ওয়ালি-উল-মারূফ
মতিনের মৃত্যু
এক অর্থে
তার অকালপ্রয়াণ।
গত ২০
সেপ্টেম্বর তিনি
যখন হূদরোগে
মারা যান,
তখন তার
বয়স হয়েছিল
মাত্র ৫৭
বছর। আর্থিক
খাতে প্রবলভাবে
সক্রিয় মাত্র
৫৭ বছরের
এই স্বপ্নতাড়িত
মানুষটি বাংলাদেশের
ক্যাপিটাল মার্কেটকে
পৌঁছে দিতে
চেয়েছিলেন বিশ্বমানে।
পুঁজিবাজারে বুক
বিল্ডিং পদ্ধতি,
ডিমিউচুয়ালাইজেশন কিংবা
সিডিবিএল প্রতিষ্ঠাসহ
বেশির ভাগ
সংস্কারে তার
ভূমিকা ছিল
মুখ্য। দেশে
অটোমেটেড শেয়ার
ট্রেডিংসহ বড়
ধরনের যেসব
সংস্কার হয়েছে,
তার প্রায়
সবটাতেই রয়েছে
মারুফের অনন্য
অবদান। নব্বইয়ের
দশকের মধ্যভাগে
তিনি যখন
চিটাগং স্টক
এক্সচেঞ্জের ম্যানেজিং
ডিরেক্টর, তখন
সেখানে ঢাকা
স্টক এক্সচেঞ্জের
আগেই অটোমেটেড
শেয়ার ট্রেডিং
শুরু করেন।
এছাড়া বাংলাদেশ-ভারত
মিলে কমোডিটি
এক্সচেঞ্জ চালুরও
উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
২০ সেপ্টেম্বর
ভোরে ল্যাবএইড
হাসপাতালে মারা
যাওয়ার আগ
পর্যন্ত মারূফ
ছিলেন প্রাইভেট
ইকুইটি ও
ভেঞ্চার ক্যাপিটাল
প্রতিষ্ঠান মসলিন
ক্যাপিটালের প্রতিষ্ঠাতা
ও ম্যানেজিং
ডিরেক্টর।
আমি
ক্যাপিটাল মার্কেটের
মানুষ নই।
মারুফের সঙ্গে
আমার পরিচয়-ঘনিষ্ঠতা
দূরবর্তী আত্মীয়তার।
ওর চাচি
আমার স্ত্রীর
খালা। আমি
তখন কয়েক
দিনের জন্য
সপরিবার চিটাগং।
পরিচয়ের সন্ধ্যায়
সে আমাদের
ডিনারে নিতে
সার্কিট হাউজে
এল। পরদিন
স্টক এক্সচেঞ্জের
কাজের ব্যস্ততার
মাঝেও নিয়ে
গেল আর্মি
গলফ ক্লাবে।
লাঞ্চে। বিকালে
কর্ণফুলীর পাড়ে
বোট ক্লাবে।
এতটাই আত্মীয়বৎসল
কিংবা মানবিক
ছিল সে।
খুব বেশি
নয়, দু-চারবার
মারূফ আমাদের
বাসায় এসেছে।
কাজের চাপে
যখন দমের
দরকার হতো
তখন সে
মৃদু গল্প
করতে করতে
সময়টি হালকা
করে নিত।
অথবা বলা
যায়, আমরা
হালকা পানাহারে
নিজেদের ক্লান্তিগুলো
ঝেড়ে ফেলতাম।
ওই সন্ধ্যাগুলোয়
আমি মারুফের
নানামুখী গুণের
সঙ্গে পরিচিত
হতে থাকি।
বিশ্বব্যাংকের কনসালট্যান্ট
হিসেবে সিয়েরা
লিওনের স্টক
মার্কেটের আধুনিকায়ন
ওর হাতে।
সে শুধু
একজন আন্তর্জাতিক
ক্যাপিটাল মার্কেট
বিশেষজ্ঞই নয়,
তার প্রতিভা
বহুমুখী। মারূফ
একজন গুরুত্বপূর্ণ
লেখক। বিনিয়োগ,
সমাজচিন্তা, সমষ্টিগত
সুখ কিংবা
অর্থনীতি নিয়ে
তার রচনা
চমকপ্রদ। ওর
বাজেট ভাবনা
নিয়ে লেখা
কখনো কখনো
আমাদের উন্নত
সাহিত্য রচনাকেও
ছাড়িয়ে যেতে
চায়। পাঠকের
তখন ভুল
হতে পারে—তিনি
কি অর্থনীতি
নিয়ে লিখছেন,
নাকি সাহিত্য
করছেন। যেমন
‘ওমর খৈয়ামের
রুবাই বনাম
মাল মুহিতের
বাজেট’ (পাওয়া
যাবে গুগল
সার্চে)।
মানসিক স্বাস্থ্য
সম্পর্কে তার
রয়েছে অনেক
চিন্তাশীল রচনা।
শুধু তাই
নয়, বাংলাদেশে
মানসিক স্বাস্থ্যচর্চা
এগিয়ে নেয়ার
অভিপ্রায়ে সে
বিভিন্ন সংগঠনের
সঙ্গে নিজেকে
ঘনিষ্ঠ রেখেছিল।
তার জ্ঞানচর্চার
ক্ষেত্র ছিল
কতকটা প্রান্তরের
মতো। মৃত্যুর
আগে কিংস?
