সংকটের প্রভাব বহুমুখী।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় এরই মধ্যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে এলাকাভিত্তিক ছুটির দিন সমন্বয় করা হয়েছে। এটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হলে একদিকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের সাশ্রয় হবে। অন্যদিকে অন্তত ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সাশ্রয় হবে। তাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছুটা বাড়লে অন্যান্য এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে। সন্দেহ নেই, এতে বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর চাপ কিছুটা প্রশমিত হবে। আরো কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জ্বালানি সাশ্রয়ের এসব উদ্যোগ দিয়ে কতদিন পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাবে? দেশের অর্থনীতি ক্রমেই বড় হচ্ছে। শিল্পায়ন সম্প্রসারিত হচ্ছে। সামনে জ্বালানি চাহিদা আরো বাড়বে। তাই এক্ষেত্রে আমাদের আরো দূরদর্শী ভাবনা-চিন্তা জরুরি।

দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার পূর্বশর্ত প্রাথমিক জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো। প্রাথমিক জ্বালানিতে আমাদের গত এক দশকে বড় ধরনের কোনো বিনিয়োগ হয়নি। অথচ অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে। এসব খাতে বিনিয়োগ করে সুফলও কম। দেশের অনেক জায়গায় গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে, কিন্তু এসব লাইনে গ্যাস সরবরাহ করা যায়নি। অথচ এ পরিমাণ অর্থ গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে বিনিয়োগ করা গেলে সেখান থেকে নিশ্চিতভাবেই ইতিবাচক ফল পাওয়া যেত। বিদেশের বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা বিপুল, কিন্তু সরকার গ্যাস অনুসন্ধানে তেমন উদ্যোগ নেয়নি। দেশের ভূখণ্ডের অনেকাংশই এখনো অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়নি; বিশাল সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান ন্যূনতম পর্যায়ে রয়ে গিয়েছে। জলসীমার আইনগত মীমাংসার পর থেকে মিয়ানমার ও ভারত বঙ্গোপসাগরে ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। মিয়ানমার এরই মধ্যে সমুদ্রে গ্যাস পেয়েছেও। আমরা সেদিকে তেমন মনোযোগ দিইনি।

অপরিণামদর্শিতা ও ভ্রান্তনীতির কারণে অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশ আজ জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম না কমলে জ্বালানি সংকট আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। এজন্য এলএনজির বিকল্প হিসেবে সরকার স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী পুরনো ও নতুন কিছু কূপের সংস্কারকাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে, কয়েকটির চলছে। নতুন করে খনন করা হচ্ছে আরো প্রায় দেড় ডজন। একই সঙ্গে স্থানীয় গ্যাসের সঙ্গে এলএনজি মিশ্রণের জন্য কাতারের সঙ্গে থাকা চুক্তি কম মূল্যে দীর্ঘমেয়াদি রূপ দেয়া যায় কিনা, সে সম্পর্কে ভাবনা-চিন্তা চলছে। এছাড়া রাশিয়া থেকে ক্রুড অয়েল কীভাবে আমদানি করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরে জ্বালানি নিয়ে ভারতের সঙ্গেও আলাপ হবে বলে আশ্বাস মিলেছে। বহুমুখী পদক্ষেপের মাধ্যমে জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে—এটাই প্রত্যাশা।