কলেজ, লন্ডন
থেকে মারূফ
নিউরোসায়েন্সে এমএস
ডিগ্রি শেষ
করেছিল। তবে
ওই সুখবর
তার শুনে
যাওয়ার সৌভাগ্য
হয়নি। ঢাবি
থেকে অর্থশাস্ত্রে
মাস্টারস মারুফের
সাহিত্য থেকে
আরম্ভ করে
প্রায় সব
বিষয়েই ছিল
প্রবল আগ্রহ।
ওর প্রতিভার
ক্ষ্যাপামি তাকে
আইবিএতে এমবিএ
কোর্সটি শেষ
করতে দেয়নি।
এর কয়েক
বছর পর
ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি
অব সাউদাম্পটন
থেকে অ্যাকাউন্ট
অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট
সায়েন্সে এমএসসি
করে মারূফ
তা পুষিয়ে
নেয়।
মৃত্যুর আগের মাসগুলোয় স্বপ্নদ্রষ্টা মারূফ মতিন আসন্ন ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লব’ ভাবনায় আচ্ছন্ন ছিল। ভাবনাটি ছিল আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তিগুলো চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ধারণ করার জন্য প্রস্তুত থাকুক। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ধারণা প্রসারের জন্য তার অনেক পরিশ্রমে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান Klaus Schwab-এর The Forth Industrial Revolution গ্রন্থটি বাংলায় অনূদিত হয়ে কয়েক মাস আগে প্রকাশিত হয়। মিউচুয়াল ফান্ড, মার্চেন্ট ব্যাংকিং, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টসহ ক্যাপিটাল মার্কেটের খুব কম ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে মারুফের দক্ষ পেশাদারিত্বের ছাপ নেই। তার কর্মযজ্ঞ দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছিল এবং ওই ধারাবাহিকতায় দেশ তাকে পেয়েছিল সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন অব এক্সচেঞ্জেসের প্রথম সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে।
২০১৯
সালের পুরোটা
সময়জুড়ে মাঝে
মাঝেই অর্থজগতের
মারূফ মতিন,
আমার ছেলে
অলভ্যর মামু
ও স্ত্রী
লীনার ডালিব
ভাই (মারুফের
নিক নেম)
আমাদের খাবার
টেবিলে আলোচিত
হতেন। অলভ্য
তখন মসলিন
ক্যাপিটালে ‘বিনিয়োগ
বিশ্লেষক’ হিসেবে
কাজ করছিল।
প্রকৌশলীর আর্থিক
প্রতিষ্ঠানে চাকরি
আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে
ঠিক যায়
না। কিন্তু
গেল। কীভাবে
গেল তা
একটু বলি।
ইউনিভার্সিটি অব
বার্মিংহাম থেকে
কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে
মাস্টার্স করে
অলভ্যর দেশে
ফেরার তখনো
দুই সপ্তাহ
হয়নি। আমরা
গেলাম চিটাগং।
আধা কাজে
আধা বেড়াতে।
এক অলস
দুপুরে সার্কিট
হাউজে বসে
অলভ্য মামুকে
ওর দেশে
ফেরার খবর
দিল। মামু
বলল, ‘ঢাকা
ফিরে দেখা
করিস।’ লীনা
ফোন নিয়ে
জিজ্ঞেস করল,
‘ডালিব ভাই
চাটগাঁর কিছু
লাগবে?’ ‘না,
লাগবে না।
পারলে আফলাতুন
আনতে পারো’—ডালিব
উত্তর দিল।
আফলাতুন মারুফের
প্রিয় মিষ্টি।
ইস্পাহানি পিটশপের
আফলাতুন নিয়ে
ঢাকা ফিরে
অলভ্য মসলিন
ক্যাপিটালে হাজির
হলে মারূফ
নানা গল্পের
পর আউট
অব দ্য
ব্লু তাকে
জব অফার
করে। আমার
মনে হয়
আসলে অলভ্য
নয়, মারুফের
ভেতর দীপ্ত
হয়ে উঠেছিল
নস্টালজিয়া। সদ্য
ইংল্যান্ড ফেরত
অলভ্যর মধ্যে
সে গন্ধ
পাচ্ছিল তার
প্রিয় ইংল্যান্ডের।
সেখানকার বইয়ের
দোকান, পাব
কিংবা পার্কের
কাঠের বেঞ্চ
যেন দিব্যি
দেখছিল সে।
জব শুরু
করে অলভ্যরও
ভালো লেগে
গেল মামু
ডালিবের পছন্দকে।
বিশেষ করে
তার লাইব্রেরি,
নিবিড় পাঠাভ্যাস
সেই সঙ্গে
লেখালেখি আর
পুঁজিবাজার সম্পর্কিত
উদ্ভাবনী কাজে
অখণ্ড মনোযোগ।
শুধু তাই
নয়, তার
মতোই মসলিনের
আইবিএ গ্র্যাজুয়েটদের
টপ অর্ডার
তরুণ টিমটিও
ছিল মারুফের
কাজের ভক্ত।
মারূফ ছিল
তাদের নেতা
আবার বন্ধুও।
অফিসে সবাইকে
সে শোরগোল
তুলে খাওয়াত
কিংবা তাদেরকে
নিয়ে ছুটত
রেস্তোরাঁয়। সহকর্মীদের
উপহার দিতে
ভালোবাসত। একবার
অলভ্যদের দুজনকে
সে টেইলর
মেড স্যুট
গিফট করল।
মারুফের হূদয়
ছিল বিশাল,
সহকর্মীদের জন্য
নিত্য উন্মুক্ত
ছিল তার
দরজা। এভাবেই
গত জানুয়ারিতে
পিএইচডি প্রোগ্রামে
অলভ্যর ইংল্যান্ড
ফিরে না
যাওয়া পর্যন্ত
ওর মুখে
মারূফ মতিন
মাঝে মাঝেই
আমাদের টেবিলে
আলোচিত হত।
পিপল ভার্সাস
টেক, ফোর্থ
ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশন
থেকে আরম্ভ
করে তার
পাঠানো বেশকিছু
বই বাসায়
প্রায়ই চোখে
পড়ে আর
মারুফের স্মৃতি
জীবন্ত হয়ে
ওঠে। বসার
ঘরে যখন
তাকাই, মনে
হয় একজন
স্বপ্নতাড়িত মানুষের
এখানে স্পর্শ
লেগে রয়েছে।
ভেঞ্চার
ক্যাপিটাল, স্টার্টসআপ
কিংবা টেকসই/সুস্থির
পুঁজিবাজারের অন্বেষণ
মারূফ মতিনের
মতো করে
কেউ আর
করবে কিনা
জানি না।
তবে তার
প্রয়াণে ক্যাপিটাল
মার্কেটে যে
বিশাল শূন্যতার
সৃষ্টি হলো,
তা পূরণে
যে অনেকটা
সময় লাগবে
সেটি বুঝতে
অসুবিধা হয়
না। পরম
করুণাময় মারূফ
মতিনের জীবনের
ত্রুটিগুলো মার্জনা
করুন আর
সৎ আমলগুলোয়
অনুমোদন দিন।
আমিন।
সুরাশূন্য
আমার গৃহ
পানশালাও নির্জন
যদিও
কেউ নয়
দায়ী, সময়টা
বৈরী ভীষণ।
সাকি
কোয়ারেন্টিনে—কেউ
নেই ভালো,
মানুষ কিংবা
কুকুর
এক পাত্র
শিরাজ করতে
পারে আমাকে
আকণ্ঠ ভরপুর।
রুমি
নয়- নয়
ফেরদৌসি
আমি কাঁদি
বিনয়ী ওয়ালি।
(রচনা:
ওয়ালি-উল-মারূফ
মতিন। ইংরেজি
থেকে রূপান্তর:
ইকতিয়ার চৌধুরী)
ইকতিয়ার চৌধুরী: কথাসাহিত্যিক
ও সাবেক
রাষ্ট্রদূত










